টর্চের আলোয় সেই জাল কালীপদকে’ দেখতে পেয়েছিলুম। সবার আগে লণ্ঠন ফেলে দিয়ে সে পালাতে যাচ্ছিল। পাঁড়েজি তাকে ধরে ফেলল। কিন্তু বাকি লোকেরা খাঁটিয়া ফেলে ঝোঁপের মধ্যে উধাও হয়ে গেল। কর্নেল খাঁটিয়ার কাছে গিয়ে বললেন,–এই সেই ভূতুড়ে লাশ। সুখলাল! দেখো তো চিনতে পারো কি না!
সুখলাল লাশের মুখ দেখে আঁতকে উঠে বলল,–আরে! এ তো পরসাজি আছেন।
পাঁড়েজি গুফো লোকটার পিঠে রাইফেলের বাঁটের এক খোঁচা মেরে বললেন,–কর্নিলসাব! এই লোকটার নাম মগনলাল। দাগি খুনি। এলাকার ডাকুদের সর্দার!
অপর কনস্টেবল বলল,–হায় রাম! পরসাদজি তো খুব ভালো লোক ছিলেন। এই শয়তানটা ওঁকে খুন করল কেন?
কর্নেল বললেন, আমার ধারণা, এই প্রসাদজিকে ফাঁদে ফেলে মগনলাল খুন করেছে। ফঁদটা কীসের তা যথাসময়ে জানা যাবে। পাঁড়েজি, আপনি আসামিকে নিয়ে থানায় চলে যান। ও. সি. মিঃ সিংহকে খবর দিন।
পাঁড়েজি আঁতকে উঠে বলল,–না কর্নিলসাব! এই ডাকু বহত খতরনাক আছে। তার চেয়ে চৌবেজি থানায় গিয়ে খবর দিক। আমরা এখানে অপেক্ষা করি।
অপর কনস্টেবল চৌবেজি টর্চের আলো জ্বালতে-জ্বালতে কাঁধে বন্দুক রেখে যেভাবে হেঁটে গেল, মনে হল মগনলালের অনুচরদের আচমকা হামলার ভয়ে সে বেজায় আড়ষ্ট।….
কর্নেল বলেছিলেন, ফাঁদ পেতে প্রসাদজি নামে ওই ভদ্রলোককে মগনলাল খুন করেছে। আর বাংলোর চৌকিদার সুখলাল বলেছিল, পরসাদজি খুব ভালো লোক ছিলেন। কিন্তু পরদিন সকালেই আসল ঘটনা জানা গিয়েছিল। কীভাবে জানা গিয়েছিল, সেটাই শেষ চমক বলা যায়।
ভোর পাঁচটায় আমাকে বিছানা থেকে উঠিয়ে কর্নেল বলেছিলেন,–চলো জয়ন্ত! আমার রথ দেখা কলা বেচা দুই-ই হয়ে যাবে। সেই পোড়োবাড়িতে সারা রাত পুলিশের পাহারার ব্যবস্থা করতে বলেছিলুম। সেখানে গিয়ে দেখি কী অবস্থা। তারপর অর্কিডের খোঁজে একচক্কর ঘুরব। চিন্তা কোরো না। ফ্লাস্কভর্তি কফি আর প্রচুর বিস্কুট সঙ্গে আছে।
কী আর করা যাবে, কর্নেলের পাল্লায় পড়ে অনেকবার জেরবার হয়েছি। এবারও হতে হবে। হাঁটতে অবশ্য ভালো লাগছিল। বসন্তকালের ভোরবেলায় পাখিদের ডাকে কী এক মায়া আছে! সেই পোড়োবাড়িতে গিয়ে দেখছিলুম, ভিতরের বারান্দায় সেই জীর্ণ খাঁটিয়ায় একজন কনস্টেবল শুয়ে তখনও নাক ডাকাচ্ছে। বাকি তিনজন বারান্দায় মেঝের থামে হেলান দিয়ে বসে আছে। আমাদের সাড়া পেয়ে তারা উঠে দাঁড়াল। কর্নেলের প্রশ্নের জবাবে তারা একবাক্যে বলল, রাত্রে একটা চুহা অর্থাৎ ইঁদুরের শব্দও তারা শোনেনি।
কর্নেল এবার উঠোনের ঝোঁপ-জঙ্গলের ভিতর দিয়ে এগিয়ে গেলেন। তাকে অনুসরণ করব কি না ভাবছিলুম। কিন্তু তিনি উঠোনের কোণে সেই ইঁদারায় উঁকি মেরে কিছু দেখার পর সহাস্যে ডাকলেন,–জয়ন্ত! দেখে যাও!
গিয়ে দেখি ইঁদারার ওপাশে একটা ঝোঁপের গোড়ায় মোটা দড়ি বাঁধা আছে এবং দড়িটা ইঁদারার পাড়ে একটা ফাটলের মধ্যে দিয়ে তলায় নেমে গেছে। কর্নেলের টর্চের আলোয় দেখলুম, দড়ির শেষপ্রান্তে বাঁধা একটা কালো ব্যাগ ঝুলছে।
কর্নেল ব্যাগটা দড়ি ধরে টেনে তুললেন। ততক্ষণে দুজন কৌতূহলী কনস্টেবল এসে গেছে। তারা দুজনে হতবাক হয়ে ব্যাপারটা দেখছিল।
ব্যাগে তালা আঁটা ছিল। কর্নেল একটু হেসে বললেন,–ও. সি. মিঃ সিংহ এখনই এসে পড়বেন।
বললুম-ব্যাগে কী থাকতে পারে?
কর্নেল হাসলেন।–সম্ভবত মগনলাল ডাকুর ডাকাতি করা দামি কিছু জিনিস। ব্যবসায়ী রমেশ প্রসাদ এই চোরাই মাল কিনতে এসে খুন হয়েছে।
-খুনের কারণ কী?
-হ্যাঁ। তোমাকে ইচ্ছে করেই বলিনি। কারণ ভীমগড়ে কিছু-কিছু চমকের কথা দিয়েছিলুম তোমাকে। কাল রাতে মগনলালের কাছে পঞ্চাশ হাজার টাকার নোটের বান্ডিল পাওয়া গেছে। বান্ডিলগুলো তার জামার তলায় একটা কাপড়ে সারবন্দি অবস্থায় লুকানো ছিল। বুক থেকে পিঠ অবধি বেড় দিয়ে বাঁধা ছিল। টাকাটা সে প্রসাদজিকে খুন করে হাতিয়েছিল।
সেই সময় বাইরে জিপের শব্দ পাওয়া গেল। একটু পরে ও. সি. মিঃ সিংহ দুজন পুলিশ অফিসার এবং কনস্টেবলসহ বাড়িতে ঢুকে ব্যস্তভাবে বললেন,–মর্নিং কর্নেলসায়েব! ওখানে কী করছেন?
কর্নেল থামলেন।-মর্নিং মিঃ সিংহ! যা অনুমান করেছিলুম, তা সত্য হয়েছে। এখানে এসে ব্যাপারটা দেখে যান।
হ্যাঁ, কর্নেল ঠিকই বলেছিলেন। ব্যাগের তালা ভাঙতেই বেরিয়ে পড়ল কাপড়ের থলে ভর্তি একরাশ সোনার গয়না। হিরে বসানো একটা জড়োয়া নেকলেসও।
ও. সি. উত্তেজিতভাবে বললেন,–গত মাসে আহিরগঞ্জের একটা বাড়িতে ডাকাতি হয়েছিল। এগুলো সেই ডাকাতি করা মাল মনে হচ্ছে। আহিরগঞ্জের ধনী ব্যবসায়ী পাটোয়ারিজি ডাকাতি হওয়া জিনিসের যে লিস্ট দিয়েছিলেন, তা আমার মনে আছে। এই জড়োয়া নেকলেসটা দেখেই সব মনে পড়ে গেল!
এর পর আর কী! ভীমগড়ের চূড়ান্ত চমক আমাকে সত্যিই দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার জন্য রোমহর্ষক একটা স্টোরির মশলা উপহার দিয়েছিল। তখন কর্নেলের সঙ্গে পাহাড়ি জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে আর আমার এতটুকু দ্বিধা ছিল না। তাছাড়া ভীমগড়ের কালো দৈত্যের প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ।…
৩.০৬ পদ্মার চরে ভয়ঙ্কর
ডানপিটে বেপরোয়া মানুষদেরও অদ্ভুত অদ্ভুত কুসংস্কার থাকে। দুর্দান্ত শিকারি জিম করবেট মানুষখেকো বাঘ মারতে গিয়ে আগে একটা সাপ মারতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, আগে একটা সাপ
