কর্নেল আমার হাত থেকে টর্চ নিয়ে মৃতদেহটা দেখে বললেন, আমার এই এক দুর্ভাগ্য জয়ন্ত! যেখানে যাই, এক অদৃশ্য আততায়ী আমার সামনে একটা মৃতদেহ ছুঁড়ে ফেলে আমাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। যাই হোক। মৃতদেহটার কয়েকটা ফোটো তুলে নিয়ে কেটে পড়া যাক।
তার ক্যামেরায় ফ্ল্যাশবালব কয়েকবার ঝিলিক দিল।….
.
চৌকিদার সুখলাল সঙ্গে একজন লোক নিয়ে আমাদের খোঁজে আসছিল। বাংলোর কাছাকাছি তাদের সঙ্গে দেখা হল। সুখলালকে উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছিল। ‘কালা দেও’-এর পাল্লায় পড়ে আমাদের কোনও ক্ষতি হয়নি জেনে সে আশ্বস্ত হল।
বাংলোয় ফেরার পর আমরা ভেজা পোশাক বদলে নিলাম। সুখলাল কফি নিয়ে এল। কর্নেল তাকে জিগ্যেস করলেন,–বাঙালিটোলার শেষের দোতলা বাড়িটাতে কি কেউ থাকে?
সুখলাল অবাক হয়ে বলল,–না কর্নিলসাব!
-তুমি কালীপদ নামে বেঁটে মোটাসোটা কোনও বাঙালিকে চেনো?
সুখলাল একটু ভেবে নিয়ে বলল,–পাঁচবরস আগে কালীপদ ওই বাড়ির জিম্মাদার ছিল। লেকিন সে কলকাত্তা চলিয়ে গেছে। কালীপদ দুবলা আদমি ছিল। বুঢ়া ভি ছিল। লেকিন…
সে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন,–বাংলোর কেয়ারটেকার মোহনবাবু কী বাড়ি চলে গেছেন?
–হাঁ কর্নিলসাব।
–ওঁর অফিসের চাবি তাহলে উনি নিয়ে গেছেন?
–‘ডুপলিকাটু’ হামার কাছে আছে। কুছু দরকার হলে বলিয়ে সাব!
–টেলিফোন করতে চাই।
–কুছ অসুবিধা নাই।….
কর্নেল দ্রুত কফি শেষ করে তার সঙ্গে বেরিয়ে গেলেন। তিনি কাকে ফোন করতে যাচ্ছেন, তা জানতুম। একটা বেঁটে হোঁতকা-মোটা-ফো লোক কাউকে কোনও ছলে ওই পোডড়াবাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে খুন করেছে, এটা আমার কাছে স্পষ্ট। হঠাৎ আমরা গিয়ে পড়ায় যে লাশ ফেলে রেখে পালিয়ে গেছে, তা-ও বোঝা যাচ্ছে।
একটু পরে কর্নেল ফিরে এসে বললেন,–আশ্চর্য ব্যাপার জয়ন্ত। ভীমগড়ের পুলিশ ভূতপ্রেত বিশ্বাস করে কল্পনাও করিনি। ও. সি. ভদ্রলোক আমার কথায় হেসে অস্থির। বললেন, এর আগে বারদুয়েক কারা ওই পোড়োবাড়িতে আমাদের মতোই রক্তাক্ত লাশ দেখে থানায় খবর দিয়েছিল। পুলিশ গিয়ে তন্নতন্ন খুঁজে লাশ তো দূরের কথা, ছিটেফোঁটা রক্তও খুঁজে পায়নি।
অবাক হয়ে বললুম,–ভারি অদ্ভুত তো!
–হ্যাঁ। এদিকে সুখলাল ব্যাপারটা জেনে নিয়ে একই কথা বলল।
–কিন্তু আমরা তো রক্তাক্ত লাশ দেখেছি। আপনি ক্যামেরায় লাশটার ছবিও তুলেছেন।
কর্নেল গুম হয়ে একটু বসে থাকার পর বললেন,–আমি ও. সি. জয়রাম সিংহকে আমার ক্যামেরায় লাশের ছবি তোলার কথাও বলেছি। আমি খাপ্পা হয়ে মিঃ সিংহকে পুলিশসুপার মিঃ প্রশান্ত ত্রিবেদীর নাম করে বলেছি, মিঃ ত্রিবেদী আমার পরিচিত। তাকে খবরটা জানাতে বাধ্য হব। তা শুনে ও. সি. একটু ভড়কে গিয়ে অবশ্য নিছক দুজন আর্মড কনস্টেবল পাঠাতে রাজি হলেন।
-কর্নেল! আমার একটা সন্দেহ হচ্ছে।
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–কনস্টেবলরা পৌঁছনোর আগেই খুনি পোড়োবাড়ি থেকে লাশটা সরিয়ে গুম করে ফেলবে। এই তো?
-ঠিক ধরেছেন।
–কথাটা আমিও ভেবেছি। কাজেই আমাদের চুপচাপ বসে থাকা ঠিক হবে না। উঠে পড়ো। বেরুনো যাক। সঙ্গে এবার টর্চ নিতে ভুলো না!
–সেই পোড়োবাড়িতে যাবেন?
কর্নেল রহস্যময় ভঙ্গিতে হেসে বললেন, চলো তো! সুখলালকে সঙ্গে নেব। কারণ সুখলাল এবার আমাদের গাইড হবে।
দেখলুম, সুখলাল তখনই বল্লম আর টর্চ নিয়ে এল। তার সেই সঙ্গীকে বাংলোয় থাকতে বলে আমাদের সঙ্গে সে বেরিয়ে পড়ল।
.
ততক্ষণে আকাশ থেকে মেঘ সরে নক্ষত্র দেখা দিয়েছে। আমাকে অবাক করে সুখলাল আর কর্নেল উত্তরে ভীমগড় বসতির দিকে হাঁটছিলেন। লাশ আছে দক্ষিণে পরিত্যক্ত বাঙালিটোলার একটা জরাজীর্ণ বাড়িতে। আর আমরা তার উলটোদিকে কোথায় যাচ্ছি কে জানে! প্রশ্ন করতে গিয়ে থামতে হল। অদূরে স্ট্রিটল্যাম্পের ম্লান আলোয় দুজন সশস্ত্র কনস্টেবল আস্তে-আস্তে এগিয়ে আসছিল।
আমাদের দেখে তারা থমকে দাঁড়াল। সুখলাল বলল,–রাম-রাম পাঁড়েজি!
পাঁড়েজি হিন্দিতে বলল,–রাম-রাম সুখলাল ভাইয়া! তোমরা কোথায় যাচ্ছ? এঁরা কে?
–ইনিই কর্নির্লসাব। থানায় বড়বাবুকে লাশের খবর দিয়েছেন।
দুজন কনস্টেবলই খ্যাখ্যা করে হেসে উঠল। কর্নেল বললেন,–পাঁড়েজি! লাশ দেখবেন তো আমাদের সঙ্গে চলুন! দেরি করবেন না। সুখলাল। তুমি রাস্তা দেখিয়ে দেবে।
সম্ভবত বাঙালিটোলার পোড়াবাড়িতে যাওয়ার কষ্ট স্বীকার করতে হবে না ভেবেই সশস্ত্র কনস্টেবলদ্বয় খুশি হয়েছিল। এর পর কিছুটা এগিয়ে বসতি এলাকার সংলগ্ন ডান দিকের রাস্তায় সুখলাল আমাদের নিয়ে চলল। আমবাগান এবং ঘন গাছপালার মধ্য দিয়ে রাস্তাটা এগিয়ে গেছে। কিছুদূর চলার পর যেখানে পৌঁছলুম, সেখানে একটা ঝিল দেখা দিল। তারপরই পিছনের দিকে কোথাও ‘রামনাম সৎ হ্যায়’ চিৎকার শোনা গেল।
তখনই কর্নেল বললেন, আমাদের লুকিয়ে পড়তে হবে। শিগগির।
ঝোঁপের আড়ালে আমরা লুকিয়ে পড়লুম। ক্রমশ ‘রামনাম সৎ হ্যায়’ চিৎকার কাছেই শোনা গেল। কর্নেল পাণ্ডেজিদের চাপাস্বরে হিন্দিতে কিছু বললেন। তারপর খাঁটিয়ায় একটা মড়া চাপিয়ে লণ্ঠন হাতে কয়েকজন লোক এসে পড়তেই কর্নেল এবং কনস্টেবলদ্বয় ঝোঁপ থেকে বেরিয়ে এলেন। কর্নেল টর্চের আলো জ্বেলে উদ্যত রিভলভার হাতে গর্জন করে উঠলেন,–থামো! নইলে গুলি করব।
