বাঘটা নিচে ঝুরির চারপাশে ঘোরাঘুরি করছে আর ওপর দিকে মুখ তুলে যেন বেজায় গালমন্দ করছে। পস্তানি হচ্ছিল, যদি বুদ্ধি করে রাইফেলটা আনতুম! বন্দুকের ছররা গুলিতে ওর গায়ে আঁচড় পড়বে না। তবু বন্দুকের নল তাক করে আমিও বাঘটাকে ভয় দেখাতে শুরু করলুম।
মোহন বোকামি করে ছররা গুলি ছুঁড়ে বসবে না তো! তাহলে ওস্তাদরা টের পেয়ে দৌড়ে আসতে পারে।
মোহনের বন্দুকের আওয়াজ ভাগ্যক্রমে শোনা গেল না। ও বুদ্ধিমান ছেলে।
কতক্ষণ পরে বাঘটা একবার চাপা হালুম শব্দ করল। তখন দেখি, তার জোড়াটাও হালুম করে এসে গেল। দুটিতে আবার খেলা শুরু করল। গাছের ডালে বসে ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে এবার কর্নেলের মুণ্ডুপাত করছিলুম! কেন যে ওঁর সঙ্গে এমন করে চলে আসি যেখানে সেখানে, এবার হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি, বুড়ো গোয়েন্দাপ্রবর মোটেও বখাঁস দেখতে পদ্মার চরে আসেননি। ভেতরে অন্য উদ্দেশ্য ছিল।
এক এক সময় পশ্চিমে দূরে সম্ভবত রাক্ষুসির বাঁওড়ে কাশেম খাঁর স্পিড-বোটের গরগর শব্দ শোনা গেল। অমনি বাঘ দুটো তড়াক করে লাফিয়ে উঠে কান খাড়া করে দাঁড়াল। তারপর নিঃশব্দে সেদিকে চলে গেল।
সুযোগ বুঝে সাবধানে নেমে এলুম। জামা আর হাতের তালু ছিঁড়ে গেল। নেমেই চাপা গলায় ডাকলুম, মোহন! মোহন!
মোহনের সাড়া পাওয়া গেল একটু তফাতে গাছের ডগায়–এই যে আমি!
কাছে গিয়ে দেখি, একটা লম্বা গুঁড়িওয়ালা গাছের মগডালে প্রকাণ্ড হুতুমপাচার মতো বসে আছে সে। বললুম, নেমে এস শিগগির! অল ক্লিয়ার!
মোহন করুণ স্বরে বলল, নামতে পারছি না। পা পিছলে যাচ্ছে। লাফ দাও বরং!
ওরে বাবা! হাড়গোড় ভেঙে যাবে যে!
ভাঙবে না। ঝটপট লাফ দাও। মাটিটা নরম।
মোহন বলল, একটা মই খুঁজে আনো জয়ন্ত!
মই! অবাক হয়ে বললুম। এই বনবাদাড়ে কোথায় পাব! চড়তে পেরেছ যখন, নামতেও পারবে।
পারছি কই? চেষ্টা তো করছি!
খাপ্পা হয়ে বললুম, তাহলে থাকো! আমি কর্নেলের খোঁজে চললুম।
মোহন কঁদো কাঁদো গলায় বলল, যেও না জয়ন্ত, যেও না! ওরে বাবা! আমার বড় ভয় হচ্ছে।
ওকে না ডানপিটে ভেবেছিলুম! এত ভীতু, তা তো বুঝতে পারিনি। তাছাড়া গ্রামের ছেলে। গাছে চড়ার অভ্যাস থাকা উচিত। তার চেয়ে বড় কথা, গাছে চড়াটাই কঠিন, নামা, তো খুব সোজা।
রাগ করে কয়েক পা এগিয়েছি, পেছনে সড় সড় সড় ধপাস্ করে একটা শব্দ শুনে বুঝলুম মরিয়া হয়ে বেচারা নেমে পড়েছে।
মোহন এসে সঙ্গ নিল। বলল, বাস্! খুব শিক্ষা হল বটে! জীবনে এমন করে কখনও গাছে চড়িনি।
দু’জনে চারপাশে নজর রেখে হাঁটছিলুম। আর মাঝে মাঝে চাপা গলায় কর্নেলকে ডাকছিলুম। সাড়া নেই। তাহলে গাছে না চড়ে বুড়ো ঘুঘুমশাই পীরের বাড়িটায় গিয়ে ঢুকেছেন!
পীরের বাড়ির দরজা খোলা। ভাঙাচোরা অবস্থা। ভেতরে একটা উঠোন। খাপচা খাপচা জ্যোৎস্না পড়েছে। বারান্দায় উঠে দেখি, সেই ভুতো ঘরের ভেতর তেমনি চিত হয়ে পড়ে আছে। তবে কাটা ঠ্যাংটা নড়ছে না। তার নাক সমানে ডাকছে। লণ্ঠনটা তেমনি জ্বলছে।
লাল ভেলভেটে জরির কাজ করা একটা প্রকাণ্ড চাদরে পীরের কবর ঢাকা। হঠাৎ দেখি, কাপড়টা নড়ছে একপাশে। ভীষণ নড়তে শুরু করলে আঁতকে উঠে এতক্ষণে টর্চ জ্বাললুম। মোহন অস্ফুট স্বরে ‘ও কী’ বলেই চুপ করেছে। ওর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেছে। আমারও। টর্চের আলোয় এই তাজ্জব কাণ্ড দেখলে মাথা ঠিক রাখা কঠিন। কবরটা কি জ্যান্ত হয়ে উঠেছে? ভয়ে দম আটকে গেল।
তারপর ঢাকনাসুদ্ধ কবরের মাথার দিকটা মৃদু ঢঙ শব্দ করে বাক্সের ডালার মতো উঠে গেল। তারপর একটা টুপি পরা মাথা বেরুলো। তারপর যিনি বেরুলেন, তিনি আমার বহু বছরের গুরু ও বন্ধু মহাপ্রাজ্ঞ কর্নেলসায়েব! তবে তাঁর সাদা দাড়ি কবরের গুপ্ত সুড়ঙ্গের ময়লায় কালো হয়ে গেছে। তাকে যুবক দেখাচ্ছে। প্রথমে বললেন, আলো নেভাও ডার্লিং! চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। তারপর কবরের ঢাকনা আগের মতো ঠিকঠাক করে দিয়ে বললেন, বুলবন পেশোয়ারীর পঞ্চাশ কিলো সোনার বাঁট ঠিক জায়গাতেই আছে। আপাতত ওখানেই থাক। কাল নটবর সিং তার বাহিনী নিয়ে এসে বরং এর কিনারা করবেন।
আমরা হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছি।
কর্নেল বললেন, এখন সমস্যা হল ভুতোকে নিয়ে। ভুতো ঘুমের ভান করে পড়ে আছে কি না জানা দরকার। ওকে কাতুকুতু দাও তোমরা। দেরি কোরো না।
আমি আর মোহন কাছে যেতেই ভুতো তড়াক করে উঠে বসে হাউমাউ করে বলল, ওরে বাবা! কাতুকুতু দিলে আমি মরে যাব! দোহাই হুজুররা! ওই কাজটি করবেন না।
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, দেখেছ! ওকে লক্ষ করে এ রকমই সন্দেহ হয়েছিল। আমরা। চলে গেলে ও কবরের গুপ্ত সুড়ঙ্গে ঢুকত আর সোনাটা হাতিয়ে কেটে পড়ত।
ভুতো নাক-কান মলে বলল, ছি ছি! সে কী কথা। সায়েব আমাকে সকালে দশ টাকা ভিক্ষে দিয়েছিলেন।
কর্নেল বললেন, বাবা ভূতো! আরও বখসিস পাবে, আমাদের সঙ্গে চলো!
ভুতো ভয় পাওয়া মুখে বলল, কোথায় যাব হুজুর? আমাকে তাহলে বাদশা-বেগমের পেটে পাঠিয়ে দেবে কাল্লু খাঁ!
কাল্লু খাঁ! মোহন চমকে উঠল। কালু ডাকাত? এই পীরের থানের সেবককে বছর দশেক আগে সে খুন করে ফেরারি হয়েছিল না?
কর্নেল, কালু খায়ের কথা দাদুর কাছে শুনেছি। আগে নাকি সে সার্কাসের দলে খেলোয়াড় ছিল। বাঘের খেলা দেখাত। আশ্চর্য, ব্যাপারটা অনেক আগেই আমার বোঝা উচিত ছিল।
