ঝটপট বললুম, “কালীগঞ্জে ছদ্মবেশ ধরার দরকারটা কী!”
“দরকার হবে, যদি হালদারমশাইয়ের সঙ্গে ঘুরতে চাও।” বলে কর্নেল হাত বাড়িয়ে পাশের টেবিলের ওপর একটা সুইচ গোছের কিছু টিপে দিলেন।
অমনি খড়খড়-খসখস বিবিধপ্রকার শব্দ শোনা গেল। তারপর কাকের চাঁচামেচি। সেইসঙ্গে এইসব কথাবার্তা: “হ্যাঁ হ্যাঁ…ব্যস…হয়েছে….খাসা! এবার মন্তরটা পড়ে দিই মাথায়। ওং হ্রীং ক্লীং ফটু ফটু মারয় মারয় তাড়ায় তাড়ায় স্বাহা!”
হালদারমশাইয়ের গলা। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি দেখে কনেল বললেন, “ছাদের বাগানে কী ঘটছে, ঘরে বসে খোঁজখবর নেবার জন্য এই যান্ত্রিক ব্যবস্থা করেছি, জয়ন্ত! মন্ত্রতন্ত্র পাঠ শুনে বোঝা যাচ্ছে, হালদারমশাই ছদ্মবেশ ধরেই কালীগঞ্জে যাবেন–অবশ্যই সাধুবাবা সেজে। যাবার সময় চিৎপুর হয়েই যাবেন, ওখানে যাত্রা থিয়েটারের ড্রেস-সাপ্লায়ার প্রচুর। কাজেই ভেবে দ্যাখো, কী করবে!”
ষষ্ঠীচরণ ভক্তিমাখা মুখে ছাদ থেকে নেমে এসে ঘোষণা করল, “বাবামশাই কাজ পাক্কা।”
কর্নেল শুধু বললেন, “কফি।” ষষ্ঠী গুম হয়ে চলে গেল ভেতরে। একটা প্রশংসা আশা করেছিল বেচারা!
হালদারমশাই যথারীতি ষষ্ঠীকে মনে করিয়ে দিলেন “দুধটা একটু বেশি করে, ভাইটি!” তারপর এসে সোফায় বসলেন। হ্যান্ডব্যাগ থেকে নোটটা বের করে একটু হেসে বললেন, “কর্নেল স্যারকে, বুঝলেন জয়ন্তবাবু এই জন্যেই অন্তর্যামী বলি। ওপরে গিয়ে তো চক্ষু ছানাবড়া। বড়ই আশ্চর্য। ভাবা যায় না!”
কর্নেল বললেন, “হালদারমশাই কি সন্নেসি সেজে কালীগঞ্জে যাচ্ছেন?”
“অ্যাঁ!” হালদারমশাই অবাক হয়ে আমার দিকে ঘুরে ফিক করে হেসে বললেন, “হঃ বুঝছি। জয়ন্তবাবু সব কইয়া দিছেন স্যাররে।”
বললুম, “পুরোটা বলিনি। আপনি বলুন। দেখুন কী কু পান!”
হালদারমশাই সোফার কোনায় পিছলে গেলেন, কর্নেলের ইজিচেয়ারের পাশে। তারপর চাপা স্বরে মন্ত্রপাঠের মতো নোট-বই থেকে রহস্যজনক ঘটনাটির বিবরণ দিতে থাকলেন। ইতিমধ্যে ষষ্ঠী কফির ট্রে রেখে গেল। কফিতে চুমুক দিয়ে হালদারমশাই দ্বিগুণ উদ্যমে বাকি বৃত্তান্ত শেষ করে বললেন, “আমি যে প্ল্যান ছকেছি, আগে বলে দিই কর্নেল স্যার।”
কর্নেল বললেন, “সাধুবাবা সেজে গঙ্গার ধারে মন্দিরতলায় ধুনি জ্বেলে বসবেন তো?”
জবাবে হালদারমশাই ‘খিখি-খিখি’ করলেন। অর্থাৎ সেটাই ইচ্ছে।
“জয়ন্তবাবুকে তা হলে চেলা সাজতে হবে।”
আপত্তি করে বললুম, “মোটেও না। আমি ফার্মে কৃষি-সংবাদদাতা হয়ে থাকব। দৈনিক ‘সত্যসেবকে’ কৃষির একটি পাতা বেরোয় ফি সপ্তায়।”
“সাধু সাজার সুবিধে এ-ক্ষেত্রে আছে।” কর্নেল বললেন। “সাধুসগ্নেসিরা গাঁজা খেয়ে ধ্যানে বসেন। তাই এলাকার গাঁজাখোরদের চেলা হিসেবে পাওয়ার আশা আছে। বিশেষ করে রমজান আর মুকুন্দকে সবার আগে পাওয়ার কথা। হালদারমশাই তাদের মুখ থেকে কিছু তথ্য পেতেও পারেন।”
হালদারমশাই ব্যস্তভাবে নোট করে নিয়ে বললেন, “হ্যাঁ এটা একটা বড় পয়েন্ট।”
“আবার নাও পেতে পারেন!”
“সে কী!” বলে হালদারমশাই নোটবইতে একটা জিজ্ঞাসার চিহ্ন দেগে দিলেন।
“যদি তারাও চক্রান্তের সঙ্গে জড়িত থাকে—”
“কীসের চক্রান্ত, কর্নেলস্যার?” হালদারমশাই করুণ মুখে প্রশ্নটা করলেন।
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, “ভূত হোক বা মানুষ তোক, কেউ বা কারা চায় না তুলারাম দণ্ডী ফার্মে রাত্রিবাস করেন–শুধু এটুকুই বোঝা যাচ্ছে আপাতত। জয়ন্ত, যাচ্ছ, যাও। কিন্তু সাবধান!”
জেদ ধরে বললুম, “যাচ্ছি।”
“কাকতাড়ুয়াটি বিপজ্জনক, ডার্লিং! তবে আরও বিপজ্জনক জিনিস তুলাদণ্ড।”
হালদারমশাই নোটবইতে ‘তুলাদণ্ড লালকালিতে বন্দী করে আমার পক্ষ হয়ে বললেন, “বুঝাইয়া কন!”
কর্নেল চোখ বুজে দুলতে দুলতে বললেন, “তুলারাম দণ্ডীর সঙ্গে তুলাদণ্ডের যোগ আছে। কারণ খোলভুসি ওজন করে বেচতে হয়। দণ্ডী পদবির কী ব্যাখ্যা উনি দেন জানি না। তবে দণ্ডী বলতে প্রাচীন যুগে রাজবাড়ির দারোয়ান বোঝাত। কালীগঞ্জে গুপ্তযুগের প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ আছে শুনেছি।”
হালদারমশাই শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বলে উঠলেন, “গুপ্তধন! গুপ্তধন!”
“সমস্যা হল,”– কর্নেল বলতে থাকলেন, “বরাবর দেখে আসছি, ‘‘ এই যুক্তবর্ণটি সর্বত্র গণ্ডগোলের প্রতীক। হুঁ, গণ্ডগোলেও ‘শু’ লক্ষ করুন। তারপর দেখুন, দণ্ড, মুণ্ড, ভাণ্ড, পিণ্ড, চণ্ড, ষণ্ড, লণ্ডভণ্ড…..। যাই হোক, এবার কাকতাড়ুয়া কথা ভাবুন। দণ্ডের ওপর মুণ্ডু দেখতে পাচ্ছেন। দণ্ডমুণ্ড সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার! তা ছাড়া দণ্ডমশাইয়ের বেগুন খেতে মুণ্ডটি আস্ত মড়ার খুলি!”
গোয়েন্দামশাই খসখস করে নোট করছিলেন। বললেন, “একটা কথা জিগানো বাকি, কর্নেল স্যার। কাটরার মাঠ। কাটরাটা কী কন তো?”
বিরক্ত হয়ে বললুম, “সেখানে গিয়েই জানা যাবে!”
হালদারমশাই আমাকে পাত্তা দিলেন না। বললেন, “দণ্ডীবাবু বলছিলেন, সেখানে নাকি মোগল-পাঠানে খুব কাটাকাটি হয়েছিও। তাই কাটরা। আপনি কী কন?”
কর্নেল ফের একটা অট্টহাসি হাসলেন। “হয়েছিল। তবে কাটরা কথাটা আসলে কাঠরা। মানে, রবিশস্য। কোথাও-কোথাও কাঠখন্দও বলা হয় রবিশস্যকে।” বলে আমার দিকে তাকালেন। “কাঠরা বলতে কাঠগড়াও বোঝায়, জয়ন্ত। না, না, কাঠগড়ার ভয় তোমার কীসের? শুধু একটা ব্যাপার সাবধান করে দিই। কাটরার শ্মশানে নাকি পিশাচ আছে।”
