শুনে একটু ভড়কে গেলুম নিশ্চয়। পিশাচ’ শব্দটা লিখে হালদারমশাই নোটবই বুজিয়ে তাড়া দিলেন। “উঠে পড়া যাক, জয়ন্তবাবু। বারোটা পাঁচে ট্রেন।” বলে সহাস্যে কর্নেলকে ধন্যবাদ দিলেন। “অনেক কু দিয়েছেন। থ্যাংকস, থাউজ্যান্ড থ্যাংকস কর্নেল স্যার!”
.
তিন
গুরুজনের চোখে ছেলেপুলের বয়স বাড়ে না। ফলে দণ্ডীবাবুর বর্ণনা অনুসারে তৈরি হালদারমশাইয়ের নোটবুকের বৃত্তান্ত থেকে ফান্টুর যে মূর্তি বানিয়েছিলুম, মিলল না। বরং ওকে দেখলেই কেন যে হাসি পায়! বেঢপ গড়ন বলেই হয়তো কার্টুনচিত্র মনে হয়। গোলগাল, বেঁটে, মুখটি প্রকাণ্ড–তবে এক্ষেত্রে ‘গু’ বর্ণ বিপজ্জনক কদাচ নয়। বড় বড় দাঁত, খোলা হাসি সবসময় মুখে টাঙানো। নিরীহ গোবেচারা বলাই উচিত। পরনে কালো রঙের শর্টস আর নীলচে স্পোটস্ গেঞ্জি। পায়ে গামবুট। ধুলো কাদায় নোংরা। মাথায় আঁটোসাঁটো টুপি দিনশেষেও আঁটা দেখে দণ্ডীবাবু ধমক দিলেন, “রোদ্দুর আছে? আবার আমাকে বলা হয় ভুলো মন! যা, ওই নোংরা মেঠো পেন্টুল-ফেন্টুল খুলে আয়।”
ফান্টু আমাকে বোঝাচ্ছিল, কী কৃৎকৌশলে উদ্ভিদের কাছে অনেক বেশি আদায় করা যায় এবং সে সত্যিই কৃষিবিজ্ঞানীর কান কাটতে পারে। মামার কথায় জিভ কেটে বিব্রতভাবে পাম্প ঘরের সামনে চৌবাচ্চাটির দিকে গেল। পনেরো একর ফার্মের চারদিকে ঝোঁপঝাড়, কিছু গাছের জটলা। পুবে পোড়ো শিবমন্দির আর বট, দ্রুত আবছা হয়ে আসছে। হু হু করে বাতাস দিচ্ছে। বেগুনখেতের এক কোণে, খানিকটা দূরে কাকতাড়ুয়াটি কালো হয়ে দাঁড়িয়ে দুলছে আর দুলছে। গা ছমছম করছিল। ফার্ম-ঘরের খোলামেলা বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে দণ্ডীবাবু তেরাত্তিরের রহস্যময় ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিলেন। নতুন কোনও কথা শুনলুম না। হালদারমশাই গঙ্গার ওপারে কালীগঞ্জে দণ্ডীবাবুর বাড়িতে আছেন। নিশুতি রাত্তিরে তার অভিযান শুরু হবে। প্ল্যানমাফিক আমি কলকাতার কাগজের কৃষি বিষয়ক রিপোর্টার। রমজান আর মুকুন্দ কলকাতার কাগজে তাদের ছবি ছাপা হবে শুনে আমাকে খাতিরের চূড়ান্ত করছিল। শেষে মুকুন্দ গঙ্গা পেরিয়ে আমার সরেস রকম সকারের জন্য মাছ-মাংস-রসগোল্লা-দই আনতে গেল বাজার থেকে। রমজান চায়ের সঙ্গে দাগড়া-দাগড়া বেগুনী আর ‘পটাটো-চিপস’ আনাল। গর্বে হেসে বলল, “সবই আমাদের এই মাটির উৎপন্ন স্যার। এই বেগুন বলুন, বেগুন। আলু বলুন, আলু!”
দণ্ডীবাবু কৌতুকে বললেন, “ব না চায়ের পাতাও ফলিয়েছিস! কাগজে তাও ছাপা হবে!”
কর্তাবাবুর কথায় রমজান দমল না। বলল, “সেও আমাদের ভাগনেবাবুর পক্ষে অসাধ্য কিছু নয়, বাবুমশাই। দেখবেন, কবে চায়ের বাগান করে বসে আছে। লবঙ্গ, এলাচ, দারুচিনি–সবই ফলাতে পেরেছে, চা এমন কী জিনিস?”
দণ্ডীবাবু চোখ পাকিয়ে বললেন, “আলো জ্বেলে দে! খালি বড় বড় কথা আর রাতটি এলেই ঘুমিয়ে পড়া!”
রমজান সুইচ টিপে দরজার ওপরে কার্নিশের নিচের বালটি জ্বেলে দিল। আমার উদ্দেশে বলল, “কিছু দরকার হলেই ডাকবেন, স্যার! আমি ধাঁ করে একচক্কর মাঠে ঘুরে আসি। গম পেকেছে। সন্ধ্যার দিকেই গম-চোরদের উৎপাত হয়।” সে চলে গেলে দণ্ডীবাবু বললেন, “আমার এই লোক দুটো রমজান আর মুকুন্দ, খুব বিশ্বাসী। অনেস্ট। শুধু একটাই দোষ। রাত দশটার পর গাঁজার নেশায় মড়া হয়ে পড়ে থাকে।”
ফান্টু চায়ের গেলাস হাতে এল। টুপিটা নেই এই যা! পরনে সেইরকম পোশাক–শর্টস আর গেঞ্জি। মুখে কার্টুন-হাসি টাঙানো। একটা চেয়ার টেনে একটু তফাতে বসে বলল, “চান করার সময়। একটা কথা মাথায় এল মামা। বলি কাগজের দাদাকে?”
দণ্ডীবাবু ভুরু কুঁচকে তাকালেন ভাগনের দিকে।
ফান্টু বলল, “গতরাত্তিরে কাকতাড়ুয়া দুষ্টুমি করেনি। মামা ছিলেন না, তাই। আজ রাত্তিরে মামা । আছেন। দেখবেন, ঠিক গণ্ডগোল বাধাবে। যত রাগ যেন মামার ওপর!”
দণ্ডীবাবু ঊরুতে ঠেস দিয়ে রাখা দোনলা বন্দুকটি তুলে নিয়ে বললেন, “খুলি উড়িয়ে দেব। আমার ওপর রাগ! আমি কোন্ ব্যাটাচ্ছেলের পাকা ধানে মই দিয়েছি? বুঝলেন জয়ন্তবাবু! এ স্রেফ কারুর জেলাসি। কেউ বা কারা চায় না আমার ফার্মে তিন কিলো বেগুন ফলুক। একজিবিশানে মেডেল পাক্।”
ফান্টু বলল, “না মামা, তোমাকে বারবার বলেছি, তুমি কানেই নিচ্ছ না–”
তাকে থামিয়ে দিয়ে দণ্ডীবাবু বললেন, “থাম তো! খালি এক কথা।”
জিজ্ঞেস করলাম, “কিন্তু কথাটা কী?”
দণ্ডীবাবু ফাঁচ করে বড়ই বেমানান হাসিটি হাসলেন। আসলে তার রুক্ষ কেঠো চেহারার জন্য সবসময় মুখে তিতকুটে জিনিস গেলার ভাব। হাসলে মনে হয়, খ্যাক করে কামড়ে দিলেন। বললেন, “ভূত! যে সে ভূত নয়, গঙ্গার মড়াখেকো পিশাচ! ছেলেটা কাটরার মাঠে থাকতে থাকতে কী একটা হয়ে গেছে যেন। সব সময় উদ্ভুট্টে কথাবার্তা! বলে কী জানেন! গাছপালা, পাখপাখালি, পোকামাকড় সবকিছুর কথা বুঝতে পারে।”
“পারি তো!” ফান্টু বলল, “সাধুবাবা আমাকে বলে গেছেন, যার প্রাণ আছে সেই কথা বলে। চেষ্টা করলেই বোঝা যায়, কী বলছে।”
বললুম, “কিন্তু তুমি ভূত-প্রেত-পিশাচ এসব বিশ্বাস করো কি?”
ফান্টু বলল, “করি। দেখেছি যে!”
“কী দেখেছ, বলো।”
দণ্ডীবাবু খাপ্পা হয়ে বললেন, “খুব হয়েছে আর নয়। সাধুবাবা না, এই রমজান আর মুকুন্দ ওর মাথাটি খেয়েছে। জয়ন্তবাবু, দোহাই আপনাকে। ফিরে গিয়ে যেন এইসব উদ্ভুট্টে কথাবার্তা কাগজে ছাপবেন না! একে তো আপনাদের কাগজের স্থানীয় সংবাদদাতা গঞ্জুবাবু জ্যান্ত কাকতাড়ুয়ার ভৌতিক খবর ছাপিয়ে হুলস্থুল বাধিয়েছেন। আড়তে অসংখ্য জায়গার নোক এসে আমাকে জেরায়-জেরায় জেরবার করে দিচ্ছে। এবার আপনিও যদি ভূত-প্রেত-পিশাচের খবর ছাপেন, তিষ্টানো যাবে না। আমাকে আড়তের কারবার ছেড়ে, এই ফার্ম ছেড়ে হিমালয়ে পালাতে হবে।”
