–ওই দ্যাখো। একটা ভাঙা ফটকের গায়ে এখনও মার্বেল ফলক আটকে আছে। ফলকে পশ্চিমের পাহাড়ের ওপর থেকে সূর্য এখনও প্রচুর আলো ফেলেছে।
উঁচু মাটিতে উঠে গিয়ে ফলকটা দেখে এলুম। বললুম,–কী আশ্চর্য! বাংলায় লেখা আছে ‘সন্ধ্যানীড়। তলায় কী নাম লেখা আছে, পড়া গেল না। শ্যাওলা পড়েছে।
কর্নেল এবার হাঁটার গতি দ্রুত করে বললেন, এটা একসময় ছিল ভীমগড়ের বাঙালিটোলা।
-কিন্তু বাঙালিরা সব ফেলে রেখে পালিয়ে গেছে কেন?
–সম্ভবত তাদের সন্তান-সন্ততি ইউরোপ-আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছে। নয়তো কলকাতায় সুখে বসবাস করছে। আসলে বাঙালি এখন এসব মুলুকের প্রকৃতির চেয়ে আরও সুন্দর সেজেগুজে থাকা প্রকৃতির খোঁজ পেয়ে গেছে। লক্ষ্য করছ না? কী এলোমেলো জঙ্গল, বেখাপ্পা টিলা আর একঘেয়ে দৃশ্য!
কিছুক্ষণ পরে কর্নেল রাস্তাটা ছেড়ে ডানদিকে পশ্চিমে এবড়োখেবড়ো গেরুয়ামাটির পায়ে-চলা রাস্তায় পা বাড়ালেন। রাস্তাটা অস্বাভাবিক নির্জন। ক্রমশ উঁচুতে উঠে গেছে এবং সামনে-দুরে কালো একটা পাহাড়ের মাথা সূর্য ততক্ষণে ছুঁয়ে ফেলেছে। দুধারে নানান গাছের জঙ্গল আর ঝোঁপঝাড়। কোথাও ফাঁকা ঢালু মাঠে ছোটবড় নানা গড়নের পাথর আর ঝোঁপ।
কর্নেল সামনে বাঁদিকে জঙ্গলে ঢাকা একটা টিলার দিকে ঘুরে বললেন,–ইংরেজি কাগজের সেই প্রকৃতিবিদ যে নির্দেশ দিয়েছেন, তাতে এই টিলার গায়েই অর্কিডের খোঁজ পাওয়ার কথা। তুমি এখানে অপেক্ষা করো। আমি দেখি, তার খোঁজ পাই নাকি।
বলে তিনি টিলায় চড়তে গিয়ে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ালেন। মুচকি হেসে বললেন,–সাবধান জয়ন্ত! ওই পশ্চিমের উঁচু পাহাড়ের দিকে লক্ষ্য রাখবে। কালো দৈত্যটা দেখতে পেলেই আমাকে ডাকবে।
হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম। কর্নেল টিলার জঙ্গলে উধাও হয়ে গেলেন। এইসব জঙ্গলে হিংস্র জন্তু থাকা সম্ভব। কালো দৈত্যের চেয়ে তারাই আপাতত আমার কাছে সাংঘাতিক। মহুয়ার ফল পাকতে এখনও দেরি আছে। কিন্তু বুনো ভালুক কী অত বোঝে? পাশের ওই মহুয়াগাছের দিকে হানা দিতে এসে আমাকে দেখতে পেলেই দাঁত-নখ বের করে ঝাঁপ দেবে।
এইসব ভেবে প্যান্টের পকেট থেকে রিভলবার বের করে তৈরি হয়ে থাকলুম। অবশ্য মাঝে-মাঝে পশ্চিমের পাহাড়ের দিকটা দেখে নিচ্ছিলুম। সূর্য এখন পাহাড়ের আড়ালে নেমে গেছে। চারদিকে ধূসরতা ক্রমে গাঢ় হয়ে আসছে।
কতুক্ষণ পরে কর্নেলকে দেখতে পেলুম। তিনি অমন পড়িমরি করে টিলার জঙ্গল ভেঙে নেমে আসছেন কেন?
অবাক হয়ে চেঁচিয়ে বললুম,–কী হয়েছে?
কর্নেল আমার কাছাকাছি এসে বললেন,–জয়ন্ত! দৌড়তে হবে। কুইক!
–ব্যাপার কী? বাঘ-ভালুক নাকি?
–কালো দৈত্য!
–তার মানে?
–তোমাকে পশ্চিমের পাহাড়ের দিকে লক্ষ্য রাখতে বলেছিলুম। তুমি এত বোকা–তা ভাগ্যিস টিলার ওপর থেকে আমার চোখে পড়েছিল।
কর্নেল প্রায় দৌড়নোর ভঙ্গিতে উতরাই পথে নামতে-নামতে কথাগুলো বলছিলেন। ঘুরে একবার পশ্চিমের পাহাড়ের দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল, কালো মেঘ দ্রুত ছড়িয়ে আসছে। তারপরই বিদ্যুতের ঝিলিক এবং কানে তালা ধরানো গর্জন শোনা গেল।
দৌড়তে-দৌড়তে বললুম,–ওটা তো মেঘ!
কর্নেল ততক্ষণে ডানদিকে ফাঁকা মাঠে নেমে গেছেন। তারপরই কানে এল, অস্বাভাবিক একটা শনশন-গরগর গর্জন। সেই সঙ্গে পিছনে কোথাও বাজ পড়ল।
কর্নেল একটা ঝোঁপের গোড়া দু-হাতে আঁকড়ে ধরে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লেন। এ অবস্থায় তাঁর মতো আমিও পাশে একটা ঝোঁপের গোড়া দু-হাতে চেপে ধরে উপুড় হলুম। এরপর যা ঘটতে থাকল, তা যেন মহাপ্রলয়। ঝড়, বৃষ্টি আর বজ্রপাত। তার চেয়ে সাংঘাতিক ঘটনা, যে ঝোঁপ আঁকড়ে ধরেছি, সেটা যেন আমাকে সুষ্ঠু উড়িয়ে নিয়ে যাবে এবং শিকড় উপড়ে যাবে, ঝড়ের এমন প্রচণ্ড গতিবেগ।
কর্নেলের দিকে তাকাব কী, চোখ খোলা যাচ্ছিল না। বৃষ্টির ধারালো ফোঁটার সঙ্গে ঝড়ে ওড়া বেলেপাথরের টুকরো আর ঝাঁকে-ঝাঁকে কাঁকর আমার ওপর মুঠো-মুঠো ছুঁড়ে মারছিল সেই ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক শক্তি। ততক্ষণে হাড়ে-হাড়ে বুঝতে পেরেছি, চৌকিদার সুখরামের কাছে শোনা সেই ‘কালা দেও’ প্রকৃতপক্ষে কী।
কতক্ষণ কালো দৈত্যের এই তাণ্ডব চলেছিল জানি না, একসময় কর্নেলের ডাকে অতিকষ্টে চোখ খুলে তাকালুম। কর্নেল ভিজে একেবারে জবুথবু। আর ঝড়টা নেই। কিন্তু বৃষ্টি ঝরছে। কর্নেল বললেন,–উঠে পড়ো জয়ন্ত! দৈত্যটা কেটে পড়েছে। কিন্তু বৃষ্টিতে বেশিক্ষণ ভেজা ঠিক নয়।
উঠে দাঁড়িয়ে টের পেলুম সারা শরীর ব্যথায় আড়ষ্ট। কর্নেলকে অতিকষ্টে অনুসরণ করলুম। গেরুয়া মাটির রাস্তা কাদা হয়ে গেছে। কর্নেল এবার পকেট থেকে টর্চ বের করে জ্বেলে বললেন,–কাদায় হাঁটতে অসুবিধে হবে। এসো, পাশের শালবনের ভিতর দিয়ে এগিয়ে যাই। তোমার টর্চ আনননি?
আমার বৃষ্টিভেজা শরীর ঠান্ডায় কাঁপছিল। বললুম,ভুলে গেছি। তখন কি জানতুম….
কর্নেল আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,–ঠিক আছে। আমার পিছনে এসো। ডাইনে বাঁয়ে লক্ষ্য রাখবে। এ সময় খুদে জন্তু-জানোয়ারের লোভে পাইথন সাপ বেরিয়ে পড়ে।
সাহস দেখিয়ে বললুম,–ফায়ার আর্মসের গুলিতে পাইথনের মাথা গুঁড়িয়ে দেব কর্নেল! আমি এখন মরিয়া হয়ে উঠেছি।
কর্নেল বললেন,–বাঃ! এই তো চাই। ভীমগড়ের প্রথম চমক এটা।
