কর্নেল বললেন, তাহলে বোঝা যাচ্ছে, কালু খাঁর পক্ষেই দুটো বাঘ পোষা সম্ভব। পীরের থানের সেবককে খুন করে সে এখানেই আস্তানা গেড়েছে এতকাল। বাঘ দু’টোর ভয় দেখিয়ে ভক্তদের থানে আসা বন্ধ করেছে সে। দারুণ এলেমদার লোক! একটা বিতর্কিত চরে নিরাপদে ঘাঁটি গেড়ে বাস করছে।
বললুম, কিন্তু এই কবরের ভেতর গুপ্ত ঘর বা সুড়ঙ্গের কথা সে টের পেল না কেন?
কর্নেল বললেন, টের পায়নি, তা তো বুঝতেই পারছি। আসলে সে এমনটা ভাবতেই পারেনি। কিন্তু বুলবন পেশোয়ারী যেভাবেই হোক টের পেয়েছিল, কবরের তলায় গুপ্ত ঘর আছে। সোনাটা সেখানে রেখে সে পালাচ্ছিল। বাদশা-বেগমের পাল্লায় পড়ে বেচারার প্রাণ যায়। মরার সময় সে শেষবার বলতে পেরেছিল-’পীরের তলায় সোনাটা…..। তাই শুনে কাল্লু খাঁ ভেবেছে, পীরের চরের কোথাও পোঁতা আছে। পীরের কবর কথাটা মুখে আসেনি পেশোয়ারীর। যাক গে, এবার কেটে পড়া যাক্। ভুতো আমাদের সঙ্গে এস।
ভুতোর আপত্তি টিকল না। আমি আর মোহন তাকে টেনে নিয়ে চললুম। শাসালুম, চেঁচালে বন্দুকের গুলিতে মুণ্ডু উড়ে যাবে। ভয়ে সে চুপ করে থাকল।
পানসি নৌকোয় উঠে বসলুম আমরা। এখন রাত বারোটা পনেরো। নৌকো ছাড়ার সময় পশ্চিমের জঙ্গলে বাঘ দুটোর প্রচণ্ড গর্জন শোনা যাচ্ছিল।
এক সময় আমরা পীরের চর ছাড়িয়ে পদ্মার স্রোতের উজানে পড়লুম। ভুতো আমার কষ্ট দেখে বলল, মেজ হুজুর! আমাকে দিন বরং। ঠ্যাং-ট্যাং কাটা গেলেও হাত দুটো তো আছে! আর বৈঠা আমি দু বেলা বাই।
ভুতো আর মোহন বৈঠা বাইতে থাকল। মনে হল, ভুতো লোকটা আসলে ভাল। পেটের দায়ে কালু খাঁর দলে ইনফরমার হয়ে ঢুকেছিল। রান্নাবান্না কাজকর্মও করে দিত। ভুতো সারা পথ সে কথা বলতে থাকল। শেষে বলল, একখানা ছিপ নৌকো লুকোনো আছে হুজুর। পশ্চিমের জঙ্গলের নীচে খাড়ির মধ্যে আছে। পুলিসকে বলবেন, খুঁজে বের করবে। আর হুজুর, দেখবেন, আমার যেন জেল না হয়। তাহলে আমার বউ ছেলেমেয়েরা বড় কষ্টে পড়বে। বরং, আমাকে বড় হুজুর একটা চাকরি জুটিয়ে দেবেন। তাহলেই হল।
মহিমবাবুর চরের কাছাকাছি গিয়ে জিজ্ঞেস করলুম, আচ্ছা কর্নেল, আপনি কীভাবে জানলেন কবরের তলায় গুপ্ত ঘর আছে?
কর্নেল বললেন, কাল্লু খাঁ বুলবনের মরার সময়কার কথাটা যখন বলল, তখনই সন্দেহ হয়েছিল। ‘পীরের তলায় সোনাটা’–এর মানে কী হতে পারে? পীর যেখানে শুয়ে আছেন অর্থাৎ পীরের কবর, তার তলায়।
ধন্য আপনার বুদ্ধি! মোহন তারিফ করে বলল।
মহিমবাবুর চরে পৌঁছুতে রাত তিনটে বেজে গেল। যাবার সময় স্রোতের ভাটিতে গিয়েছিলুম। ফেরার সময় উজানে বলে এত বেশি সময় লাগল।
উদ্বেগে মাঝিরা ঘুমোতে পারেনি। আমাদের দেখে উঠে বসল। বলল, পীরের জঙ্গলে বাঘের ডাক শুনে আমরা খুব ভয় পেয়েছিলুম হুজুর। এখন ওই শুনুন! বন্দুকের আওয়াজও হচ্ছে। সবই ভূতপেরেতের কাণ্ড।
কর্নেল কান খাড়া করে কী শুনছিলেন। বললেন, খুব গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে পীরের চরে। তাহলে কি কাশেম খাঁর সঙ্গে কালু খাঁর লড়াই বেধে গেল?
আবছা গুলির শব্দ আর মাঝে বাঘের গর্জন ভেসে আসছিল পীরের চর থেকে। জ্যোৎস্নায় ওদিকটা ধূসর। পদ্মার বুকে ঘন কুয়াশা জমেছে। এক সময় কর্নেল বললেন, শুয়ে পড়া যাক। মোহন, তুমি সকাল সকাল বেরিয়ে যাবে। সাইকেল করে ঝটপট নটবর সিংয়ের ক্যাম্পে যাবে। আমার চিঠি নিয়ে যেও।
সকালে আবার আমরা পীরের চরে গেলুম। এবার বর্ডার বাহিনীর মোটর লঞ্চে চেপে। গিয়ে যা দেখলুম, গা শিউরে উঠল। এমন বীভৎস দৃশ্য কখনও দেখিনি।
কালু খাঁ, জনার্দন, গদাই, রহিম বকশ মড়া হয়ে পড়ে আছে পুবের বালিয়াড়িতে। সারা গা গুলিতে ক্ষতবিক্ষত। পশ্চিমের জঙ্গলে বাঘ দুটো-বাদশা আর বেগমও তেমনি ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে আছে। কাশেম খাঁ কাকেও রেহাই দেয়নি। বেচারা ভুতো জোর বেঁচে গেছে!
কবরের ঢাকনা তুলে পঞ্চাশ কিলোগ্রাম সোনার বাঁট উদ্ধার করা হল। সোনাটা প্রাক্তন পাকিস্তান স্টেট ব্যাঙ্কের ঢাকা শাখার। কাজেই ওটা ভারত সরকার বাংলাদেশ সরকারকে ফিরিয়ে দেবেন।
মহিমবাবুর চরে আমরা আরও দিন দুই ছিলুম। কর্নেল ‘বখাস’, না আবিষ্কার করে কলকাতা ফিরবেন না। তাঁর বক্তব্য, এবার পদ্মার চরে সত্যি সত্যি বিরল প্রজাতির ওই পক্ষী দর্শনেই এসেছি। স্বপ্নেও ভাবিনি, পীরের চরে এত সব রহস্য আছে! দৈবাৎ গিয়ে পড়েছিলুম এবং সোনার কথা জানতে পারলুম কালু খাঁর মুখে। তবে হ্যাঁ; নটবর সিংয়ের কাছে তো বটেই, সদাশিববাবুর কাছেও কালু খাঁর গল্প শুনেছিলুম। সে সার্কাসে ছিল এক সময়, তাও শুনেছিলুম। তাই যখন পীরের জঙ্গলে জোড়া বাঘের গুজব শুনলুম, তখন মনে হল একটা যোগসূত্র থাকতেও পারে। সেজন্যে পীরের জঙ্গলে উঁকি মারতে গিয়েছিলুম। আমি কিন্তু আজও এ-কথা বিশ্বাস করিনি। এই ধুরন্ধর বৃদ্ধ গোয়েন্দাপ্রবরের সব ব্যাপারই রহস্যময়। এমন তো হতে পারে, বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে হারানো সোনার জন্য ভারত সরকার গোপনে তদন্ত করছিলেন এবং সুযোগ্য ঘুঘুমশাইটিকেই এ ব্যাপারে পদ্মার চরে যেতে অনুরোধ করেছিলেন!
আরও একটা কথা। খঞ্জ মানুষ ভূতোকে বেমক্কা দশ টাকা দান করাও কি কর্নেলের কুসংস্কার না কোনো গোপন অভিসন্ধি ছিল, বলা কঠিন।
৩.০৭ ভূতুড়ে এক কাকতাড়ুয়া
এমন যদি হয়, বেগুনখেতের কাকতাড়ুয়াটি নিঝুম জ্যোৎস্নায় রাতে ক্ষীণ সুরে গান গাইতে গাইতে চলাফেরা করে বেড়ায়, তা হলে সত্যিই ব্যাপারটা বড্ড ভয়-ভূতুড়ে হয়ে ওঠে। কিন্তু তার গায়ের জামায় আর বেগুনপাতায় রক্তের ফোঁটা থাকলে সে-একটা সাঘাতিক রহস্যই!
