প্রণবশংকর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। একটু চুপ করে থাকার পর ফের বললেন, আমার ছেলেপিলে নেই। স্ত্রী মারা গেছেন বছর দুই আগে। আমার বয়স ৬৫ বছর হতে চলল। ওই ছোটকুই ছিল আমার বেঁচে থাকার সম্বল। অথচ কী দুর্ভাগা আমি, দেখুন জয়ন্তবাবু! হঠাৎ অমন করে সেই ছোটকু নিপাত্তা হয়ে গেল। কত খোঁজখবর করলুম। কাগজে বিজ্ঞাপন দিলুম। তারপর এতদিনে ওর ডেডবডি ফিরে পেলুম।
–ডেডবডি প্রথম কে দেখেছিল?
গঙ্গাধর।–প্রণবশংকর রুমালে চোখ মুছলেন।–গঙ্গাধর এ-বাড়িতে ছেলেবেলা থেকে আছে। ছোটকুকে সে ছেলের মতো ভালোবাসত। গতরাতে, তখন আটটা-সাড়ে আটটা হবে, গঙ্গাধর তার ঘর থেকে একটা আবছা চিৎকার শুনেছিল। ও ভেবেছিল, চোর ঢুকেছে বাগানে প্রায়ই রাতবিরেতে চোর আসে। গোবিন্দ-মালি হয়তো তাই চেঁচিয়ে তাকে ডাকছে। জ্যোৎস্না ছিল। গঙ্গাধর পশ্চিমের এই বারান্দায় বেরিয়ে আসে। তারপরই দেখতে পায় কে পালিয়ে যাচ্ছে। তাড়া করে এখানে এসেই ছোটকুর বডিতে ঠোক্কর খেয়ে পড়ে যায় গঙ্গাধর। তারপর…
কর্নেল এগিয়ে এসে বললেন,–মিঃ ব্যানার্জি, এখানে আপাতত আর কিছু দেখার নেই। এবার চলুন, উমাশংকরবাবুর ব্যাগটা আমি দেখতে চাই।
প্রণবশংকর পা বাড়িয়ে বললেন,–চলুন। দেখাচ্ছি।
যেতে-যেতে কর্নেল বললেন,–পুলিশের কী ধারণা মিঃ ব্যানার্জি? কিছু জানতে পেরেছেন?
–হুঁ। পুলিশের ধারণা, উমাশংকর কোনো শত্রুর ভয়ে গা-ঢাকা দিয়েছিল। সেই শত্রু তাকে তাকে ছিল। তা না হলে সে পিছনের ফটক দিয়ে বাড়ি ঢুকবে কেন?
–আপনার কী মনে হয়?
-–আমারও তাই মনে হচ্ছে। শুধু আশ্চর্য লাগছে যে, ছোটকুর শত্রু ছিল, অথচ আমায় কেন বলেনি?
-–আচ্ছা মিঃ ব্যানার্জি, নিখোঁজ হওয়ার আগে উমাশংকরবাবুর হাবভাবে কোনো গণ্ডগোল চোখে পড়েনি?
–তেমন কিছু তো দেখিনি। তবে কিছুদিন থেকে একটু আনমনা হয়ে থাকত যেন। চুপচাপ একা বসে কী যেন ভাবত। রাত জেগে কী সব করত। অনেক রাতে ওর ঘরে আলো জ্বলতে দেখেছি। জিজ্ঞেস করলে হেসে বলত, কিছু না।
–কিন্তু উমাশংকরবাবুর সঙ্গে শত্রুতা থাকতে পারে কার?
–সেটাই তো ভেবে পাচ্ছি না। তবে একালের ছেলে। কিছু বলা যায় না। হয়তো ভেতর-ভেতর রাজনৈতিক দলাদলিতে জড়িয়ে পড়েছিল। অবশ্য ওকে প্রকাশ্যে কোনোদিন
রাজনৈতিক ব্যাপারে দেখিনি। আমার সঙ্গে কোনোরকম রাজনৈতিক আলোচনাও করত না।
বাড়ির নীচের তলায় দক্ষিণের একটা বড় ঘরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। সেই ঘরে পৌঁছে দিয়ে প্রণবশংকর তার ভাইয়ের ব্যাগটা আনতে গেলেন।
কর্নেল গম্ভীরমুখে আরামকেদারায় বসে চুরুট ধরালেন। বললুম,–ফোয়ারার ওখানে সম্ভবত একটা কু সংগ্রহ করেছেন। একটু শুনি, কী ধরনের ব্লু।
কর্নেল ঠোঁটের কোনায় হাসলেন।–গোয়েন্দারা ব্লু খুঁজলেই নাকি পেয়ে যায়। এটাই সাবেকি পদ্ধতি, ডার্লিং! হ্যাঁ–আমিও একটা কিছু পেয়েছি। তবে সেটা ক্ল কি না জানি না। একটুকরো ছেঁড়া ময়লা কাগজ–মাত্র একবর্গ ইঞ্চি মাপের। তবে কাগজটুকুর বৈশিষ্ট্য হল, তা খুব পুরোনো এবং একটু চাপ লাগলেই গুঁড়ো হয়ে যায়।
প্রণবশংকর একটা সাধারণ কাপড়ের ব্যাগ নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। বললেন,–ব্যাগটা একটু তফাতে পড়েছিল ঝোঁপের ভেতর। আপনারা আসবার কিছুক্ষণ আগে গোবিন্দ ওটা কুড়িয়ে পেয়েছে। ব্যাগটা ছোটকুরই বটে। কারণ এই দেখুন ওর প্যান্ট, শার্ট, তোয়ালে, আর সব টুকিটাকি জিনিস।… আরে! এটা আবার কী?
জিনিসগুলো বের করে টেবিলে রাখছিলেন প্রণবশংকর। চৌকো জিনিসটা দেখে কর্নেল বললেন, এটা একটা ব্যাটারিচালিত মেটাল-ডিটেক্টর। কোথাও কোনো ধাতব জিনিস লুকোনো থাকলে এর সাহায্যে খুঁজে পাওয়া যায়।
চমকে উঠেছিলুম। বললুম,–তাহলে কি উমাশংকরবাবু…
গোয়েন্দাপ্রবর এমন কটমটিয়ে তাকালেন যে মুখ বন্ধ করলুম তক্ষুনি। প্রণবশংকর অবাক হয়ে বললেন,–মেটাল-ডিটেক্টর দিয়ে কী করত ছোটকু?
সে-কথার জবাব না দিয়ে কর্নেল ব্যাগের ভেতর হাতড়ে বললেন,–হুঁ, বুঝেছি। আচ্ছা মিঃ ব্যানার্জি, ভৈরবগড়ের রাজাবাহাদুরকে রামশংকর শর্মার আত্মচরিত কবে আপনি উপহার দিয়েছিলেন?
প্রণবশংকর স্মরণ করার চেষ্টা করে বললেন,–গত অগস্ট মাসে। এ অঞ্চলে কী একটা কাজে উনি এসেছিলেন। এদিকে এলেই আমার বাড়িতে ওঠেন। বৈবাহিকসূত্রে ওঁদের সঙ্গে আমাদের কুটুম্বিতার সম্পর্ক।
–রাজাবাহাদুরকে বইটা দেওয়ার জন্য উমাশংকরবাবু কি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন?
–হ্যাঁ, হা। ভীষণ খাপ্পা হয়েছিল আমার ওপর। আমি ওকে বুঝিয়ে বললুম, বইটা এখানে থাকলে নষ্ট হয়ে যাবে। বরং রাজাবাহাদুরের লাইব্রেরিতে থাকলে যত্ন হবে। তাছাড়া রাজাবাহাদুরও বলেছিলেন, বইটা আবার উনি ছাপার ব্যবস্থা করবেন।
–রাজাবাহাদুরের সঙ্গে উমাশংকরের সম্পর্ক কেমন ছিল?
প্রণবশংকর একটু ইতস্তত করে বললেন,–এটুকু বলতে পারি, রাজাবাহাদুর এ-বাড়ি এলে ছোটকু ওঁকে এড়িয়ে থাকত। আড়ালে ওঁর হামবড়াই ভাবের জন্য খুব ঠাট্টা-তামাশা করত। বলত, যাত্রাদলের রাজা। আসলে ছোটকুটা বরাবর একটু বিদ্রোহী-টাইপের মানুষ ছিল। সবাই যাকে সম্মান করছে, ও তাকে তুচ্ছ করবেই করবে।
–উনি কি ভৈরবগড় রাজবাড়িতে যেতেন?
কে? ছোটকু? –প্রণবশংকর মাথা নাড়লেন।সেই ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে যা গেছে- টেছে। বড় হয়ে আর যায়নি। বলত, রাজাগজাদের যা গুমোর, গেলে চাকর ভেবে পা টিপতে বলবে। দরকার নেই গিয়ে।
