এরই মধ্যে অন্ধকার ঘনিয়েছে। আকাশ মেঘে ঢাকা। বৃষ্টি সমানে ঝরছে। মাঝে-মাঝে বিদ্যুৎ ঝিলিক দিচ্ছে। তবে কালো দৈত্যের হাঁকডাকে আর তত জোর নেই।
কিছুক্ষণ পরে সেই ভাঙাচোরা পিচরাস্তায় পৌঁছলুম। আবার বৃষ্টিতে বাগে পেল। বুললুম,–কর্নেল! বরং সেই বাঙালিটোলার কোনও ঘরে আশ্রয় নিয়ে মাথা বাঁচানো যাক। বৃষ্টি ছাড়লে বেরিয়ে পড়ব।
কর্নেল সায় দিলেন,–কথাটা আমিও ভেবেছিলুম। শেষ দিকটায় একটা বাড়ি চোখে পড়ল। জরাজীর্ণ বাড়িটা দোতলা। কাছাকাছি যেতেই দোতলার ডানদিকের জানলার ফাঁকে আলো দেখতে পেলুম। বললুম, বাড়িটাতে লোক আছে। দোতলায় আলো জ্বলছে।
দেখেছি।-বলে কর্নেল বারান্দায় উঠলেন।
আমিও উঠলুম। কিন্তু বারান্দার ছাদ ফাটাফুটো। ফোঁটা-ফোঁটা নোংরা জলের উপদ্রবে অতিষ্ট হয়ে বললুম,–কর্নেল! বাড়ির লোকেদের ডাকা উচিত। অন্তত ভিতরে কিছুক্ষণ আশ্রয়ের সুযোগ পাব।
কর্নেল এই অবস্থাতেও হাসলেন,–ঠিক বলেছ। এক কাপ গরম চা-ও মিলতে পারে। নাঃ, কফির আশা না করাই ভালো।
তিনি দরজায় ধাক্কা দিয়ে ডাকাডাকি শুরু করলেন। কিছুক্ষণ পরে ভিতরে আলোর ছটা চোখে পড়ল। তারপর দরজা খুলে গেল। একজন বেঁটে মোটাসোটা লোক হাতের হেরিকেন একটু তুলে বাংলায় বলল,–বলুন আজ্ঞে।
কর্নেল বললেন, আমরা কলকাতা থেকে বেড়াতে এসেছি। পথে ঝড়বৃষ্টিতে কী অবস্থা হয়েছে, তা দেখতেই পাচ্ছ! বারান্দায় দাঁড়াতে পারছি না। এ বাড়ির মালিক কে?
-মালিক আজ্ঞে কলকাতায় থাকেন। আমি এই বাড়ি পাহারা দিই।
-তুমি তো বাঙালি মনে হচ্ছে। এই বিপদে আমাদের একটু সাহায্য করো। আমাদের ভিতরে বসতে দাও। বৃষ্টি ছাড়লেই আমরা চলে যাব।
লোকটার গোঁফে যেন পোকা আটকেছে, এমন ভঙ্গিতে গোঁফ ঝেড়ে একটু দ্বিধা দেখিয়ে বলল, –তা-তা বসতে পারেন আজ্ঞে। কিন্তু আর লণ্ঠন তো নেই। এটা নিয়ে আমাকে দোতলায় যেতে হবে।
-লণ্ঠনের দরকার নেই। তুমি তোমার কাজে যাও। আমাদের এই টর্চই যথেষ্ট।
বলে কর্নেল তার পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকলেন। আমি তাকে অনুসরণ করে গিয়ে দেখলুম, ঘরে কয়েকটা নড়বড়ে চেয়ার আর টেবিল ছাড়া কোনও আসবাব নেই। দুজনে মুখোমুখি বসলুম। কর্নেলের তাগড়াই শরীরের ওজন চেয়ারটা সামলে নিল। তিনি বললেন,–তোমার নাম কী?
লোকটা তখনও কেমন অবাক-চোখে তাকিয়ে ছিল। বলল,–আজ্ঞে আমি কালীপদ।
–আচ্ছা কালীপদ, দুকাপ চায়ের ব্যবস্থা করা যায় না? ভালো বকশিস পাবে।
কালীপদ তার গোঁফ থেকে আবার পোকা বের করার ভঙ্গি করল। তারপর বিরসমুখে মাথা নেড়ে বলল, আজ্ঞে! চা-ফা আমার চলে না। ওই যাঃ! তরকারিটা পুড়ে গেল হয়তো!–বলে সে হন্তদন্ত ভিতরে চলে গেল। তারপর ভিতরের কপাট ওদিক থেকে বন্ধ করার শব্দ হল।
একটু পরে কানে এল টেবিলে টুপটুপ করে যেন জল ঝরছে। বললুম,–কর্নেল! ছাদ ভেঙে পড়বে না তো? একতলার ছাদের ওপর দোতলার ছাদ আছে। মনে হচ্ছে দুটো তলাই মেরামতের অভাবে ফেটে গেছে।
কর্নেল সবে চুরুট ধরিয়েছিলেন। আমার কথা শুনে টর্চ জ্বেলে টেবিলটা দেখলেন। বললেন, –ঠিক বলেছ!
কর্নেল টর্চের আলো নেভাননি। আমি টেবিলের দিকে তাকিয়ে একটু অবাক হয়ে বললুম, জলের ফোঁটা লালরঙের কেন?
–আগের দিনে চুনসুরকির মশলা দিয়ে বাড়ি তৈরি হতো। সুরকিগুঁড়ো হতে পারে।
কর্নেলের হাত থেকে টর্চ নিয়ে সিলিঙে আলো ফেলে দেখলুম, কড়ি-বরগার ওপর সাজানো টালির একটা ফাটল দিয়ে লালরঙের তরল পদার্থটা পড়ছে।
কর্নেল বললেন,–ব্যাটারি শেষ হয়ে যাবে। টর্চ নেভাও।
টর্চের আলো টেবিলে ফেলে আঙুল দিয়ে লাল রঙটা পরীক্ষা করে বললুম,–কর্নেল! সুরকির গুঁড়ো কি এমন আঠালো হয়?
মাই গুডনেস!–বলে কর্নেল আমার হাত থেকে টর্চ নিয়ে সিলিং এবং টেবিলের ওপরটা পরীক্ষা করলেন। তারপর চাপাস্বরে বলেন,–তুমি হয়তো ঠিক বলেছ জয়ন্ত! বৃষ্টিটা একটু কমেছে মনে হচ্ছে। কালীপদকে ডাকা যাক!
তিনি উঠে গিয়ে ভিতরের দরজা খোলার চেষ্টা করলেন। খুলল না। তখন হাঁক দিলেন, কালীপদ! কালীপদ!
কোনও সাড়া এল না! আরও কয়েকবার ডাকাডাকির পর কর্নেল কপাটে সজোরে তার মিলিটারি লাথি মারলেন। তিনটে লাথির পর কপাট ভেঙে পড়ল। কর্নেল চাপাস্বরে বললেন, –জয়ন্ত! তোমার ফায়ার আর্মস রেডি রাখো। আমার পিছনে এসো। সাবধান! চারদিকে লক্ষ্য রাখবে।
কর্নেল এক হাতে তার রিভলভার অন্যহাতে টর্চের আলোয় ভিতরটা দেখে নিলেন। ঘরে একটা খাঁটিয়া পড়ে আছে। সেটা কেউ বহুদিন যাবৎ ব্যবহার করেছে বলে মনে হল না।
সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে যে ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে আলো দেখেছিলুম, সেই ঘরটাও ফঁকা। কোনও আসবাব নেই। তাহলে কালীপদ লণ্ঠন নিয়ে এ ঘরে কী করছিল?
কথাটা জিগ্যেস করার সুযোগ পেলুম না। কর্নেল পরের ঘরের দরজার সামনে গিয়ে বললেন,–এই ঘরের নিচেই আমরা ছিলুম। এ ঘরে দেখছি তালা আঁটা আছে। এক মিনিট! তুমি টর্চটা ধরো। জ্বেলে রাখো।
কর্নেল তার পিঠে আঁটা কিটব্যাগ থেকে একটা অদ্ভুত গড়নের প্লাস বের করলেন। তারপর সেটা দিয়ে কী কৌশলে তালা খুললেন কে জানে? কপাটদুটো ঠেলে ভিতরে ঢুকলেন তিনি। আমার হাতে টর্চ। আলো ফেলে যা দেখলুম, তা কর্নেলের পাল্লায় পড়ে অনেকবার আমাকে দেখতে হয়েছে।
মেঝেয় একটা রক্তাক্ত মৃতদেহ উপুড় হয়ে পড়ে আছে। পরনে প্যান্ট আর স্পোর্টিং গেঞ্জি।
