কাকতাড়ুয়াটি বানিয়েছিল ফান্টু, তুলারাম দণ্ডীমশাইয়ের ভাগনে। স্কুল ফাইনালে তিন-তিনবার ফেল করায় যাকে গঙ্গার পাড়ে মামার সাধের ফার্মে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। পরে দেখা গেল, ফান্টুর মেধা খেত-খামারেই ভাল খুলেছে। খামোকা কাগজে ছাপানো কথাবার্তা মুখস্থ করে জীবন বরবাদ করে ফেলছিল। কাটরার মাঠে দণ্ডীমশাইয়ের পনেরো একর খেতে মরসুমি ফসল আর ফুল-ফলের ফলন দেখার মতো! এক টুকরো নার্সারির লাবণ্য তাক লাগিয়ে দিচ্ছে। গত শীতে কালীগঞ্জে কৃষি-প্রদর্শনী মেলায় তিন কিলো ওজনের বেগুন সরকারি মেডেল পাইয়ে দিল, এও একটা বড় ঘটনা।
তবে সবই নাকি ঈশান কোণে পোঁতা কাকতাড়ুয়াটির জোরে, এটা ফান্টুর নিজের মত। গঙ্গার ধারে ওই যে পুরনো শিবমন্দির আর বটের গাছ, সেখানে কখনও-না-কখনও সাধু-সন্নেসি এসে ধুনি জ্বালিয়ে বসে থাকেন। তাঁদেরই একজনকে তুষ্ট করে পরামর্শটি পায় সে। পৃথিবীতে সবকিছু নাকি জোড়ায়-জোড়ায় সিধে আর উল্টো থাকার নিয়ম। যেমন, দিন আর রাত, মাটি আর জল, গরম আর ঠান্ডা, মামা আর মামি–ফান্টুর দেওয়া নমুনা। মামা যেমন কুচুটে বদরাগী, মামি তেমনি শান্ত, মিঠে, নরম। তো লক্ষ্মীর উলটো অলক্ষ্মী। অলক্ষ্মীর দৃষ্টি সবসময় কু। বিশেষ করে বেগুনখেতের দিকে তার নজর বেশি। পোকায় পোকায় বেগুন জেরবার। শেষে যেই কাকতাড়ুয়াটি তৈরি করে ঈশাণ কোনায় পোঁতা হল, একজিবিশনে মেডেল! আর কী প্রমাণ চাই?
কাকতাড়ুয়া বানানো খুব সোজা। পলকা দু’টুকরো বাঁশ আড়াআড়ি বেঁধে ক্রুশ তৈরি করো। তাতে খড় জড়িয়ে কষে বাঁধে। দু’ধারে দু’হাত বাড়ানো একঠেঙে মানুষটির আকার হল। এবার একটা ঘেঁড়াখোঁড়া পাঞ্জাবি পরিয়ে দাও। মাথায় বসিয়ে দাও, একটা কেলে মাটির হাঁড়ি। চুন দিয়ে ওতে চোখ-মুখ এঁকে দাও, দাঁতশুন্ধু। দেখবে কী বিকট চেহারা হল! অলক্ষ্মী অবশ্য শুধু এতেই ভয় পাবার নয়, সেই সনেসি কাকতাড়ুয়াটির মাথায় মন্ত্র ফুঁকে দিয়েছিলেন, যেটা ফান্টুর মুখস্থ হয়ে গেছে: ‘ঔং হ্রীং ক্লীং ফট ফটু মারয় মারয় তাড়ায় তাড়য় স্বাহা!’
হুঁ, পাঞ্জাবিটি মামার। মামির কাছে গোপনে চেয়ে আনা। মামা হাড়কেপ্পন, হিসেবি মানুষ। তবে একটাই সুবিধে, বড্ড ভুলো মন। পাঞ্জাবিটি চিনতে দেরি হয়েছিল এবং তখন একজিবিশনে মেডেল জুটেছে। ফান্টু একগাল হাসি আর আশীর্বাদই পেল। তারপর থেকে মামার মন ফার্মের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। সন্ধেটি হলেই গঙ্গা পেরিয়ে কাটরার মাঠে ছোট্ট একতলা ফার্মহাউসে রাত কাটান। খুব ‘নেচার, নেচার করেন। বলেন, “নেচারেই শান্তি আছে রে বাবা! সাধুসগ্নেসিরা সেটা জানেন বলেই তো নেচারের ভেতর ঘুরে বেড়ান।” ফাল্গুনের জ্যোৎস্নারাতে ঘুম ভেঙে মামাকে ভোলা বারান্দায় হেঁড়ে গলায় গান গাইতেও শুনেছিল ফান্টু।
কিন্তু এ-গান সে-গান নয়। নিশুতি রাতে চলন্ত কাকতাড়ুয়ার খোলা সুরের ভয়-জাগানো গান। মামা-ভাগনে দু’জনেই আতঙ্কে কাঠ। ফার্মহাউসে বিদ্যুৎ আছে। ঘটনার সময় রহস্যময় লোডশেডিং। টর্চের আলো ফেলতেই কাকতাড়ুয়াটি থমকে দাঁড়িয়ে গেল। গানও গেল থেমে।
ফার্মে আরও দুজন লোক আছে। মুকুন্দ আর রমজান। মুকুন্দ পাওয়ার টিলার চালায়। রমজান কীটনাশক ওষুধ ছড়ায়। দণ্ডীমশাইয়ের সন্দেহ, দু’জনেই গাঁজাখোর। ওঠানো গেল না। সকালে দেখা গেল, কাকতাড়ুয়াটি নিজের জায়গা ছেড়ে অন্তত হাত-তিরিশেক এগিয়ে বেগুনখেতের মাঝামাঝি পোঁতা আছে। বেগুনের গাছে যথেচ্ছ কাঁটা। ফান্টু সাবধানে কাকতাড়ুয়াটিকে আগের জায়গায় পুঁতে রেখে এল।
পরের রাতে আবার একই ঘটনা।
বদরাগী দণ্ডীমশাই এ-রাতে বন্দুকে গুলি ভরে তৈরিই ছিলেন। ধুধু জ্যোৎস্নায় কাকতাড়ুয়াটি জ্যান্ত হয়ে ঠ্যাঙ বাড়িয়ে ধোঁনা সুর ভাজছে কি, বন্দুক চিকুর ছাড়ল। ফট্টাস শব্দ এবং কাকতাড়ুয়া বেগুনখেতের ভেতর কুপোকাত!
কিন্তু না, তখনও রক্তের ফোঁটা দেখা যায়নি। ভোরে ফান্টু গেল অবস্থা দেখতে। মামা তখনও জয়ের আনন্দে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছেন। ফট্টাস শব্দটি ছিল কাকতাড়ুয়া বেচারার মুণ্ডুর, মানে–সেই কেলে হাঁড়িটি গুলি লেগে চৌচির হওয়ার। মন্ত্রপড়া মুণ্ডুর দশা দেখে ফান্টুর মন খারাপ হয়ে গেল। কবন্ধ কাকতাড়ুয়াকে পুঁতে রাখল অগত্যা।
সেদিনই দ্বিতীয় রহস্যের সূত্রপাত।
তুলারাম দণ্ডীর সঙ্গে তুলাদণ্ডের সম্পর্ক আছে। কালীগঞ্জের বাজারে পশুখাদ্য খোল-ভুসির বড় আড়ত তাঁর। দুপুরে ঔরঙ্গবাদ থেকে এক ট্রাক টাটকা গমের ভুসি এসেছিল। বাঁধা খদ্দেররা ধরলে টাটকা ভুসি বেচতে হয়। একটা বস্তার ভেতর থেকে বেড়িয়ে পড়ল একটা মড়ার খুলি। হইচই পড়ে গেল চারদিকে। এ কী বিদঘুঁটে ব্যাপার!
সাপ্লায়ার দণ্ডীমশাইয়ের মাসতুতো ভাই চণ্ডীচরণ। খবর গেল তার কাছে। খুলিটি ওজনদার, প্রায় ন’শো গ্রাম। সেই নশো গ্রাম ভুসি এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে চিঠি এল চণ্ডীচরণের কাছ থেকে। চিঠির বক্তব্য হল, সম্ভবত যে-গমখেতের গম থেকে এই ভুসির উৎপত্তি, তার শিয়রে একটি কাকতাড়ুয়া ছিল এবং খুলিটি সেটির মাথায় বসানো ছিল। কোনও আমুদে চাষির রসিকতা ছাড়া আর কিছু নয়। দাদা যেন ক্ষমাঘেন্না করে দেন এবারকার মতো। এবার থেকে সব মাল বিশদ খতিয়ে দেখে পাঠানো হবে না।
