এবার মুখ তুলে ফিক করে হাসলেন হালদারমশাই। “হঃ!” বলে বিচিত্তির রুমালে, ন্যাতা বলাই উচিত, নাক ও গোঁফ মুছলেন। রীতিমত আপিস যখন, তখন একজন বেয়ারাও বহাল আছে। তার নাম রামধারী। হালদারমশাই পুলিশে চাকরি করতেন। রামধারীও করত। পেল্লায় চেহারা। কেটলি নিয়ে চা আনতে বেরোল কর্তার ইশারায়।
তারপর হালদারমশাই সবিস্তারে রহস্যের জালটি আমার সামনে ছড়িয়ে দিলেন, নিজের ভাষায় যেটি আগেই মোটামুটি বর্ণনা করেছি। দিয়ে বললেন, “মিনিট দশেক আগে দণ্ডীমশাই গেলেন। রাত জেগে ট্রেনে এসেছিলেন। সাড়ে ন’টার বাস ধরে ফিরে যাবেন। কারবারি মানুষ। কিন্তু
“কিন্তুটা কী?”
“ওই যে কইছিলাম, আনলাকি থারটিন।” একটু গুম হয়ে থাকার পর ফের বললেন, “আপনে কী কন?” হালদারমশাই সমস্যাগ্রস্ত, সেটা বোঝাতে মাঝে মাঝে পূর্ববঙ্গীয় মাতৃভাষায় কথা বলে ফেলেন।
“কেস তো নিয়েছেন।”
“নিয়েছি। কথাও দিয়েছি।”
“তা হলে আর কথা কী? চলুন, আমিও সঙ্গ দেব।”
হালদারমশাইকে একটু উত্তেজিত দেখাল। চাপা স্বরে এবং ভুরু নাচিয়ে বললেন “কর্নেল স্যার কী বলেন শুনে আসি চলুন! কেসটা শুনে যদি কোনও কু দেন, মন্দ হবে না। ওল্ড ম্যানরা এমনিতেই ওয়াইজ, তার ওপর কর্নেল স্যারের মতো ওয়াইজ ম্যান কে কোথায় দেখেছে?”
“কর্নেল তার শূন্যোদ্যানে ঢুকে গেছেন। গাছ হয়ে গেছেন। নড়াচড়া চোখে পড়বে। তবে বোবা।”
হালদারমশাই খিখি করে হাসতে লাগলেন।”না, না, এই কেসে রক্ত টক্ত আছে, বুঝলেন না? স্রেফ ভূতুড়ে ব্যাপার হলে কথা ছিল! কর্নেল স্যার হলেন রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। রক্তের গন্ধ পেলেই ঝাঁপিয়ে আসবেন।”
চা খাওয়ার পর হালদারমশাইয়ের টানাটানিতে অনিচ্ছাসত্ত্বেও বৃদ্ধ প্রকৃতিবিদের ডেরায় আবার গেলাম। শূন্যোদ্যান থেকে নেমে ব্রেকফাস্ট করে সবে চুরুট ধরিয়েছেন। আমাদের দেখে ধোঁয়ার ভেতর বললেন, “বসার আগে দুজনেই একবার ছাদে গিয়ে দেখে আসুন ষষ্ঠী কী করছে। না, না ডার্লিং, হালদারমশাইয়ের সঙ্গে তুমিও যাও। দেখে এসো। এতদিন যে কেন আইডিয়াটা আমার মাথায় আসেনি, আশ্চর্য!”
হালদারমশাই ততক্ষণে ছাদে পৌঁছে গেছেন। আমি সোফায় বসে পড়লাম। ষষ্ঠী কী করছে দেখার মুড নেই। কর্নেল তার সাদা দাড়িতে হাত বুলিয়ে আপনমনে বললেন, “এতদিন ধরে অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করছি। অথচ মাথায় এই সামান্য ব্যাপারটা আসেনি। এবার ব্যাটাচ্ছেলেরা দেখবে কি, তল্লাট ছেড়ে পালাবে!” বলে স্বভাবসিদ্ধ অট্টহাস্য করতে থাকলেন।
অট্টহাসি থামলে বললুম, “কাক?”
“ঠিক ধরেছ, ডার্লিং!”
“ষষ্ঠী কাকতাড়ুয়া তৈরি করছে বুঝি?”
“হুঁউ। তুমি বুদ্ধিমান।”
“কাগজে কালীগঞ্জের কাকতাড়ুয়ার খবর পড়েছেন বুঝি?”
কর্নেল নড়ে বসলেন। “আমাকে সত্যিই বাহাত্তুরে ধরেছে, জয়ন্ত। কাকতাড়ুয়া জিনিসটা যে এত কাজের, কতবার কত জায়গায় দেখেছি। কিন্তু কিছুতেই মাথায় আসেনি। আসলে কলকাতা বহু জরুরি জিনিস ভুলিয়ে দেয়। হরিয়ানায় আমার এক বন্ধু কর্নেল কেশরী সিংয়ের ফার্মে একটিমাত্র কাকতাড়ুয়া বহু একর জমির গম রক্ষা করেছিল-না, কাকের মুখ থেকে নয়, হরিণের মুখ থেকে। জিনিসটাকে আমরা বাংলায় কাকতাড়ুয়া বলি বটে, কিন্তু ওটা সমস্ত প্রাণীকে ভয় পাইয়ে দেয়। মানুষকে, ডার্লিং, মানুষকেও। বিশেষ করে রাতবিরেতে তো বটেই!”
হাসি চেপে বললুম, “ভয় পেয়ে গুলিও চালায় অনেক মানুষ!”
“স্বাভাবিক। খুবই স্বাভাবিক।” বৃদ্ধ প্রকৃতিবিদ সায় দিলেন। “জ্যোৎস্নারাতে বাতাস দিলে কাকতাড়ুয়াকে জ্যান্ত মনে হয়। কাজেই চমকে উঠে গুলি চালানো অসম্ভব কিছু নয়, হাতে ফায়ার আর্মস্ যদি থাকে।”
“তারপর যদি সকালে কাকতাড়ুয়ার গায়ে…”
কথা কেড়ে কর্নেল বললেন, “রক্তের দাগ থাকলে তাতে কিছু প্রমাণ হয় না জয়ন্ত।”
জোর গলায় বললুম, “প্রমাণ হয় না? কী বলছেন আপনি!”
“রক্তের দাগ বলে যেটা ভাবা হচ্ছে, সেটা রক্তেরই দাগ কি না যতক্ষণ না নিশ্চিত হচ্ছ, ততক্ষণ কিছু প্রমাণ হয় না।”
“কালীগঞ্জের তুলারাম দণ্ডীর বেগুনখেতে কাকতাড়ুয়ার জামায় আর বেগুনগাছের পাতায় রক্তের দাগ পাওয়া গেছে।”
কর্নেল ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে তারপর মিটিমিটি হাসলেন। “হালদারমশাই সম্প্রতি যে হারে কাগজে তাঁর ডিটেকটিভ এজেন্সির বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন, এই কেস তার হাতে আসা স্বাভাবিক। যাই হোক, তুমি আবার এসেছ এবং হালদারমশাই তোমার সঙ্গে। বোঝা যাচ্ছে, তুমি এতে খুব আগ্রহী।”
“নিশ্চয়। কাগজের রিপোর্টাররা আজকাল অন্ততদন্ত লেখে। আমিই বা সুযোগ ছাড়ি কেন?”
কর্নেল হঠাৎ কেন যেন একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন। জ্বলন্ত চুরুট কামড়ে ধরে চোখ বুজে দুলতে দুলতে বললেন, “হালদারমশাই সম্ভবত কাকতাড়ুয়াটির গঠনকৌশল লক্ষ করছেন মন দিয়ে। উনি গ্রামাঞ্চলে পুলিশের দারোগা ছিলেন। ষষ্ঠী বর্ধমানের গ্রামের লোক। সে কাকতাড়ুয়া বোঝে। আসলে হালদারমশাইয়ের বরাবর দেখে আসছি বুদ্ধিসুদ্ধি উৎসাহ, সাহস, অভিজ্ঞতা সবকিছুই প্রচুর আছে। শুধু একটু অনুসন্ধিৎসা আর একটু পর্যবেক্ষণ এই দুটো জিনিসের ঘাটতি আছে।” চোখ খুলে আমার চোখে চোখ রেখে বললেন হঠাৎ, “আমি বলি কি, তুমি কালীগঞ্জে যেও না।”
“কেন বলুন তো?”
“তুমি যে ছদ্মবেশ ধরতে একেবারে আনাড়ি।” গম্ভীর মুখেই কর্নেল বললেন। “আশা করি, লোহাগড়ার ঘটনাটা ভুলে যাওনি। তোমার গোঁফ খুলে পড়ে গিয়ে কী কেলেঙ্কারি ঘটেছিল!”
