কর্নেল বললেন,–সিঙ্গিমশায়ের অফিস থেকে বইটা চুরি গেছে।
জগমোহন ফ্যালফ্যাল করে তাকালেন। তারপর গলায় কাকুতিমিনতি ফুটিয়ে বললেন,–যা লইয়া দিব্যি করতে বলবেন, করুম স্যার! আর যার লগে করি, বেয়াইমশয়ের লগে তঞ্চকতা করুম না।
–শুনুন জগমোহনবাবু! যা হওয়ার হয়ে গেছে। আর কখনও রামশংকর শর্মার আত্মচরিতের ধারেকাছে যাবেন না। কেউ লক্ষ টাকা দিতে চাইলেও ও বই জোগাড় করার চেষ্টা করবেন না। সোজা বলে দেবেন, পাওয়া যাবে না।
–আবার? মুখোশপরা লোকটাও হেই কথা কইয়া গুলি ছুড়ছিল না? বইয়ের গাদায় গুলি লাগল। হেই না বাঁইচ্যা গেলাম স্যার!
-–ঠিক আছে। আপনি আসুন।
জগমোহন দরজার কাছে গিয়ে হঠাৎ ঘুরলেন। কর্নেল বললেন,–কিছু বলবেন?
যে কথাটা জিগাইতে আইছিলাম, হেই কথাটাই বাদ। –জগমোহন একটু হাসলেন। রেয়ার বুকসের কারবার করিয়া চুল পাকাইলাম স্যার! কিন্তু রামশংকর শর্মার আত্মচরিত কী এমন বই যে এত গণ্ডগুল বাধছে? এদিকে আপনিও কইলেন, সাপের গর্তে হাত ভরছিলাম। ক্যান একথা কইলেন স্যার?
জগমোহনবাবু!-কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন, বইখানা আসলে ভীষণ অপয়া। ওই বই নিয়ে বেশি মাথা না ঘামালেই ভালো। জানেন তো? যত হাসি তত কান্না-বলে গেছেন রাম শন্না। ইনি হলেন সেই রাম শন্না। অতএব যা বললুম-মনে রাখবেন।
হ, বুঝছি।–বলে জগমোহন চলে গেলেন। কী বুঝলেন, তিনিই জানেন। হয়তো বুঝলেন, হাসতে মানা।
ঘরের ভেতর দিনশেষের ছায়া গাঢ় হচ্ছিল। কর্নেল সুইচ টিপে বাতি জ্বেলে দিলেন। তারপর পায়চারি করতে-করতে বললেন, তাহলে ব্যাপারটা কেমন জট পাকিয়ে গেল, জয়ন্ত! বোম্বের কে এক রোডরিগ সায়েব রামশর্মার আত্মচরিতের খবর রাখেন। রামদুলাল সিংহকে বইটা জোগাড় করে দিতে বলেছিলেন তিনি। জগমোহন হল সিঙ্গিমশায়ের বেয়াই। ভৈরবগড় রাজবাড়ি থেকে হরিসাধন এর আগে অনেক দুষ্প্রাপ্য বই চুরি করে এনেছে। কাজেই জগমোহন তার শরণাপন্ন হল। হরিসাধন বই চুরি করে এনে বেচল। তারপর দুটো ঘটনা ঘটল। রামদুলালের অফিস থেকে সেই বই চুরি এবং জগমোহনের দোকানে মুখোশধারীর হামলা। সত্যিকার পিস্তল ছোড়েনি সে। বইয়ের গাদায় গুলির কোনো চিহ্ন খুঁজে পাইনি। তার মানে, থিয়েটারের পিস্তল নিয়ে এসেছিল। হুঁ–জগমোহনকে ভয় দেখাতেই এসেছিল।… জয়ন্ত, আমার অনুমান সত্য। সে আসলে জগমোহনকে বোঝাতে চেয়েছে যে, এই বই আর যেন বেচাকেনা না করে জগমোহন।… কিন্তু কেন?
–তাহলে তার আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে না।
–কী ব্যাপারে প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে না বলতে চাইছ তুমি?
–পবিত্র ঐতিহাসিক পেরেকের–যার দাম হয়তো বিদেশে কোটি-কোটি ডলার।
কর্নেল হাসলেন।–তুমি বুদ্ধিমানের মতো কথা বলেছ, ডার্লিং! একজ্যাক্টলি তাই। কেউ বা কারা টের পেয়েছে, রামশর্মার আত্মচরিতের ভেতর স্যাটর নামে ঐতিহাসিক পেরেক লুকিয়ে রাখার কোনো সূত্র আছে।…হুঁ, রোডরিগেরও উদ্দেশ্য বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু তাকে টেক্কা দিয়ে বইটা হয়তো অন্য একজন হাতিয়ে নিল।
–সিঙ্গিমশায়ের অফিসে আর. মৈত্র না এস. মৈত্র নামে যে লোকটা এসেছিল, সে নয় তো?
গোয়েন্দাপ্রবর সায় দিলেন। ঠিক, ঠিক। এখন কথা হচ্ছে, এই মৈত্র লোকটা যেই হোক, সে রোডরিগের পরিচিত। তার পরিচিত নয় শুধু, তার অন্তরঙ্গ বলে মনে হচ্ছে। সে রোডরিগের সঙ্গে সিঙ্গিমশায়ের যোগাযোগের কথা জানতে পেরেছিল। তারপর ছুটে এসেছিল কলকাতায়।
কর্নেল চুরুট ধরিয়ে ধপাস করে বসে পড়লেন। চোখ বুজে কিছুক্ষণ চুপচাপ চুরুট টানতে থাকলেন। তারপর আপনমনে বললেন, কিন্তু কোথায় আছে সেই পেরেক? মিশরীয় চিত্রলিপিতে পাঁচটা পাখি! তার একটা অর্থ : The Sower Arepo holds the wheels carefully. প্রথমে গলগথা বধ্যভূমি থেকে যিশুর দেহ কবরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তখন পেরেক পাঁচটা কেউ খুলে নিয়েছিল ক্রশ থেকে। তাহলে কি আরেপো নামে এক চাষির চতুষ্কোণ শস্যক্ষেত্রে সেগুলো পুঁতে রাখা হয়েছিল?… তারপর কেউ উদ্ধার করে ইথিওপিয়ার দুর্গে নিয়ে যায়।… একটা পেরেক পেলেন রামশংকর শর্মা।… SATOR, AREPO, TENET, OPERA, ROTAS? রহস্যময় শব্দবর্গ! শব্দগুলোতে লেগেছে R O A T S E P মোট সাতটা বর্ণ। এই সাতটা বর্ণে কতগুলো অর্থপূর্ণ শব্দ তৈরি করা যায়, দেখা যাক।
হঠাৎ উঠে গিয়ে কোণের টেবিলে বসলেন কর্নেল। তারপর প্যাডের ওপর কলম নিয়ে ঝুঁকে পড়লেন। বুঝলুম, বুড়োকে এবার ভূতে পেয়েছে। এ ভূত ঘাড় থেকে নামতে রাত পুইয়ে যেতেও পারে। তাই ষষ্ঠীচরণের কাছে গিয়ে চুপিচুপি বললুম,–তোমার বাবামশাইকে বলে দিও, আমি গেলুম।
ষষ্ঠী ঘাড় নাড়ল। মুখে মুচকি হাসি।..
সেদিনই অনেক রাতে টেলিফোনের বিরক্তিকর আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। সাংবাদিক হওয়ার এই এক জ্বালা। দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার কোনো কর্তাব্যক্তি না হয়ে যান না। হয়তো কোথায় গুরুতর ট্রেন দুর্ঘটনা, মন্ত্রীর ওপর বোমা, কিংবা কোনো ধাদ্ধাড়া-গোবিন্দপুরে কী গণ্ডগোল। হয়তো শুনব, এখনই রওনা হও অকুস্থলে। জ্বালাতন!
খাপ্পা হয়ে ফোন তুলে বললুম,কী হয়েছে? তারপর আমার প্রাজ্ঞ বন্ধুর গলা শুনতে পেলুম।
–ডার্লিং! রাত দুটোয় তোমার ঘুম ভাঙানোর জন্য খুবই দুঃখিত।
বুড়োমানুষরা অনিদ্রায় ভোগেন, অন্যদেরও ভোগান।
