প্রণবশংকর বললেন,–পরিতোষ বেচারার দোষ নেই, কাল সারারাত জেগেছে। থানা-পুলিশের হাঙ্গামা তো কম নয়। সকালে আবার দৌড়ল থানায়। সেখান থেকে মর্গে। যতক্ষণ
বডি নিয়ে আসবে, ততক্ষণ হয়তো ওর শান্তি নেই। তারপর আর আসেনি পরিতোষ? কুমুদিনী বললেন,–এসেছিল একটু আগে। আবার বেরুল।
–আজ আর ওর ফার্মে যাওয়া হল না। কী যে হচ্ছে সেখানে কে জানে! পরিতোষের ভয়ে কেউ ফসলে হাত দিতে সাহস পায় না!
কর্নেল বললেন,–পরিতোষ কে?
প্রণবশংকর বললেন,–এ বাড়ির কেয়ারটেকার বলতে পারেন, ম্যানেজারও বলতে পারেন। ছোটবেলা থেকে এ-বাড়িতে আছে। আমাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। মাঠে কৃষিখামার করেছি। তাও দেখাশোনা করে। বাড়িরও সবকিছু তদারক করে। ও না থাকলে আমাকে পথে বসতে হত। ছোটকু তো বরাবর নিষ্ক্রিয়–কোনো বৈষয়িক ব্যাপারে সে থাকেনি। বলত, নুটু থাকতে আবার আমায় কেন! নুটু একা একশো। সত্যি তাই। তবে পরিতোষ বেচারার মুখের দিকে এখন তাকানো যায় না। ছোটকুর ব্যাপারে সে একেবারে ভেঙে পড়ার দাখিল। ছেলেবেলা থেকে দুটিতে একসঙ্গে মানুষ হয়েছে। একসঙ্গে খেলাধুলো করেছে। পড়াশুনা করেছে। দুটিতে খুব অন্তরঙ্গতা ছিল। ছোটকু নিরুদ্দেশ হলে পরিতোষ সারা ভারত ওর খোঁজে ছোটাছুটি করেছিল। খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল। সে এক অবস্থা!
–পরিতোষবাবু এলে একটু পাঠিয়ে দেবেন? ওঁর সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।
–আসুক। বলব’খন।
খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে কর্নেল বললেন, আপনার টেলিফোন কোন্ ঘরে আছে মিঃ ব্যানার্জি?
–নীচের ঘরে। ওখানে পরিতোষ অফিসমতো করেছে। সবই ওর দায়িত্বে। আমার বয়স হয়েছে–কিছু দেখাশোনা করতে পারিনে।
–আমি একটা ট্রাংককল বুক করতে চাই।
–স্বচ্ছন্দে। আসুন, আসুন।
আমি ওঁদের সঙ্গে গেলুম না। ভাতঘুমের টান ধরেছে সঙ্গে-সঙ্গে। একতলায় নেমে সটান আমাদের আস্তানায় ফিরে এলুম। কম্বলমুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ার আগে বারান্দার রোদ্দুরে বসে মৌজ করে সিগারেট টানতে থাকলুম। বরাবর এটাই অভ্যাস। সিগারেট শেষ করে ঘরের ভেতর বিছানায় কম্বলটার দিকে লোলুপদৃষ্টে তাকাচ্ছি, কর্নেল এসে গেলেন। এসেই চোখ পাকিয়ে বললেন,–উঁহু! দিনদুপুরে ঘুমোনো মোটেই ভালো কথা নয়। আয়ুক্ষয় হয়। বরং চলো, আমরা একবার ঝটপট ভৈরবগড় ঘুরে আসি।
–ভৈরবগড়! সে আবার কোথায়?
–বেশি দূরে নয়। গঙ্গা পেরুলে বাস। বাসে চেপে মাইল-পাঁচেক মাত্র।
মনে-মনে বুড়োর মুণ্ডপাত করতে-করতে পা বাড়ালুম। বাজার এলাকার দিকে হাঁটতে-হাঁটতে বললুম-হঠাৎ ভৈরবগড়ে কী ব্যাপার বলুন তো?
–রাজাবাহাদুরের সঙ্গে দেখা করে আসি–এত কাছে এসে পড়েছি যখন। তাছাড়া হরিসাধনেরও খোঁজখবর নেব।
–হরিসাধন-মানে সেই নেশাখোর বইচোর! তাকে কি রাজাবাহাদুর আর বাড়ি ঢুকতে দিয়েছেন?
–চলো তো, দেখি।
বাজার এলাকার ভিড় ঠেলে আমরা গঙ্গার ঘাটে পৌঁছলুম। একটা নৌকো ভাড়া করে ওপারে পৌঁছতে প্রায় একটা ঘণ্টা লেগে গেল। কিন্তু খুব সুন্দর এই জার্নি। কর্নেল বাইনোকুলার চোখে রেখে পড়ন্ত শীতের বেলায় জলপাখি দেখে নিলেন।
বাসের ভিড় দেখে আমার চক্ষু চড়কগাছ। কলকাতার বাসে ভিড় হয় বটে, কিন্তু এর তুলনায় সে-ভিড় কিছুই না। বাসটার আগাপাশতলা লোক ভর্তি। তবু কন্ডাক্টার চাঁচাচ্ছে,–চলে আসেন। চলে আসেন! ছেড়ে গেল! ছেড়ে গেল ভৈরবগড়-দাঁইহাট-কাটোয়া-আ-আ!
হয়তো কর্নেলের সায়েবি চেহারা ও বেশভূষা, কিংবা দাড়িটাড়ি দেখে কন্ডাক্টার ড্রাইভারের ডান ও বাঁ-পাশ থেকে দুই বেচারাকে হিড়হিড় করে নামিয়ে আমাদের জায়গা করে দিল। হতভাগা যাত্রীদ্বয়কে সে কোথায় জল কে জানে! আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কর্নেল মুচকি হেসে বললেন,–পৃথিবীটা যে নিছক সুখের জায়গা, মাঝে-মাঝে এটা টের পাওয়া দরকার ডার্লিং!
–কিন্তু অন্যদের বঞ্চিত করে এভাবে জায়গা নেওয়া কি উচিত হল?
ড্রাইভার একগাল হেসে বলল,–ওদের কথা ভাববেন না স্যার। ওরা আমার নিজের লোক। বিনিপয়সায় যাচ্ছে। ভৈরবগড়ে আপনারা নামলে ওদের ডেকে নেব।
দুধারের গাছপালাঘেরা পিচের রাস্তাটা এঁকেবেঁকে চলেছে। পাঁচ মাইল যেতে অন্তত বারপাঁচেক বাস থামল। কিছু যাত্রী নামল, উঠল তার দ্বিগুণ। আমাদের নামিয়ে যখন বাসটা চলে গেল, তখন তাকে দেখাচ্ছিল যেন চলন্ত মৌচাক–তবে মৌমাছিগুলো মানুষ এই যা।
বাস-রাস্তার মোড় থেকে সাইকেলরিকশা করে এগিয়ে আমরা রাজবাড়ির ফটকের কাছে। নামলুম। একজন দারোয়ান কর্নেলকে দেখামাত্র মিলিটারি সেলাম ঠুকল। বুঝলুম কর্নেলকে সে চিনতে পেরেছে। ওপাশের একতলা সারিবদ্ধ ঘরের বারান্দায় এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়েছিলেন। হাতে চায়ের পেয়ালা। তিনি দৌড়ে এসে আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন।
একটু পরে রাজবাড়ির বিশাল ড্রয়িংরুমে অপেক্ষা করতে-করতে রাজাবাহাদুর এসে গেলেন। প্রণবশংকরের বয়সি মানুষ। পরনে সাদাসিধে পাঞ্জাবি-পাজামা। চোখে পুরু লেন্সের কালো চশমা। কিন্তু রোগা টিঙটিঙে গড়ন। বললেন, খুব শিগগির এসে পড়েছেন আপনারা। আমি ভেবেছিলুম, ছটার আগে পৌঁছতে পারবেন না। তবে দেখুন কর্নেল, আমার কিন্তু কোনো অপরাধ নেই। আমি জিপ পাঠাতে চাইলুম, আপনি বারণ করে দিলেন।
কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, আমার এই তরুণ বন্ধু একজন সাংবাদিক। ওকে দেশের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে একটুখানি অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দিয়েছি। এবার কলকাতা ফিরে দৈনিক সত্যসেবকে মফস্বলের বাসযাত্রীদের কথা লিখবে, আশা করি।
