–নিশ্চয়ই রোডরিগের লোক?
কর্নেল মাথা নাড়লেন,–বোঝা যাচ্ছে না। চুপিচুপি বাড়ি ঢোকার কারণ–উমাশংকর সম্ভবত দাদার বকুনি খাওয়ার ভয়ে সরাসরি প্রথমেই দাদার মুখোমুখি হতে চাননি। পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ বয়স হলেও উমাশংকর একটু খেয়ালি ছিলেন। ছেলেমানুষি করতেন বিস্তর। কুমুদিনী দেবীর কাছে এসব কথা শুনলুম।
–তা না হয় বুঝলুম। কিন্তু রোডরিগ ছাড়া আর কার পেরেক নিয়ে মাথাব্যথা থাকা সম্ভব! সে জানবেই বা কী করে যে ছোটকু ওই সময় পেছনের ফটক দিয়ে বাড়ি ঢুকবে?
কর্নেল সোজা হয়ে বসে বললেন,–একজ্যাক্টলি! এটাই হল আদত প্রশ্ন। সেইজন্যে আমি গোপনে আপনার কাছে জানতে এসেছি, রামশংকরপুরের সঙ্গে যোগাযোগ আছে, এমন কেউ কি আপনার কাছে বইটার খোঁজে এসেছিল?
কেউ আসেনি। রাজাবাহাদুর চিন্তিত মুখে বললেন।
–একটু স্মরণ করে দেখুন তো!
কিছুক্ষণ চুপচাপ চিন্তা করার পর রাজাবাহাদুর বললেন,–নাঃ! মনে পড়ছে না তেমন কিছু।
–বইটা আপনি আবার ছেপে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন?
রাজাবাহাদুর বললেন, হ্যাঁ। মার্চ নাগাদ বের করব ভেবে রেখেছিলুম। আপনাকে তো বলেওছিলুম সে কথা। এ মাসেই কলকাতা গিয়ে ভালো একটা প্রেসের সঙ্গে যোগাযোগ করতুম। এই তো কিছুদিন আগে প্রণবদা ফোন করে জানতে চাইলেন, কবে বইটা ছাপছি।…
কর্নেল নড়ে বসলেন। ওঁর চোখদুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল,–প্রণবশংকর জানতে চাইছিলেন?
–হ্যাঁ।
–কেন হঠাৎ একথা জানতে চাইলেন প্রণবশংকর? উনি তো বইটই নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো মানুষ নন। সব ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকেন।
রাজাবাহাদুর হাসলেন। হ্যাঁ–আমি ওঁকে ঠাট্টা করে বললুম, এতকাল ধরে বইটা যে নষ্ট হচ্ছিল, আপনাদেরই ছাপানো উচিত ছিল। পূর্বপুরুষের লেখা বই। দৈবাৎ আমার চোখে না পড়লে তো নষ্ট হয়েই যেত।… প্রণবদা বললেন, ঠিকই বলেছ। তখন বইটার মূল্য বুঝিনি।
–প্রণবশংকর তাই বললেন?
রাজাবাহাদুর কর্নেলের উত্তেজনা লক্ষ করে অবাক হলেন। আপনি কি প্রণবদাকে…
বাধা দিয়ে কর্নেল বললেন, না, না। তা নয়। তারপর উঠে দাঁড়ালেন। তবে এই কথাটাই জানতে চেয়েছিলুম অবশ্য। যাই হোক, রাজাবাহাদুর, আমি এখনই রামশংকরপুরে ফিরতে চাই। এবার কিন্তু আপনার জিপগাড়িটা চাইছি।
–অবশ্য, অবশ্য। এক মিনিট, আমি রমেনকে বলে দিচ্ছি। আপনাদের একবারে প্রণবদার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসবে। গঙ্গায় জিপ পার করার নৌকা আছে। অসুবিধে হবে না।
ফেরার পথে কর্নেলকে কোনো কথা জিজ্ঞেস করিনি। জিপে গঙ্গার ঘাটে পৌঁছুতে মিনিট কুড়িরও কম লাগল। নৌকোয় জিপসুদ্ধ পেরুতে মোটে মিনিট-দশেক। যন্ত্রচালিত নৌকোয় গাড়ি পার করার ব্যবস্থা আছে।
বাঁড়ুজ্জেবাড়ির ফটকে আমাদের নামিয়ে দিয়ে রাজাবাহাদুরের জিপগাড়ি চলে গেল। সাতটা বেজে গেছে। বাড়িটা একেবারে নিশুতি নিঝুম হয়ে রয়েছে। জ্যোৎস্না ও কুয়াশায় চারদিকে কেমন ঝিমন্ত দশা।
প্রণবশংকর দাঁড়িয়েছিলেন বসার ঘরের বারান্দায়। বললেন,–ফিরে এলেন ভৈরবগড় থেকে? দেখা হল রাজাবাহাদুরের সঙ্গে?
কর্নেল বললেন,–হা। উমাশংকরবাবুর বডি ফেরত আসেনি মর্গ থেকে?
–চারটেয় এল। সব রেডি ছিল। দাহ হয়ে গেল সঙ্গে-সঙ্গে। এই মিনিট-কুড়ি হল শ্মশান থেকে ফিরছি।
কথা বলতে-বলতে আমরা দক্ষিণের সেই ঘরে গেলুম–যে ঘরে আমাদের থাকতে দেওয়া হয়েছে। একটু পরে গঙ্গাধর চা দিয়ে গেল। একথা-ওকথার পর কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন,–আচ্ছা মিঃ ব্যানার্জি, কিছুদিন আগে আপনি রাজাবাহাদুরকে ফোনে রাম শর্মার আত্মচরিত ছাপানোর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলেন?
প্রণবশংকর হঠাৎ এ-কথায় হকচকিয়ে গিয়ে বললেন,–হ্যাঁ-হ্যাঁ। জিজ্ঞেস করেছিলুম। কে বলুন তো? জিজ্ঞেস করা কি ভুল হয়েছে?
না, না। ভুল নয়।–কর্নেল হাসলেন, আমার জানবার উদ্দেশ্য, হঠাৎ কেন আপনি কথাটা জানতে চাইলেন রাজাবাহাদুরের কাছে?
প্রণবশংকর বিব্রতভাবে বললেন,–দেখুন, ও-সব বই-টইয়ের আমি কিছু বুঝিও না। ইন্টারেস্টও নেই। কোনো ব্যাপারেই নেই। ওই পরিতোষ একদিন বলল যে, বইটা আমাদেরই বের করা উচিত ছিল। আফটার অল, এ-বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা এবং আমাদের পূর্বপুরুষ। রাজাবাহাদুর সত্যি-সত্যি ছাপবেন কি না কে জানে! তাই শুনে আমি বললুম, দেখছি খোঁজ নিয়ে।
–পরিতোষবাবুকে একবার ডাকবেন?
প্রণবশংকর ব্যস্ত হয়ে বললেন,–ওকে আপনার সঙ্গে দেখা করার কথা বলেছি। কিন্তু এত ধকলে বেচারার জ্বর এসে গেছে। শ্মশান থেকে ফিরেই শুয়ে পড়েছে লেপমুড়ি দিয়ে। চলুন বরং, ওর ঘরেই যাওয়া যাক।
আমরা বাড়ির দক্ষিণ ও পূর্বদিক ঘুরে উত্তর-পূর্ব কোণের একটা ঘরের সামনে পৌঁছলুম। ঘরের ভেতরে আলো জ্বলছে। প্রণবশংকর ডাকলেন,–নুটু! ও নুটু! তারপর দরজায় টোকা দিলেন। সাড়া না পেয়ে দরজা ঠেললেন এবার। দরজাটা ভেজানো ছিল। খুলে গেল।
বিছানায় আপাদমস্তক লেপ মুড়ি দিয়ে কেউ শুয়ে আছে। প্রণবশংকর আরও ব্যস্ত হয়ে উঠলেন,–সর্বনাশ! জ্বরের ঘোরে অজ্ঞান হয়ে গেল নাকি? নুটু, ও নুটু! বলে তিনি মাথার দিকের লেপ খানিকটা সরালেন।
কিন্তু সেখানে বালিশের ওপর পরিতোষবাবুর মাথার বদলে একটা লম্বা পাশবালিশের একটু অংশ দেখা গেল। প্রণবশংকর চমকে উঠেছিলেন। কর্নেল এক টানে লেপটা সরিয়ে দিতেই দেখলুম, বিছানায় পাশবালিশটা মানুষের মতো লম্বালম্বি শোয়ানো রয়েছে। প্রণবশংকর ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বললেন,–এর অর্থ?
