কর্নেল বললেন,–পরিষ্কার। পরিতোষবাবু গতিক বুঝে গা ঢাকা দিয়েছেন।
অসম্ভব! এ হতেই পারে না। বলে প্রণবশংকর খাপ্পা হয়ে বেরুলেন। বাইরে তার হাঁকডাক শোনা গেল। গঙ্গাধরকে ডাকাডাকি করছেন। বলছেন,–দ্যাখ তো গঙ্গু, নুটু কোথায় গেল?
আমি প্রাজ্ঞ বৃদ্ধের মুখের দিকে তাকালুম। উনি ঘরের সবকিছু খুঁটিয়ে দেখছেন। বালিশ তোশক উলটে টেবিলের কাছে গেলেন। ড্রয়ার টেনে দেখলেন, খোলা। ভেতরে কী সব হাতড়ালেন। তারপর টেবিলের ওপাশে বইয়ের র্যাকের কাছে গেলেন। পকেট থেকে টর্চ বেরুল এবার। বললেন,–মাই গুডনেস! এ-সব কী! দেখছ জয়ন্ত, কী কাণ্ড?
বুঝতে না পেরে বললুম,–না তো। কিচ্ছু ঢুকছে না মাথায়।
–জয়ন্ত, এই বইগুলো দেখতে পাচ্ছ না? মোরহেডের লেখা ‘মিশরীয় চিত্রলিপির রহস্য।’লর্ড কারনারভনের লেখা ‘মমিপ্রথার ইতিহাস। আর এই দেখো, ‘মিশরে রোমানযুগের ইতিহাস। এটা হল বিখ্যাত বই–যিশুখ্রিস্ট এবং হারানো পাঁচটি পেরেক। পরিতোষের ভারি অদ্ভুত ব্যাপার!
বলে গোয়েন্দাপ্রবর টেবিলের তলা থেকে ওয়েস্ট পেপার বাস্কেট টেনে বের করলেন। তারপর দলাপাকানো কাগজ, অ্যাশট্রে থেকে ফেলে দেওয়া সিগারেটের টুকরো, এইসব আবর্জনা ঘাঁটতে শুরু করলেন।
একটু পরে দেখি, কয়েকটা দলাপাকানো কাগজ টেনে সমান করে ফেললেন এবং পকেটে ভরতে দেরি করলেন না। তারপর কাগজকুচি কুড়িয়ে মেঝেয় ফেলে জোড়া দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকলেন। প্রণবশংকর হন্তদন্ত এসে বললেন,–পরিতোষের এ-আচরণের মাথামুণ্ডু বুঝতে পারছি না। কেন সে এমন অদ্ভুত কাজ করল?
সে কথার জবাব না দিয়ে কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–মিঃ ব্যানার্জি, গতকাল সকালে কিংবা আগের রাত্রে কলকাতা থেকে কোনো ট্রাংককল এসেছিল কি?
-এসেছিল। তখন সবে আমি ঘুম থেকে উঠেছি। গঙ্গু বলছিল, নুটুবাবুর কল এসেছে কলকাতা থেকে।
-কী কথাবার্তা হচ্ছিল শোনেননি? গঙ্গাধর দরজার কাছে দাঁড়িয়েছিল। বলল,–নুটুবাবু কাউকে বারবার বলছিল, বড়বাবু রেগে আছেন। লুকিয়ে সন্ধ্যার পর এসো। আর বলছিল, চোরের ওপর বাটপাড়ি? খুব হাসছিল। ওই দুটো কথা মনে আছে স্যার।
কর্নেল বললেন,–উমাশংকরের দ্বিতীয় ভুল এটা।…
.
পাঁচ
আমাদের আস্তানায় ফিরে কর্নেল টেবিলের ওপর কাগজগুলো বিছিয়ে বললেন,–এবার দেখো, জয়ন্ত! অবাক হবে। দেখে সত্যি অবাক হলুম। কর্নেলের কাছে যে শব্দবর্গ দেখেছিলুম, একটা কাগজে সেটা লেখা রয়েছে।
SATOR
AREPO
TENET
OPERA
ROTAS
পরের কাগজগুলোতে লেখা আছে :
কাক, কোকিল, কাঠঠোকরা, কাকাতুয়া, কাদাখোঁচা…
AEORPST SATPORE-সাতপুর…
রমাকান্ত কামার/সুবল বসু/রায়মণি ময়রা/সদা দাস…
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–এই বাংলা নামগুলো সম্ভবত নিছক খেলা। ডাইনে-বাঁয়ে যেদিকে থেকে পড়বে, নামগুলো একই থাকে। খেলা বলার কারণ, ওর তলায় লেখা আছে : কনক/জলজ/নতুন/নন্দন/কণ্টক, চামচা/মলম… খুব জটিল ধাঁধা নিয়ে মাথা ঘামানোর পর এই একটু রিলিফ আর কি!
প্রণবশংকর ওঁর মুখের দিকে ব্যাকুল চোখে তাকিয়েছিলেন। বললেন,–কর্নেল! দোহাই আপনার! দয়া করে বলুন, পরিতোষই কি ছোটকুকে খুন করেছে?
কর্নেল বললেন,–হ্যাঁ। পরিতোষের প্রথম উদ্দেশ্য ছিল বই হাতানো। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য প্রতিদ্বন্দ্বী খতম।
তাহলে কথাটা পুলিশকে এখনই জানানো দরকার। দুধ দিয়ে কালসাপ পুষেছিলুম–সেই সাপের বিষদাঁত ভাঙা দরকার।
প্রণবশংকর রাগে থরথর করে কাঁপছিলেন। কর্নেল তাকে শান্ত করতে বললেন,–প্লিজ, আর-একটু ধৈর্য ধরুন। এখনও মোক্ষম প্রমাণ আমরা উদ্ধার করতে পারিনি।
–কী সেটা?
–মার্ডার উইপন–যা দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল।
–সে কি কেউ রাখে? ওই তো পা বাড়ালেই গঙ্গা। ফেলে দিয়েছে। ফেলে দিলেই বরং ধরা পড়ার চান্স ছিল। কারণ গোবিন্দ-মালি…এক মিনিট। আসছি। বলে কর্নেল হঠাৎ হন্তদন্ত বেরিয়ে গেলেন।
প্রণবশংকর অবাক হয়ে বললেন,–কোথায় গেলেন অমন করে, বলুন তো জয়ন্তবাবু?
–মনে হচ্ছে, গোবিন্দ মালির কাছে।
প্রণবশংকর গুম হয়ে একটুখানি দাঁড়িয়ে থাকার পর আস্তে-আস্তে বেরিয়ে গেলেন।
ক্রমশ শীত বাড়ছিল। মফস্বলে এত বেশি শীত আন্দাজ করতে পারিনি। যেমন-তেমন একটা জ্যাকেট চড়িয়ে এসেছিলুম। বিছানা থেকে কম্বলটা গায়ে জড়িয়ে আরামকেদারায় বসতে যাচ্ছি। আলো নিভে গেল। নিশ্চয়ই লোডশেডিং। বাড়ির ওপরতলায় প্রণবশংকরের ডাকাডাকি শুনলুম। গঙ্গাধরকে হ্যারিকেন জ্বালতে বলছেন।
বাইরে জ্যোৎস্নায় কুয়াশা জমেছে। প্রাঙ্গণ এবং গাছগাছালির দিকে তাকিয়ে গা ছমছম করছিল। মিনিট-পাঁচেক হয়ে গেল, তবু গঙ্গাধর আলো দিয়ে গেল না। ভাবলুম, ওকে ডেকে অন্তত একটা মোমবাতি দিতে বলি। দরজায় গিয়ে ‘গঙ্গাধর’ বলে ডেকেছি, সেইসময় আবছা একটা শব্দ হল ঘরের ভেতর। ভেতরের দিকের দরজাটাও খোলা রয়েছে। ঘুরে দেখি, আবছা একটা মূর্তি কী যেন করছে–খসখস শব্দ হচ্ছে। বাইরের ময়লা জ্যোৎস্না এদিকের দরজা দিয়ে যেটুকু ছটা পাঠাতে পেরেছে, তা অন্ধকারেরই মতো। বললুম,–কে? কে ওখানে?
অমনি হিসহিস করে কে গলার ভেতর বলে উঠল,–চুপ। খতম করে ফেলব।
কেন যে ছাই টর্চটা বের করে রাখিনি অ্যাটাচি থেকে! তবে আমিও দমবার পাত্র নই।’গঙ্গাধর! গঙ্গাধর! চোর! চোর!’বলে যেই চিৎকার ছেড়েছি, চোর হতচ্ছাড়া আমাকে এক ধাক্কায় কুপোকাত করে বেরিয়ে গেল। কম্বলজড়ানো অবস্থায় মেঝেয় পড়ে আমার দশা হল ফাঁদে পড়া শেয়ালের মতো। কম্বল থেকে বেরিয়ে যখন উঠে দাঁড়ালুম, তখন গঙ্গাধরের সাড়া এল। সে হ্যারিকেন নিয়ে দৌড়ে আসছিল।
