বাধা দিয়ে বললুম,–অর্কিডের ভেতর বইটা লুকনো ছিল তাহলে?
ধুরন্ধর বৃদ্ধ কোনো জবাব দিলেন না। বইটা টেনে নিলুম হাত থেকে। চোখ বুজে চুরুটে টান দিয়ে বললেন, আগে পরিশিষ্টটা পড়ো, শুনি।
পড়তে শুরু করলুম। জায়গায়-জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। সবটা পড়া যায় না।
…ভবিষ্যৎ বংশধরদিগের প্রতি উপদেশদান নিমিত্ত কহি যে, সকল ধর্মকে শ্রদ্ধা করিবেক। বিশেষত কহি যে যিশুখ্রিস্টও ঈশ্বরের অবতার বলিয়া অস্মদেশে স্বীকৃত হইয়াছেন। তাঁহার শোণিতে মনুষ্যজাতির পাপ ধৌত হইয়াছে। অপিচ যে ২ জড়বস্তুসমুদয় তাহার শোণিতপ্রাপ্ত হইয়াছে, উহারা জড়ত্বনাশ হেতু ধন্য হইয়াছে।… উদ্যানে পক্ষীসকল বিচরণ করে। উহারা পঞ্চ প্রকার পঞ্চরূপের প্রতীক। সেই পঞ্চরূপ হইল পঞ্চবাণ। খ্রিস্টের শোণিতপ্রাপ্ত পঞ্চবাণ.. উদ্যানের শোভাস্বরূপিণী অপ্সরার রক্ষণাবেক্ষণ নিমিত্ত কহি যে উহার অনিন্দ্যসুন্দর আননে আত্মবলিদানের স্পর্শগুণ বিধায় উহা ধন্য। বহু প্রযত্নে উহাকে প্রতিষ্ঠা করিয়াছি।…
কর্নেল সোজা হয়ে বসলেন। বইটা আমার হাত থেকে নিয়ে পরিশিষ্ট পড়তে শুরু করলেন। তারপর বললেন,–জয়ন্ত, সম্ভবত এখানেই রাম শর্মা কী যেন আভাস দিয়েছেন।… অপ্সরামূর্তি–মানে নিশ্চয় ফোয়ারার মাথায় ওই মূর্তিটা। পাঁচকোণা ফোয়ারা।… রক্ষণাবেক্ষণের নির্দেশ দিচ্ছেন ভবিষ্যৎ বংশধরদের।… উহার অনিন্দ্যসুন্দর আননে আত্মবলিদানের স্পর্শগুণ… জয়ন্ত! একথায় কি যিশুর ক্রুশে আত্মবলিদান বোঝাচ্ছে না?… কিন্তু কথাটা লক্ষ করো। আননে। তার মানে মুখে। মুখে মানে মাথার ভেতর…!
কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন উত্তেজিতভাবে। আমারও মাথার ভেতর একটা সাড়া জাগল। বললাম,–কিন্তু ফোয়ারার ওই অপ্সরার মাথাই তো নেই। কবে ঝড়ের সময় গুঁড়ো হয়ে গেছে। প্রণবশংকর বলছিলেন না?
কিন্তু তাহলে পেরেকটা নিশ্চয় কেউ পেয়েছিল। দেখেও কিছু টের পায়নি। কর্নেল অস্থির হয়ে বললেন। একটা মূল্যবান ঐতিহাসিক জিনিস!
বাইরে জুতোর শব্দ শোনা যাচ্ছিল। তারপর টর্চের আলো দেখলুম। কেউ ভারী গলায় বলল,–কোন ঘরে?
গঙ্গাধরের কথা শোনা গেল,–ওই যে স্যার, হ্যারিকেন জ্বলছে।
কর্নেল দরজায় উঁকি মেরে বললেন,–মিঃ সান্যাল নাকি? চলে আসুন।
হ্যাল্লো ওল্ড ডাভ! একজন পুলিশ অফিসার ঘরে ঢুকে কর্নেলের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলেন। আরও চারজন পুলিশ অফিসার তার পেছন-পেছন ঘরে ঢুকলেন। সঙ্গে-সঙ্গে বুঝলুম গত দু-ঘণ্টা ধরে গোয়েন্দাপ্রবর শুধু গোবিন্দের সঙ্গে আড্ডা দেননি, এঁদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন।
কর্নেল বললেন,–মিঃ সান্যাল, আলাপ করিয়ে দিই। আমার তরুণ সাংবাদিক বন্ধু জয়ন্ত চৌধুরি। আর জয়ন্ত, ইনি পুলিশ সুপার মিঃ অজিতেশ সান্যাল।
অন্যান্যদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয়ের পর কাজের কথা শুরু হল। থানা অফিসার ইন্দ্রজিৎ ভদ্র বললেন,–পরিতোষকে মাঠে মিঃ ব্যানার্জির ফার্মে পাওয়া গেছে। কর্নেল, আপনার অনুমান কাঁটায়-কাঁটায় মিলে গেছে। এইমাত্র ওকে পাকড়াও করে সোজা আসছি। আসামি এতক্ষণ থানার লক-আপে।
কর্নেল বললেন,–এই নিন মার্ডার উইপন। ফরেনসিকে পাঠাতে হবে। ওতে রক্ত আর খুনির হাতের ছাপ আছে। পাকা সাক্ষী গোবিন্দ-মালিও।
কাগজের মোড়কে ভরা শাবলটা একজন অফিসার সাবধানে নিয়ে গেলেন। এতক্ষণে প্রণবশংকর নেমে এলেন। হাঁফাতে-হাঁফাতে বললেন,–রাস্কেল খুনিটা ধরা পড়েছে? ধরা পড়েছে কালসাপটা?
মিঃ সান্যাল হাসতে-হাসতে বললেন,–কিছুক্ষণ আগে। আপনার ফার্ম হাউসে গিয়ে রাত কাটাবে ভাবছিল। আগে থেকে ওত পেতে ছিল আমাদের লোকজন। ভাববেন না, আপনি নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমোন গিয়ে।
প্রণবশংকর বসলেন। বললেন,–চায়ের ব্যবস্থা হচ্ছে। আপনারা একটু বসুন দয়া করে।
কর্নেল বললেন,–এই দিকটা আমি এখানে আসার পরও ভাবিনি। বোম্বের রোডরিগেরই লোক এখানে আছে ভেবেছিলুম। কিন্তু ভেবে পাচ্ছিলুম না, বোম্বে থেকে ওর পক্ষে এত দ্রুত এখানে যোগাযোগ–তাছাড়া বইটা চুরির খবর পাওয়া, সবই কেমন গোলমেলে মনে হচ্ছিল। বিকেলে ভৈরবগড় গিয়ে রাজাবাহাদুরের কাছে যখন জানতে পারলুম, মিঃ ব্যানার্জি বইটা ছাপার ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছেন, তখনই টের পেলুম মিঃ ব্যানার্জির পেছনে থেকে কেউ তাগিদ দিচ্ছে। বহু ভাবনা-চিন্তার পর বইটা এবার তার খুব দরকার হয়েছে। যাই হোক, পরিতোষ মরিয়া হয়ে প্রমাণ লোপের চেষ্টা করছিল লোডশেডিংয়ের সুযোগে। বইটাও শিরীষ গাছ থেকে হাতিয়ে নিয়ে যেত। কিন্তু আমি সেখানে থাকায় পারেনি। ভেবেছিল পরে একসময় এসে নিয়ে যাবে। এবার একটা কথা জিজ্ঞেস করি মিঃ ব্যানার্জিকে।
প্রণবশংকর বললেন,–বলুন কর্নেল।
–ফোয়ারার অপ্সরার মাথা ১৯৪২ সালের ঝড়ে ভেঙে গিয়েছিল। তখন আপনার বয়স কত?
–তা চব্বিশ-পঁচিশ হবে।
–তাহলে তো আপনার মনে থাকা উচিত। অপ্সরার মাথা ভেঙে যাওয়ার পর কোনো পেরেক জাতীয় কিছু দেখেছিলেন ওর ভেতর?
–হ্যাঁ–হ্যাঁ। গলার ভেতর লোহার শূল মতো বসানো ছিল-মুণ্ডটা জোড়া দেওয়ার জন্য। কর্নেল শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বললেন,–না মিঃ ব্যানার্জি, ওটাই সেই পবিত্র ঐতিহাসিক পেরেক।
বলেন কি!–প্রণবশংকর অবাক হয়ে বললেন। তাই বুঝি ওটার গায়ে খুদে হরফে কীসব লেখা ছিল যেন।
