-সেটা তারপর কী হল মনে আছে?
গঙ্গাধর দরজার কাছ থেকে বলল,–কেন বড়বাবু, সেটা গোবিন্দের বউ উপড়ে এনেছিল না? ছাগল বাঁধার খুঁটি করেছিল। গোঁজের মতো জিনিসটা। পায়ে নকশাকাটা ছিল।
কর্নেল বললেন, তাহলে সেটা গোবিন্দের ঘরে থাকা উচিত।
গঙ্গাধর মাথা নেড়ে বলল,–গোঁজটা ভারি অপয়া ছিল স্যার। গোবিন্দের বউ যে-ছাগল ওতে বাঁধত, হয় তাকে শেয়ালে নিয়ে যেত, নয়তো রোগে ভুগে মারা পড়ত। শেষে বউটাও মরে গেল। তখন গোবিন্দ একদিন ওটা গঙ্গায় ফেলে দিয়ে এসেছিল। তারপর আর কোনোরকম ক্ষতি হয়নি স্যার!
কর্নেল হতাশ ভঙ্গিতে বললেন,–গঙ্গায় ফেলে দিয়েছিল?
এতক্ষণে দেখলুম দরজার কাছে একটা ভীষণ বুড়োমানুষ তুলোর কম্বল জড়িয়ে বসে রয়েছে। সে খকখক করে কাশল প্রথমে। তারপর বলল,–হুঁজুর, ওই নকশাকাটা মন্তর লেখা গোঁজই এ বাড়ির সব্বোনাশ করছে। বড়বাবুর ছেলেপুলে নেই। একটা ভাই ছিল, সেও বেঘোরে খুন হলেন। ইদিকে আমার দশা দেখুন। কোনোরকমে বেঁচে আছি। কোনো সুখশান্তি নেই হুজুর। সেই থেকে কোনো সুখশান্তি নেই। ওই যে কথায় বলে, যত হাসি তত কান্না/ বলে গেছে রাম শন্না! লোহার গোঁজে মন্তর খোদাই করে রেখেছিল কেউ। তাইতে ওনারও ফাঁসিতে পেরান গিয়েছিল।
ঘরে সবাই কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপর আলো জ্বলে উঠল। প্রণবশংকর বললেন,–গ! চা কোথায় রে?
আনি বড়বাবু!-বলে গঙ্গাধর চলে গেল।
কর্নেলের দিকে তাকিয়ে দেখলুম, গালে হাত রেখে বসে আছেন চুপচাপ। দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। পবিত্র ঐতিহাসিক জিনিসটা উদ্ধার করতে পারলে সারা পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দিতে পারতেন তুমুল উত্তেজনায়।…
সকালের ট্রেন ধরব বলে আমরা তৈরি হয়েছিলুম। কর্নেল বললেন,–এসো জয়ন্ত! একবার ফোয়ারার বিদেশিনী অপ্সরাকে বিদায় জানিয়ে আসি।
ফোয়ারার কাছে গিয়ে বললেন,–আমায় সত্যি বাহাত্তুরে ধরেছে ডার্লিং। নইলে কাল দুপুরে এই পাঁচকোণা ফোয়ারা দেখেই অনুমান করা উচিত ছিল, এখানেই রহস্যের চাবি লুকিয়ে রয়েছে। ওটা দেখামাত্র খ্রিস্টীয় পবিত্র নক্ষত্রের কথা মাথায় এসেছিল। অথচ পেরেকটার সঙ্গে এর স্বাভাবিক যোগাযোগ থাকা উচিত। SATOR, AREPO, TENET, OPERA, ROTAS!–এক মিনিট!
বলে কর্নেল ফোয়ারার ভেতর নেমে ফাটলধরা চুন-কংক্রিটের স্তম্ভের একদিকে ঘাস ও আগাছা সরালেন। একটা ছুরি বের করলেন পকেট থেকে। ছুরি দিয়ে ঘষতে থাকলেন বেশ কিছুক্ষণ।
তারপরই মুখ তেতো করে সরে এলেন। দেখি, স্তম্ভের গায়ে একটা কাকের টেরাকোটা মূর্তি ফুটে বেরিয়েছে। তাহলে অন্যদিকে কোকিল, কাকাতুয়া, কাঠঠোকরা আর কাদাখোঁচাও নিশ্চয় আছে।
কিন্তু আমার বৃদ্ধ বন্ধু আর ঘুরে দাঁড়াতে রাজি নন। বললেন,–ট্রেনের সময় হয়ে গেছে। চলে এসো জয়ন্ত।
বুঝলুম, ওই কাকটাই গণ্ডগোল বাধিয়েছে। কাক ওঁর দুচোখের বিষ।..
৩.০৪ কোদণ্ড পাহাড়ের বা-রহস্য
হাথিয়াগড় বনবাংলো চৌকিদার ঘন্টারাম সাবধান করে দিয়েছিল, সম্প্রতি তল্লাটে একটা মানুষখেকো বাঘের খুব উপদ্রব। কাজেই আমরা যেন সবসময় হুঁশিয়ার থাকি।
কিন্তু আমার বৃদ্ধ বন্ধু প্রকৃতিবিদ কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের পাল্লায় পড়ে বরাবর যা হয়, এবারও তাই হল। হাথিয়াড় জঙ্গলে কোদণ্ড নামে একটা হাজার দশেক ফুট উঁচু পাহাড় আছে এবং সেই পাহাড় থেকে একটা জলপ্রপাত নেমে প্রকাণ্ড জলাশয় সৃষ্টি করে নদী হয়ে বয়ে গেছে। জলাশয়ে নাকি প্রচুর মাছ। কর্নেল ছিপ ফেলে সেই মাছ ধরবেন এবং আমাকে অসংখ্য দিব্যি কেটে বলেছিলেন, না ডার্লিং! পাখি-প্রজাপতি আর নয়। এবার মাছ–স্রেফ মাছই আমার লক্ষ্য। ছিপে গাঁথতে পারি বা না পারি, সেটা কোনো কথা নয়। ছিপ ফেলে ফাতনার দিকে তাকিয়ে থাকার মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। জলটাও খুব স্বচ্ছ। কাজেই বঁড়শির টোপের কাছে মাছের আনাগোনা স্পষ্ট দেখা যাবে। আসলে আমি মাছের মনস্তত্ত্ব নিয়ে ইদানীং একটু মাথা ঘামাচ্ছি। কাজেই ডার্লিং ….।
বিশেষ করে মনস্তত্ত্বের কচকচি শোনার চেয়ে তক্ষুণি রাজি হওয়াই ভাল। তা ছাড়া বক্তৃতা শোনার চেয়ে মানুষখেকো বাঘ-টাঘের পেটে গিয়ে লুকানো আরও ভাল।
জলাশয়টি এবং পারিপার্শ্বিক অবশ্য সত্যিই সুন্দর। যেন ছবিতে আঁকা ল্যান্ডস্কেপ। অক্টোবরের বিকেলের রোদ্দুরটিও খাসা। কর্নেল ছিপ ফেলে বসে আছেন। স্বচ্ছ জলের তলায় ছোট-বড় নানা জাতের মাছের আনাগোনাও দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু মাছগুলো বড় সেয়ানা। টোপের আনাচে কানাচে ঘুরঘুর করে চলে যাচ্ছে। কিন্তু টোপে মুখ দিচ্ছে না। এদিকে আমার বাঘের ভয়। বারবার পেছনটা এবং এদিক-ওদিক দেখে নিচ্ছি। বাতাস বন্ধ। কোথাও একটুখানি শব্দ হলেই চমকে উঠছি। কর্নেলের দৃষ্টি কিন্তু ফাতনার দিকে। প্রপাতটা বেশ খানিকটা দূরে বলে জল পড়ার শব্দ অত প্রচণ্ড নয়, আবছা।
একটু পরেই গণ্ডগোল বাধাল হতচ্ছাড়া বাউন্ডুলে একটা রঙবেরঙের প্রজাপতি। কোত্থেকে, উড়ে এসে ফাতনার ওপর বসল। অমনি যথারীতি প্রকৃতিবিদের মাথা খারাপ হয়ে গেল। ক্যামেরাটি তাক করলেন। কিন্তু ধূর্ত প্রজাপতি বেগতিক বুঝে উড়ে গেল। তখন বাইনোকুলারে চোখ রেখে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর জয়ন্ত, জয়ন্ত! ছিপটা…বলে উধাও হয়ে গেলেন। আমি ডাকতে গিয়ে চুপ করলুম। রাগে, ক্ষোভে মুখ দিয়ে কথাই বেরুল না। একেই বলে, স্বভাব যায় না মলে!
