দণ্ডীমশাই বিশেষ তুষ্ট হলেন। বেগুনখেতের কাকতাড়ুয়াটির মাথা তিনি গত রাতে ফাটিয়েছেন। ফান্টু কেলে হাঁড়ির খোঁজে সারাদিন হন্যে হচ্ছে, খবর পেয়েছেন। আজকাল আর মাটির হাঁড়িতে রান্নার চল নেই। দৈবাৎ একটা পেয়ে গিয়েছিল সেই সন্নেসির দয়ায়, যিনি মৃৎপাত্রে রান্না করা ছাড়া অন্ন অশুচি গণ্য করতেন।
সন্ধে হতে-না-হতে গঙ্গা পেরিয়ে দণ্ডীমশাই কাটরার মাঠে তার ফার্মে গেলেন। সঙ্গে নিয়ে গেলেন মড়ার খুলিটি। একগাল হেসে বললেন, “ফান্টু, এই দ্যাখ, কী এনেছি তোর জন্যে।”
ফান্টু আঁতকে উঠে বলল, “ওরে বাবা! এ আমি কী করব মামা?”
“ধুর বোকা!” দণ্ডীমশাই বললেন। “দেখিসনি কাকতাড়ুয়ার মাথায় মড়ার খুলিও থাকে। নে, ব্যাটাচ্ছেলেকে পরিয়ে দে। ন্যাড়া লাগছে বড্ড। আর শোন, সাধুবাবার কাছে কী মন্ত্র শিখেছিলি, ফুকে দিতে ভুলিসনে যেন।”
ফান্টু খুলিটা কাকতাড়ুয়ার ঘাড়ে আটকে দিয়ে মন্ত্রটা পড়ল, “ঔং হ্রীং ক্লীং ফট ফটু মারয় মারয় তাড়য় তাড়ায় স্বাহা!”
তারপর মামার কাছে ফিরে বলল, “ব্যাপারটা আমার ভাল ঠেকছে না মামা। যদি–”।
দণ্ডীমশাই চোখ কটমট করে বললেন, “কী যদি? যদি-টদি কিছু নয়। তাঁদড়ামি করলেই গুলি খাবে।”
রমজান বলল, “বাবুমশাই, মনে হচ্ছে, এ-ব্যাটা একটু বেশি তাঁদড়ামিই করবে।”
“কেন, কেন?”
“যার খুলি, সে শুক্কু এসে যোগ দেবে। ছিল এক, হবে দুই।”
দণ্ডীমশাই বাঁকা হেসে বললেন, “আমার বন্দুকও দোনলা। একসঙ্গে দুটো ঘোড়াই টিপে দেব।”
মুকুন্দ কিছু না বুঝেই বলল, “খুব জমে যাবে মনে হচ্ছে। খুলিতে গুলিতে জমজমাট।”
দণ্ডীমশাই ভেংচি কেটে বললেন, “যাই হোক, তোমাকে তো আর ডেকেও পাওয়া যাবে না।”
মুকুন্দ জিভ কেটে বলল, “কী যে বলেন স্যার! কিছু বাধলে ডেকেই দেখবেন, কী করি!”
কী করে, যথারীতি দেখা গেল সে-রাতে। গাঁজা খাক নাই খাক, দুই বন্ধুর ঘুমটাও বড্ড বেশি। ফান্টু চুপি চুপি ডাকতে গিয়ে ফিরে এল। পূর্ণিমা তিথি। জ্যোৎস্না ফেটে পড়ছে কাটরার মাঠে। কাকতাড়ুয়াটি, রমজানের হিসেব অনুসারে, দুনো জ্যান্ত হয়েছে। খোঁনাসুরে কী গাইছে, কথাগুলো বোঝা যায় না, হাওয়ার তোলপাড় খুব। বন্দুকের নল জানালার বাইরে, ট্রিগারে আঙুল, হ্যাঁমার দুটোই ওঠানো, দণ্ডীমশাই তৈরি। শুধু একটু কৌতূহল জেগেছে, শেষ পর্যন্ত কী করে কাকতাড়ুয়া হতচ্ছাড়া, তাই দেখবেন।
তেমন কিচ্ছুটি করছিল না। শুধু গুনগুনিয়ে সুর ভাজা আর দু’ধারে চিতানো লম্বা হাতদুটো সমেত একবার এদিকে, একবার ওদিকে ঘোরা, ট্যাঙস ট্যাঙস করে এ কোনা থেকে ও কোনো পায়চারি। গত রাতে গুলি খেয়েই যেন রেগে আছে, এমন বেপরোয়া ভঙ্গি। শেষে ঘরটার দিকে মুখ করে বুক চিতিয়ে দাঁড়াল। অমনি খাপ্পা দণ্ডীমশাই একসঙ্গে দুটো ট্রিগারই টেনে দিলেন।
ফলে উলটো ধাক্কাটা যথেষ্ট দিল বন্দুকের কুঁদোটা এবং পড়ে গেলেন দণ্ডীমশাই। পড়ে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, “আলো! আলো!”
হুঁ, এ রাতেও বিদ্যুৎ অদ্ভুতভাবে বন্ধ! সাড়ে-বারোটা বাজে। টর্চের আলো ফেলে কাকতাড়ুয়াটিকে বেগুনখেতের ভেতর কাত অবস্থায় দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু মামা-ভাগনে সাহস করে বেরোতে পারলেন না। আগের দুটো রাতের মতোই। তারপর বিদ্যুৎ এল আধঘন্টা পরে-এও আগের দু’রাতের মতোই।
ভোরে কাকতাড়ুয়া পাঞ্জাবিতে একটু রক্তের ছোপ, তারপর বেগুনগাছের পাতায় খুঁজতে খুঁজতে আরও পাওয়া গেল। শেষ দিকটায় ঝোঁপঝাড় ও কাঁটাতারের বেড়া পর্যন্ত রক্তের দাগ রেখে গেছে কেউ। বেড়ার সঙ্গে বুনো লতার ঝালর থাকায় আগে ধরা পড়েনি। এদিন ঝালর সরাতেই বেরিয়ে পড়ল কাঁটাতারের খানিকটা অংশ কাটা। একটা বড় ফোকর। গুলিখোরটি যেই হোক, ভূত কি মানুষ, ওই পথেই পালিয়েছে।
ফান্টু চাঁচাতে থাকল “মামা, মামা, মামা!”
.
দুই
“এই আপনার তেরো নম্বর কেস?”
“হঃ আনলাকি থারটিন।” গোয়েন্দা কৃতান্তকুমার হালদার ওরফে কে কে হালদার ওরফে আমাদের হালদারমশাই নাকে নস্যি গুঁজে নাকি-স্বরে বললেন। মুখে তেতো ভাব, অনিশ্চয়তার।
কিছুদিন থেকে আমার ফ্রেন্ড-ফিলজফার গাইড কর্নেল নীলাদ্রি সরকার তার ছাদের বাগানে নিপাত্তা হয়ে আছেন। এদিকে পৃথিবীতে কত রহস্যময় ঘটনা ঘটে যাচ্ছে! কাগজে ছাপা হচ্ছে তার খবর। কালীগঞ্জের তুলারাম দণ্ডীর বেগুনখেতে ভূতুড়ে কাকতাড়ুয়ার খবর আমাদের দৈনিক সত্যসেবক’ পত্রিকার নিজস্ব সংবাদদাতার পাঠানো। তবে বিশদ কিছু ছিল না। কাটরার মাঠে জনৈক তুলারাম দণ্ডীর বেগুনখেতের কাকতাড়ুয়াটি নাকি রাতবিরেতে জ্যান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়, এটুকুই ছাপা হয়েছিল। কর্নেলের আশা ছেড়ে অগত্যা গিয়েছিলুম হালদারমশাইয়ের আপিসে। গণেশ অ্যাভিনিউতে একটা চারতলা বাড়ির চিলেকোঠায় তাঁর ‘হালদার প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি’। প্রকাণ্ড সাইনবোর্ড বোর্ড রাস্তা থেকে দেখা যায়।
ঘরে ঢুকে দেখি, সামনে নোটবই আর নস্যির খোলা কৌটো, আঙুলের টিপে নস্যি, গোঁফ বেয়ে সেই নস্যি ঝরছে, অর্থাৎ সিরিয়াস কেস হাতে পেয়েছেন! মুখও গুরুগম্ভীর। নোটবইয়ের পাতায় কোনও কোনও শব্দ লাল রঙের খোপে ঢোকাচ্ছেন। উলটো দিক থেকে তিনটে শব্দ বন্দী দেখতে পেলুম, ‘তুলা’, ‘দণ্ড’, ‘মুণ্ড’।
সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলুম, “তুলারাম দণ্ডীর ব্যাপারটা নয় তো?”
