এইসব কথাবার্তার মধ্যে বুঝতে পারলুম, কর্নেল রামশংকরপুরে প্রণবশংকরের বাড়ি থেকে, ফোন করে আসার কথা জানিয়েছেন। আলাপ-পরিচয় এবং কফি খাওয়ার পর উমাশংকরবাবুর হত্যাকাণ্ডের কথা উঠল। রাজাবাহাদুর গম্ভীরমুখে বললেন,–ঘটনাটা ভারি অদ্ভুত। উমাশংকর একটু তেজি স্বভাবের ছিল বটে; কিন্তু ওকে কেউ খুন করবে ভাবাও যায় না। তাছাড়া তিন মাস গা-ঢাকা দিয়েই বা কেন রইল, আমার কাছে সবটাই একটা রহস্য। তাই গত রাতে প্রণবদা ফোনে ঘটনাটা যখনই আমাকে জানালেন, আমার মনে হল, আপনার শরণাপন্ন হওয়া উচিত। পুলিশ এ-ব্যাপারে কতদূর কী করবে ভরসা হয় না। তো, আমি নিজেও বহুবার আপনার লাইন পাওয়ার চেষ্টা করলুম। এখানকার টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ওয়ার্থলেস। কলকাতা ধরতেই পারল না। তখন প্রণবদাকে ফের ফোন করে বললুম, আপনি দেখুন চেষ্টা করে। নাম্বার দিচ্ছি।
কর্নেল বললেন,–হরিসাধনবাবুর খবর কী?
হরিসাধন?-–রাজাবাহাদুর বাঁকামুখে বললেন, বইটা চুরি করে ব্যাটাচ্ছেলে আর এ বাড়ি ঢোকেনি। বুঝে গেছে, এবার ত্রিসীমানায় দেখলেই মাথাটি ন্যাড়া করে দেব।
-–আচ্ছা, একটা কথা রাজাবাহাদুর! রাম শর্মার আত্মচরিত প্রণবশংকরের কাছে আপনি উপহার পান গত আগস্ট মাসে। আপনার লাইব্রেরিতে রাখার পর আর কাউকে কি পড়তে দিয়েছিলেন।
রাজাবাহাদুর মাথা নেড়ে বললেন,–না। লাইব্রেরিতে বইটা রেখেছিলুম দুষ্প্রাপ্য বইয়ের শেলফে। আপনি বাদে কাউকে পড়তে দিইনি। বইটার কথা আর কেউ জানে বলেও মনে হয় না। নইলে যাঁরা উনিশ শতক নিয়ে রিসার্চ করেন, তারা নিশ্চয়ই খোঁজখবর করতেন। তাছাড়া আমি তো বিস্তর বইটই পড়ি। কোথাও এ বইয়ের কোনো উল্লেখ পর্যন্ত পাইনি। এর একটাই কারণ থাকতে পারে। ব্রিটিশ সরকারের কোপে পড়ে যাঁকে ফাঁসিকাঠে ঝুলতে হয়েছে, তার ভাই শ্যামশংকর সাহস করে বইটা ছাপলেও বোধ করি এক কপিও কেউ সাহস করে কেনেননি। জগমোহন বোসের মতো লোক, যে এ ধরনের দুষ্প্রাপ্য বইয়ের খোঁজখবর রাখে, সে পর্যন্ত বইটার নাম শোনেনি। কিন্তু হঠাৎ এ প্রসঙ্গ কেন বলুন তো কর্নেল?
কর্নেল একটু হাসলেন। উমাশংকর খুন হওয়ার সঙ্গে বইটার যোগাযোগ রয়েছে।
–সে কী!
–উমাশংকর বইটা নিয়ে বহুদিন ধরে মাথা ঘামাচ্ছিলেন।
–বলেন কী! কেন?
–অক্টোবরে এসে বইটা পড়ার পর আপনার সঙ্গে পবিত্র ঐতিহাসিক পেরেক ‘স্যাটর’ নিয়ে আলোচনা করেছিলুম, মনে আছে তো?
–হ্যাঁ–হ্যাঁ খুব মনে আছে। বলেছিলেন, পেরেকটা সম্পর্কে রামশংকর কেন হঠাৎ চুপ করে গেলেন!
–প্রণবশংকর হঠাৎ আপনাকে বইটা উপহার দেওয়ায় উমাশংকর ক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন। কারণ, উনি পেরেকটার হদিস বই থেকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু পরে যেভাবেই হোক, ওঁর মাথায় ঢুকেছিল, রামশংকর ত্রিনিদাদে ত্রাবাংকা নামে একটা জায়গায় যে বাড়ি করেছিলেন, সেই বাড়িতেই কোথাও ওটা লুকানো আছে। তাই উনি ত্রিনিদাদে পাড়ি দেন। দাদাকে বলেননি। কারণ, দাদা তাকে কিছুতেই যেতে দিতেন না।
–কিন্তু ত্রিনিদাদে গিয়েও তো জানাতে পারত। এদিকে সবাই ওর জন্য কষ্ট পাচ্ছে।
–প্রণবশংকরকে তো জানেন। আমার ধারণা হয়েছে, ভদ্রলোক কোনো ব্যাপারে গোপনীয়তা কাকে বলে জানেন না। খুব ভোলা মনের মানুষ। পাঁচকান করবেন বলেই হয়তো জানাননি উমাশংকর।
–ঠিক বলেছেন। প্রণবদার পেটে কথা থাকে না।
–উমাশংকর ত্রিনিদাদে যাওয়ার পর ওঁর পাসপোর্ট আর টাকাকড়ি চুরি গিয়ে বিপদে পড়েন। সেই সময় রোডরিগ নামে গোঁয়ার এক বড় ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলাপ হয়। অনুমান করা যায়,
রোডরিগকে তিনি হতাশা ও ব্যর্থতার চাপে তার ত্রিনিদাদে আসার উদ্দেশ্য খুলে বলেছিলেন। পেরেকটার দাম কোটি-কোটি ডলার এখন! এটা কোন্ বড়লোক না সংগ্রহশালায় রাখতে চাইবে। বহু দেশের সরকারও চাইবেন, এটা তাদের জাদুঘরে থাক। ভ্যাটিকানে রাখার জন্যও খ্রিস্টীয় ধর্মগুরুরা এই পবিত্র জিনিসটি দাবি করবেন।
রাজাবাহাদুর সায় দিয়ে বললেন,–হা–আপনি সেবারও এসব কথা বলেছিলেন।
–রোডরিগের সাহায্যে উমাশংকর রাম শর্মার বাড়ি খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। বিস্তারিত কিছু জানি না। তবে বোঝা যায়, কী ঘটেছিল। পেরেক আবিষ্কার করতে না পেরে রোডরিগের সঙ্গে উমাশংকর ফিরে আসেন। তারপর আমরা কিছু ঘটনা ঘটতে দেখেছি। রোডরিগ বোম্বে এসেই কলকাতার ব্যবসায়ী রামদয়াল সিঙ্গিকে বইটা জোগাড় করতে বলে। তার বদলে সিঙ্গিমশাইকে দু’লক্ষ টাকার অর্ডার পাইয়ে দেবার লোভ দেখায়। যেভাবেই হোক, সেটা জানতে পেরে উমাশংকর সতর্ক হয়ে যান। কলকাতায় ছুটে আসেন। ঘটনাচক্রে সেই দিনই সিঙ্গিমশাই বইটা জোগাড় করেছেন জগমোহনের কাছে।
–ঠিক, ঠিক। ব্যাটাচ্ছেলে হরিসাধনকে দিয়েই জগমোহন এ-কর্মটি করেছিল–এখন বুঝতে পারছি।
–উমাশংকর জনৈক মৈত্র নাম নিয়ে রোডরিগের ব্যবসার প্রতিনিধি বলে পরিচয় দিয়ে সিঙ্গিমশায়ের অফিসে রাত কাটান এবং বইটা পেয়ে যান। তারপর মুখোশ পরে জগমোহনের দোকানে ঢুকে টয়পিস্তল দেখিয়ে তাকে শাসিয়ে যান, যেন এ বইয়ের বেচাকেনা আর না করে। সেই বই নিয়ে সন্ধ্যার পর চুপি-চুপি পেছনের ফটক দিয়ে উনি বাড়ি ঢুকছিলেন। কেউ ওত পেতে ছিল। তার মাথায় বাড়ি মেরে বইটা ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
