গঙ্গাধর হাঁফাতে-হাঁফাতে বলল,–কী হয়েছে স্যার? চোর ঢুকেছিল?
গম্ভীরভাবে ‘‘ বলে টেবিলের দিকে তাকালুম। সেই কাগজগুলো নেই। বুঝলুম, আড়াল থেকে চোর নজরে রেখেছিল তাহলে। কিন্তু ওগুলো নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য কী? প্রমাণ লোপ করার চেষ্টা? তাছাড়া আর কী হতে পারে?
গঙ্গাধর গোমড়ামুখে তাকিয়েছিল আমার দিকে। বলল,–ওদিকে আরেক কাণ্ড। সেজন্যে আলো আনতে দেরি হল। নুটুবাবুর ঘরেও চোর ঢুকেছিল।
–বলো কী! কিছু চুরি গেছে নাকি?
–বইয়ের র্যাক খালি করে বইগুলো নিয়ে গেছে।
–হুঁ, প্রমাণ লোপের চেষ্টা।
গঙ্গাধর বুঝতে না পেরে বলল,–আজ্ঞে?
–কিছু না। তুমি আর-একবার কড়া করে চা খাওয়াতে পারো গঙ্গাধর?
আনছি স্যার।–বলে সে চলে গেল।
এবার চোর পালিয়ে বুদ্ধি বেড়েছে আমার। টর্চ আর খুদে ২২ ক্যালিবারের রিভলভারটা বের করে ফেললুম। কতক্ষণ পরে গঙ্গাধর চা দিয়ে গেল। বলে গেল,–বড়বাবুর শরীর খারাপ করেছে। উনি শুয়ে রয়েছেন। বললেন, ওনারা যেন কিছু না মনে করেন।…
ঘণ্টা-দুই পরে কর্নেল ফিরে এলেন। হাসতে-হাসতে বললেন,–-গঙ্গাধরের মুখে সব শুনলুম। আশা করি, বহাল তবিয়তে আছ ডার্লিং!
–আছি। কিন্তু চোর সেই কাগজগুলো নিয়ে পালিয়েছে। ওদিকে পরিতোষবাবুর ঘর থেকে…
হাত তুলে গোয়েন্দামশাই বললেন, শুনলুম। তাতে কী?–বলে বসলেন এবং আস্তেসুস্থে চুরুট ধরালেন।
জিজ্ঞেস করলুম,–কোথায় গিয়েছিলেন?
কর্নেল হেলান দিয়ে বসে বললেন, আমার বাহাত্তুরে ধরতে যে বেশি বাকি নেই, মাঝে মাঝে হঠাৎ করে টের পেয়ে যাই। এ বাড়ির সবচেয়ে পুরোনো লোক গোবিন্দ দাস। না ডার্লিং, পদাবলি রচয়িতা সেই কবি নন, ইনি মালি। আমার দোসর বলতে পারো। কারণ ক্যাকটাস চেনে। অর্কিড চেনে। এ বাড়ির সব পুরোনো গাছের গুঁড়ির ওপর এবং বিভিন্ন ডালে আশ্চর্য সুন্দর এক জাতের অর্কিড আছে। গোড়ার দিকটা লাল, ডগা নীল। এই শীতে তারা ফুল ফোঁটায়। সাদা থোকা-থোকা ফুল। গোবিন্দ বলল, রাম শন্না কোন্ মুলুক থেকে এনেছিলেন। পাঁচ পুরুষ ধরে তারা এ-গাছ। সে-গাছে জন্মাচ্ছে। মরছে, আবার জন্মাচ্ছে।
–সেই অর্কিডের গল্প শুনছিলেন গোবিন্দের কাছে?
–হ্যাঁ। কিন্তু দুঃখের বিষয়, গোবিন্দ এ-বাড়িতে অপ্রয়োজনীয় সেকেলে আসবাবের মতো। দয়া করে তাকে এখনও আঁস্তাকুড়ে ফেলে দেওয়া হয়নি। তার খুরপিতে মরচে ধরে ভেঙে গেলে তাকে আর নতুন খুরপি এনে দেওয়া হয় না। বড়বাবু তো থেকেও নেই। ম্যানেজারবাবুর যত ঝোঁক চাষবাসে। এমনকি, ওই ক্ষয়াটে ফুলফলের বাগানে নাকি আলু ফলাবেন বলে শাসিয়েছেন।
-ম্যানেজার কে?
নটুবাবু–মানে, পরিতোষ।–কর্নেল চোখ বুজে চুরুটে মৃদু টান দিয়ে বললেন, বেচারা গগাবিন্দের ছোট শাবলটা আজ সকাল থেকে উধাও। গোরুছাগলের অত্যাচারে অস্থির। সে একটা বেড়া দেবে ভাবছিল। কিন্তু গর্ত খোঁড়ার শাবলটাও কে চুরি করে নিয়ে যায়। কখন চুরি গিয়েছিল সে জানে না। গতকাল বিকেলেও দেখেছিল।
-কর্নেল! আপনি কি…
প্রাজ্ঞ গোয়েন্দা বললেন,–আনন্দের কথা, শাবলের জন্য বড়বাবুর কাছে নালিশের আগেই সেটা সে যথাস্থানে দেখতে পেয়ে খুব অবাক হয়েছে। হা ডার্লিং, ওটা আর ফিরে না এলে গোবিন্দ বড়বাবুকে নালিশ করত। শাবলটা হঠাৎ ওভাবে নিপাত্তা হওয়া নিয়ে জল্পনাকল্পনা হত–বিশেষ করে উমাশংকরের হত্যাকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে।
কর্নেল ফুঁ দিয়ে চুরুটের ধোঁয়া সরিয়ে ফের বললেন, কিন্তু শাবলটা যথাস্থানে ফিরে পেয়ে গোবিন্দ খুশি। তার আর নালিশ জানাবার কারণ রইল না। হ্যাঁ-পরিতোষ তাই শাবলটা গঙ্গায় ফেলে দেয়নি। জানত, গোবিন্দ ও-নিয়ে মাথা ঘামানোর মানুষ নয়। বরং আর ফিরে না পেলেই মাথা ঘামাত। অন্যদের বলত।
–শাবলটা দেখলেন?
মাথা দুলিয়ে কর্নেল বললেন,–নিজের দুঃখের কথা বলতে গিয়ে শাবলটার কথা আমাকে বলল গোবিন্দ। নইলে ওটা তার কাছে উল্লেখযোগ্য ঘটনা নয়–অন্তত হারানিধি ফিরে পাওয়ার পর। এখন কথা হচ্ছে, লোহার শাবল দিয়ে মাথার পেছনে আঘাত করলে শাবলে রক্ত লাগতেও পারে, নাও লাগতে পারে। রক্ত ছিটকে বেরোতে যত কম হোক, একটু সময় লাগে। ভোতা জিনিস দিয়ে চুলের ওপর আঘাত। ধরো, রক্ত ছিটকে বেরোতে অন্তত তিন-চার সেকেন্ড দেরি হবে। তার মধ্যে জিনিসটা সরে এসেছে। কাজেই রক্ত নাও লাগতে পারে। কিংবা যদি লাগে, অনেকসময় খালি চোখে তা দেখা নাও যেতে পারে। এক্ষেত্রে ফরেনসিক পরীক্ষা ছাড়া কিছু করার নেই। গোবিন্দের শাবলের ওপর এই জোরালো টর্চের আলো ফেলে আতশ কাঁচ দিয়ে দেখলুম, রক্তের সূক্ষ্ম ছিটে লেগে রয়েছে।
বলে কর্নেল তার ওভারকোটের ভেতর থেকে কাগজে মোড়া ফুটদেড়েক লম্বা একটা জিনিস বের করে টেবিলে রাখলেন। তারপর বের করলেন একটা বই। চামড়ায় বাঁধানো হলেও সেটার অবস্থা জরাজীর্ণ। অবাক হয়ে বললুম,–ওটা কী? কোথায় পেলেন ওটা?
–তোমার দ্বিতীয় প্রশ্নে বোঝা যাচ্ছে, তুমি এটা কী বই বুঝতে পেরেছ। ডার্লিং, এই সেই হারানো বই–রামশংকর শর্মার আত্মচরিত।
-কোথায় পেলেন আগে বলুন?
কর্নেল নিরাসক্ত ভঙ্গিতে বললেন,–গোবিন্দ অর্কিড চেনে। রাম শর্মার আনা অর্কিডের বংশধরদের ওপর তার খুব লক্ষ। ফুল ফুটলে তো কথাই নেই, সে আনন্দে নেচে ওঠে। অর্কিডের কথায় খুশি হয়ে বলল, কোণের শিরীষ গাছটার গুঁড়ির ওপর যে অর্কিডগুলো আছে, ওবেলা তাতে ফুল ফুটেছে। দেখবেন নাকি হুজুর? আমি কেন, সাহেবি-পোশাকপরা সবাই ওর কাছে হুজুর। তো আমার টর্চ খুব জোরালো। ফুল দেখতে-দেখতে হঠাৎ চোখে পড়ল, অর্কিডের ঝালরের ভেতর কী যেন রয়েছে। পাখির বাসা? গোবিন্দকে বললুম, মই আছে কি? গোবিন্দ বলল, আনছি হুজুর।
