পারলে তিনি কিছুতেই বাঘটা মারতে পারবেন না। ব্রিটেনের স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের ধুরন্ধর গোয়েন্দা কিলবার্ন কোনো হত্যা রহস্যের কিনারা করার আগে একটা ঘুঘু পাখি কিনে আকাশে উড়িয়ে দিতেন। তার বিশ্বাস ছিল, আগে একটা ঘুঘু পাখিকে মুক্তি না দিলে তার গোয়েন্দাগিরি ব্যর্থ হবে।
আমার বৃদ্ধ বন্ধু কর্নেল নীলাদ্রি সরকার ডানপিটে তো বটেই, তিনি শিকারেও যেমন দক্ষ, গোয়েন্দাগিরিতেও তেমনি ধুরন্ধর! কাজেই তাঁর ওই রকম একটা কুসংস্কার থাকা স্বাভাবিক।
হ্যাঁ, স্বাভাবিক। কিন্তু এতকাল তার সঙ্গে ঘোরাফেরা করেও সেটা টের পাইনি, এটাই আশ্চর্য! আসলে আমি এখনও ভেতরে ভেতরে যথেষ্ট বোকা, মুখে যতই চালাকির ভান করি না কেন।
ব্যাপারটা আপাতদৃষ্টে তেমন কিছু চমকপ্রদ নয়। কোঠারিগঞ্জ সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্পের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা পদ্মার চরগুলোর খবর নিচ্ছিলুম। ক্যাপ্টেন নটবর সিং বলছিলেন, এই ম্যাপটা বরং সঙ্গে রাখুন আপনারা। চিহ্ন দেওয়া এই চরগুলো আমাদের ভারতের। দিনের বেলা নিশ্চিন্তে ঘুরতে পারেন। তবে কখনও রাতবিরেতে যাবেন না। ডাকাত আর স্মাগলারদের তখন গতিবিধি শুরু হয়। আমাদের জওয়ানদের সঙ্গে অনেক সময় সংঘর্ষ বাধে।
কর্নেল মন দিয়ে ম্যাপটা দেখছিলেন। দেখার পর বললেন, আচ্ছা হাবিলদার সায়েব, এই একটা প্রকাণ্ড চর আঁকা আছে দেখছি। এর গায়ে লাল চিহ্ন দেওয়া কেন?
নটবর সিং একটু হেসে বললেন, ওটা ডিসপুটেড, অর্থাৎ বিতর্কিত চর। ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে ওই চরটা নিয়ে ঝগড়া আছে। অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু মীমাংসা হয়নি এখনও। শুনছি আগামী মে মাসে দিল্লীতে আবার দু’দেশের মধ্যে বৈঠক বসবে। তখন ‘পীরের চর’ নিয়ে কথা উঠবে।
কী চর বললেন? ‘পীরের চর’ না কী যেন? কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন!
নটবর সিং বললেন, হ্যাঁ। পীরের চর। চরটা বেশ বড়। প্রায় সবটাই ঘন জঙ্গলে ঢাকা। সেই জঙ্গলের ভেতর এক পীর বাবার কবর আছে। কবরের ওপর ভাঙাচোরা একটা দালান বাড়ি রয়েছে। আগে ওখানে পদ্মার ওপার-এপার দুই পারের হিন্দু-মুসলিম ভক্তরা মানত করতে যেত। তারপর নাকি কী সব অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে লাগল। ভয়ে লোকেরা পীরের থানে যাওয়া ছেড়ে দিল। জঙ্গল গজিয়ে গেল।
কর্নেল ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, অদ্ভুত ঘটনাটা কী?
নটবর সিং হাসতে লাগলেন–একজোড়া বাঘ।
বাঘ! কর্নেল অবাক হয়ে বললেন। বাঘ তো জঙ্গলেই থাকে। কিন্তু অদ্ভুত ঘটনা বলছেন কেন?
অদ্ভুত এ কারণে যে, ওই একজোড়া বাঘ মাঝে মাঝে মানুষের গলায় শাসাতো। নটবর সিং তামাশার ভঙ্গিতে বললেন। আমি স্যার পীরের চরে গোপনে বার দুই গেছি, কিন্তু বাঘ তো দূরের কথা, একটা শেয়ালও দেখিনি। এ তল্লাটের লোকের কাছেই ব্যাপারটা শুনেছিলাম। অথচ এ কিন্তু সত্যি, পীরের চরে আরও ভুলে কেউ পা বাড়ায় না।
আমি এতক্ষণ কান খাড়া করে শুনছিলুম। এবার বললুম, কেউ বাঘের চামড়া পরে বাঘ সেজে হয়তো তোককে ভয় দেখাত।
নটবর সিং বললেন, সে কথা আমিও ভেবেছি। স্মাগলারদের ঘাঁটির কথাও ভেবেছি। তারাই হয়তো ওভাবে ভয় দেখাত। কিন্তু লোকের মনে একবার আতঙ্ক ঢুকলে আর তো বেরোয় না! পীরের চরে যাওয়া সেই থেকে বন্ধ। আর এখন তো দু’দেশের সরকারই মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত পীরের চরে কাউকে যেতে নিষেধ করে দিয়েছেন।
কর্নেল ম্যাপ থেকে মুখ তুলে কী দেখছিলেন। গঞ্জের বাইরে এই ক্যাম্প। আমবাগানের ভেতর কয়েকটা তাঁবু। নীচে পদ্মা বয়ে যাচ্ছে। বসন্তকালের সকালের রোদে নদীর জল আর মাঝে মাঝে ধূ-ধূ চর, কোথাও চরে ধূসর ঘাসবন, একটা বিরাট বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে দেখে মনে হচ্ছে যেন সমুদ্র আর মরুভূমি পাশাপাশি শুয়ে আছে।
কর্নেল হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন, ওহে! শোনো–শোনো!
ক্রাচে ভর করে একটা ভিখারি গোছের নোংরা ছেঁড়াখোঁড়া পোশাকের লোক যাচ্ছিল গঞ্জের বাইরের দিকে। কর্নেলের ডাকে সে থমকে দাঁড়াল। তারপর আমাদের দিকে আসতে থাকল।
খোঁড়া লোকটি তো হতবাক। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। কর্নেল পকেট থেকে পার্স বের করে আস্ত একটা দশ টাকার নোট তার হাতে গুঁজে দিলেন। লোকটার চোখ আরও বড় হয়ে গেল। কর্নেল তার হাতে হাত রেখে ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, গুড বাই, মাই ফ্রেন্ড! আবার দেখা হবে।
লোকটি ক্যাপ্টেন সিং আর সেপাইদের দিকে আড়চোখে তাকাতে তাকাতে যেভাবে টাট্ট ঘোড়ার মতো ক্রাচ খটমটিয়ে দ্রুত চলে গেল, বুঝলুম-এত বেশি টাকা সে জীবনে ভিক্ষে পায়নি এবং ভেবেছে, হাবিলদার আর সেপাইদের এ ব্যাপারে মনঃপুত নয়-এক্ষুনি তাই ভাগ চেয়ে বসতেও পারে। অতএব কেটে পড়াই ভাল।
নটবর সিং আমার মতো, অবাক হয়েছিলেন। বললেন, ওই বজ্জাতটাকে দশ টাকা ভিক্ষে দিলেন স্যার, ও তো এবার নেশা-ভাঙ করবে আর জুয়ো খেলতে যাবে। ওকে আপনি চেনেন না!
কর্নেল মৃদু হেসে বললেন, ও কিছু না। আচ্ছা হাবিলদার সায়েব, বেলা বাড়ছে। আমরা তাহলে আসি। এস জয়ন্ত!
ক্যাম্পের সবাই কেমন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। আমরা চলতে থাকলুম পদ্মার পাড়ে। কিছুটা এগিয়ে গিয়ে কর্নেল বললেন, সচরাচর কেউ ভিখিরিকে দশ টাকা দেয় না। তাই ওরা অবাক হয়েছে। বুঝলে জয়ন্ত?
বললুম, অবাক আমিও কম হইনি।
ডার্লিং! কর্নেল সস্নেহে আমার একটা হাত হাতে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, তুমি ভালই জানো, ইচ্ছে থাকলেও খুব একটা দান-ধ্যানের ক্ষমতা আমার নেই। তবে কোনো শুভ কাজে বেরুনোর আগে হঠাৎ কোনো প্রতিবন্ধীর সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে সেটাকে আমি শুভ লক্ষণ বলে মনে করি। বহুবার বহু ব্যাপারে ঠিক বেরুনোর মুখে অন্ধ, খোঁড়া কিংবা বিকলাঙ্গ মানুষ দেখতে পেলেই সে কাজটা সফল হয়েছে। তাই আমি এসব সময়ে তেমন কোনো মানুষ দেখতে পেলে দশ টাকা কেন, আরও বেশি দান করতে রাজি।
