–বলুন।
–জয়ন্ত! সেই সাতটা অক্ষর থেকে এইমাত্র একটা নতুন শব্দ বেরিয়ে এসেছে। বিস্ময়কর যোগাযোগ, ডার্লিং! নদীয়া জেলার যে গ্রামে রামশর্মার বাড়ি ছিল, তার প্রাচীন নাম কি ছিল জানো? সাতপুর।
বেশ তো। সেজন্য এত রাতে ফোন করার কী দরকার হল?
–জয়ন্ত, জয়ন্ত! সাতপুরকে বিদেশি উচ্চারণে রোমান হরফে পেয়েছি। SATPORE!
–খুব ভালো কথা। তাতে কী হয়েছে?
SATOR, AREPO, TENET, ROTAS, OPERA C167 at oppas rotas CC 90 SATPORE? প্রাচীন পৃথিবী রহস্যময়, জয়ন্ত! আর শোনো, কাল সকাল নটায় তৈরি থেকো। আমরা সাতপুর অর্থাৎ বর্তমান রামশংকরপুরে যাচ্ছি। সাড়ে নটায় শেয়ালদায় ট্রেন।
–কাল আমার অফ-ডে নেই। সপ্তাহে মাত্র একদিন অফ-ডে পাই।
–জয়ন্ত, একটু আগে রামশংকরপুর থেকে রাম শন্নার বংশধর প্রণবশংকর বাঁড়ুজ্জে ট্রাংককল করেছিলেন। ভৈরবগড়ের রাজাবাহাদুর ওঁর কুটুম্ব। রাজাবাহাদুরের পরামর্শে আমাকে ট্রাংককল করা। রাত দশটায় প্রণবশংকরের বাড়ির পেছনের বাগানে ওঁর নিরুদ্দিষ্ট ভাই উমাশংকরের ডেডবডি পাওয়া গেছে। বুঝতে পারছ? তিনমাস ধরে নিখোঁজ ছিলেন উমাশংকর। হঠাৎ ওঁর ডেডবডি…
কথা কেড়ে বললুম, ঠিক আছে। সকাল ৯টায় তৈরি থাকব। তারপর ফোন রেখে চিত হয়ে শুয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। টের পেলুম, আমার মাথার ভেতর ঘুঘু ডাকছে।…
.
তিন
শহরে-গ্রামে জগাখিচুড়ি পাকিয়ে গেলে যা দাঁড়ায়, তার নাম রামশংকরপুর। গঙ্গার ধারে একেবারে শেষপ্রান্তে রাম শন্নার তৈরি বিরাট ঐতিহাসিক দালানবাড়ি। নিরিবিলি জায়গা বলা যায়। ঘন গাছগাছালি আর এন্তার ঝোঁপজঙ্গল গঙ্গাতীরের উর্বর মাটিতে যথেষ্ট গজিয়ে রয়েছে। কিন্তু এই বাঁড়ুজ্জেবাড়ি থেকে উত্তরে একটুখানি এগোলেই অন্যরকম দৃশ্য। বাজার, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, থানা, কোর্টকাছারিতে জমজমাট। শহরের মতো লোকের ভিড় আর যানবাহনের দাপট।
একর-সাতেক জায়গার ঠিক মাঝখানে দোতলা প্রকাণ্ড সেকেলে বাড়ি। চারদিকে কোথাও ফাঁকা ঘাসজমি, কোথাও সবজিখেত, কোথাও ফুলফলের ক্ষয়াটে বাগান। একটা পুকুর পর্যন্ত আছে। সারা চৌহদ্দি পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। কিন্তু সে-পাঁচিলের অবস্থা বাড়িটার চেয়ে জরাজীর্ণ। কোথাও ভেঙেচুরে গেছে; কোথাও পাঁচিল ছুঁড়ে গাছও গজিয়েছে। পশ্চিমে গঙ্গার ধারে বাঁধানো ঘাটের দশাও করুণ। গঙ্গা ঘাট থেকে একটু দূরে সরে গেছে কালক্রমে। এই দেউড়ির কপাট কবে লোপাট হয়ে গেছে। সেখান দিয়ে ঢুকলে বর্মি বাঁশের একটা ঝাড়। তার পাশে পুরোনো এক ফোয়ারা। কবে মরেহেজে গেছে ফোয়ারাটা। তার পাথুরে গা ফাটিয়ে আগাছা গজিয়েছে। মাঝখানে টুটাফাটা স্তম্ভের ওপর একটু ঝুঁকে যেন ঝরিতে জল ভরছে এক অপ্সরা। কিন্তু তার মাথাটাই নেই।
মুণ্ডুকাটা অপ্সরার দিকে তাকিয়ে আছি দেখে কর্নেল বললেন,–রাম শর্মা দেশে ফিরে রাজা-রাজড়ার মতো জীবন কাটাতে চেয়েছিলেন। তার একটা নমুনা তো দেখতেই পাচ্ছ। এই অপ্সরামূর্তি কিন্তু মোটেও দিশি নয়। ত্রিনিদাদের বাড়ি থেকে বহু ঝক্কি পুইয়ে বয়ে এতদূরে এনেছিলেন শর্মামশাই। উনি বেঁচে থাকলে অপ্সরার মুণ্ডু নেই দেখে খুব কষ্ট পেতেন।
প্রণবশংকর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বললেন,–১৯৪২ সালের ঝড়ে ওখানে একটা প্রকাণ্ড শিরীষগাছ ভেঙে পড়েছিল। একটা ডালের ধাক্কায় মুণ্ডুটা ভেঙে গিয়েছিল।
কর্নেল বললেন,–ফোয়ারাটা পাঁচকোনা দেখছি!… হু, ভেনিসের গো স্কোয়ারে ঠিক এমনি একটা ফোয়ারা দেখেছিলুম। তবে তার কেন্দ্রে পেতলের যে মূর্তি আছে, সেটা সম্ভবত দেবী ইস্তারের। ইস্তার ছিলেন প্রাচীন সুমেরের যুদ্ধদেবী। কিন্তু তার মূর্তির পায়ের তলায় পাঁচকোনা ফোয়ারা হল খ্রিস্টীয় পবিত্র নক্ষত্রের প্রতীক। ওই নক্ষত্র দেখে পুবদেশের জ্ঞানীরা টের পেয়েছিলেন যিশু জন্মেছেন। তারা নক্ষত্রের দিকে চোখ রেখে বেথেলহেমের আস্তাবলে পৌঁছান। বলে কর্নেল পায়ের কাছে ঘাস থেকে কী একটা কুড়িয়ে নিলেন। হলদে রঙের ছেঁড়া কাগজকুচি মনে হল। সেটা ভালো করে দেখে পকেটে রেখে দিলেন। তারপর চারপাশের ঘাসে কিছু খুঁজতে থাকলেন। ঘাসফড়িং হতে পারে। ঘাসফড়িংও ওঁর চর্চার বিষয় বলে জানি। প্রণবশংকর কিন্তু কর্নেলের ব্যাপার-স্যাপার দেখে বোধ করি মনে-মনে বিরক্ত হয়েছেন। বারোটা নাগাদ পৌঁছুনোর পরেই উনি আমাদের হত্যাকাণ্ডের জায়গাটা দেখাতে নিয়ে এসেছেন। ফোয়ারার কাছেই ওঁর নিরুদ্দিষ্ট ভাই উমাশংকরকে খুন করা হয়েছে। বডি সকালে পুলিশ মর্গে নিয়ে গেছে। আচমকা কেউ উমাশংকরের মাথায় সম্ভবত লোহার রড দিয়ে প্রচণ্ড আঘাত করেছিল। এক আঘাতেই মৃত্যু হয়–কারণ শরীরে আর কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না।
কর্নেল ওসব বিবরণে একটুও কান করেননি। শুধু রাম শর্মার কথা নিয়েই বকবক করছেন। এতে আমারও বিরক্তি আসছিল। কর্নেল এবার গলায় ঝুলন্ত বাইনোকুলার চোখে রেখে গাছের পাখি দেখছেন। প্রণবশংকরকে সহানুভূতি দেখানোর জন্য ওঁর ভাইয়ের প্রসঙ্গে কথা বললুম,–উমাশংকর কতদিন আগে নিখোঁজ হন, মিঃ ব্যানার্জি?
–তা মাস তিনেক হবে।
–কোনো ঝগড়াঝাটি হয়েছিল?
কোনো ঝগড়াঝাটির প্রশ্নই ওঠে না। তবে ছোটকু একটু জেদি প্রকৃতির ছিল। মাঝে-মাঝে তুচ্ছ কথায় ভীষণ রেগে যেত। কিন্তু হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার আগের রাতে ওর মেজাজ অত্যন্ত শান্ত দেখেছিলুম। রাতে একসঙ্গে দু-ভাই মিলে খাওয়াদাওয়া করলুম। দিব্যি স্বাভাবিকভাবে গল্পগুজব করল। শুতে গেল। সকালে গঙ্গাধর ওর ঘরে চা নিয়ে গিয়ে দেখে, নেই। ভাবল, বাথরুমে আছে। কিন্তু অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও তার পাত্তা নেই।…
