কর্নেল বললেন,–অনেক ক্ষেত্রে জগমোহন বইচোরের সাহায্যে দুষ্প্রাপ্য বই সংগ্রহ করে বটে, কিন্তু এ-ব্যাপারটা ভারি অদ্ভুত তো। রোডরিগ নামে একটা লোকের এ বই কেন দরকার হল! জয়ন্ত, সময় আছে তোমার?
–আজ আমার অফ-ডে। কেন?
–চলো তো একবার কলেজ স্ট্রিট ঘুরে আসি।
.
দুই
কলেজ স্ট্রিট-মহাত্মা গান্ধী রোডের মোড়ে প্রচণ্ড ট্রাফিক জ্যাম। লোকে লোকারণ্য। আমার গাড়ি আটকে গেল জটে। মিছিল কিংবা পথসভা নাকি? এক পথচারীকে জিজ্ঞেস করলুম,–কী ব্যাপার দাদা?
দাদা-ভদ্রলোক চোখ কপালে তুলে বললেন,–আর বলবেন না মশাই! দিনে দিনে এ হচ্ছেটা কী? প্রকাশ্য দিবালোকে একগাদা লোকের চোখের সামনে খুনখারাপি! উঃ আমার মাথাটা কেমন করছে। স্ট্রোক না হলে বাঁচি।
আরেক পথচারী তাকে জিজ্ঞেস করলেন,–কে খুন হল? কোথায় খুন হল?
-ওই যে, দেখুন গে না স্বচক্ষে। একটা মুখোশপরা লোক বইয়ের দোকানদারকে গুলি করে পালিয়েছে।
পাশে দাঁড়িয়ে পেন বেচছিল এক হকার। সে মন্তব্য করল,–জগাইদাটা মরবে আমি জানতুম। কার বই চুরি করে কাকে বেচত। দেখেশুনে ওর দোকানের সেলসম্যানগিরি ছেড়ে রাস্তায় নেমেছি। আপনি বাঁচলে বাপের নাম।
কর্নেল গাড়ি থেকে মুখ বের করে দেখে বললেন,–জগাইদা মানে জগমোহন মনে হচ্ছে, জয়ন্ত! ওর দোকানের সামনেই ভিড়টা বেশি দেখছি। তুমি গাড়িটা কাছাকাছি রেখে অপেক্ষা করো। আসছি।
এতক্ষণে আমার পিলে চমকাল। বললুম,সর্বনাশ! জগমোহন খুন হয়ে গেল তাহলে?
কর্নেল নির্বিকার মুখে বেরিয়ে গেলেন। পেনওয়ালা হকার আমার কথাটা শুনতে পেয়েছিল। বলল,–হা স্যার! নাকি জিপগাড়ি চেপে একটা লোক এসেছিল। এসেই ঢিস্যুম-টিস্যুম করে দুই গুলি!
লোকটা আমার দিকে তাক করছিল কয়েকটা কলম নিয়ে। কিন্তু হঠাৎ ট্রাফিকজট খুলতে শুরু করল। হর্নের শব্দে কান ঝালাপালা হতে থাকল। বাঁ-পাশে খালি পেয়ে একটু এগিয়ে গাড়ি দাঁড় করালুম। তারপর আকাশ-পাতাল ভাবতে থাকলুম।
কিছুক্ষণ পরে দেখি, গোয়েন্দাপ্রবর আসছেন। এসে হাসতে-হাসতে বললেন,–চলো! ফেরা যাক!
উনি গাড়ির ভেতর ঢুকে আরাম করে বসলে, বললুম,হাসছেন যে? বডি দেখলেন–নাকি নিয়ে গেছে হাসপাতালে?
–কার বডির কথা বলছ ডার্লিং? জগমোহনের?
–হ্যাঁ। আবার কার?
লোকটা অসম্ভব ধূর্ত। কর্নেল চুরুট ধরালেন। গাড়ি মোড় ঘুরে এবার মহাত্মা গান্ধী রোডে পৌঁছেছে। কর্নেল বললেন,–তবে একথা সত্যি যে একটা মুখোশধারী লোক এসে ওর দোকানে হানা দিয়েছিল। তারপর ফটফট আওয়াজও শোনা গেছে। কিন্তু জগমোহন বহাল তবিয়তেই আছে।
আশ্বস্ত হয়ে বললুম,–তাহলে খুব জোর বেঁচে গেছে বেচারা।
খুব ভয় পেয়ে গেছে জগমোহন।-কর্নেল হাসতে থাকলেন। আমাকে দেখে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। বলল, ভাগ্যিস বইয়ের আড়ালে ছিল সে, নইলে রক্তারক্তি হয়ে পড়ে থাকত।
–কিন্তু এ তো সাংঘাতিক ব্যাপার! প্রথম চোটে গুলি ফসকেছে বলে বারবার ফসকাবে না।
কর্নেল কোনো কথা বললেন না। চোখ বুজে সিটে হেলান দিয়ে মৃদু-মৃদু টান দিতে থাকলেন চুরুটে। সেইসঙ্গে একটা-একটা করে ওপড়ানোর ভঙ্গিতে দাড়ি টানতে থাকলেন। বরাবর দেখেছি, রহস্যের গোলকধাঁধায় ঢুকে যখন বেরুবার পথ পান না, তখন এমন দাড়ি ছেঁড়ার তাল করেন।…
ওঁর ফ্ল্যাটে আমার আজ লাঞ্চের নেমন্তন্ন। ষষ্ঠীচরণ আয়োজন করেছিল প্রচুর। ঘুঘুমশাই সেই যে চুপ করেছেন তো করেছেন। কথাবার্তা বিশেষ বলছিলেন না। খাওয়ার পর ছাদে চলে গেলেন ওঁর প্ল্যান্ট ওয়ার্ল্ডে’। আমার ভাত-ঘুমের অভ্যাস প্রবল। সোফায় হেলান দিয়ে চমৎকার একটা ভাত-ঘুম হয়ে গেল। শীতের বেলা কখন ফুরিয়ে গিয়েছিল। চোখ মেলে দেখি, ঋষিসুলভ চেহারা নিয়ে এবং প্রসারিত হাতে কফির পেয়ালা নিয়ে বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন। সস্নেহে বললেন,–নাও ডার্লিং! জড়তা ঘুচিয়ে দিতে কফির তুল্য পানীয় আর নেই। আর শোনো, ও-ঘরে জগমোহন এসে বসে আছেন। অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখেছি ওঁকে। এবার ডাকা যেতে পারে।
ষষ্ঠী জগমোহনকে ডেকে আনল কর্নেলের নির্দেশে। সেইসঙ্গে তাকেও কফি দিয়ে গেল। ভদ্রলোকের চেহারা দেখে বুঝতে পারছিলুম, কী অবস্থা হয়েছে মনের। যেন ব্লটিংপেপারে আঁকা স্কেচ। মোটাসোটা নাদুসনুদুস গড়নের মানুষ। মাথায় এলোমেলো একরাশ চুল। চশমা নাকের ডগায় আটকে আছে কোনোরকমে। কপালে একটা টাটকা সিঁদুরের ফোঁটা–সম্ভবত কালীঘাটে দৌড়েছিলেন পুজো দিতে। সেখান থেকেই হয়তো আসছেন। কফির দিকে তাকিয়ে খাবেন কি না ঠিক করতে পারলেন না কয়েক সেকেন্ড। শেষে সিদ্ধান্ত করলেন খাবেন এবং এক চুমুকে পেয়ালা অর্ধেক শুষে বলবেন,–আমি গেছি। এক্কেরে গেছি!
কর্নেল চোখ পাকিয়ে বললেন,–আপনি যাবেন না তো আর কে যাবে?
জগমোহন হাত নেড়ে আর্তনাদ করলেন,–আর কখনও এমন হইব না স্যার! যদি হয়, আমার কানদুটো কাইটা কুত্তার গলায় লটকাইয়া দিয়েন!
কর্নেল ধমক দিলেন,–তাহলে বুঝতে পারছেন, কীসের গর্তে হাত ভরেছিলেন?
পারছি না স্যার? খুব পারছি।–জগমোহন করুণস্বরে বললেন, আপনের কাছে মিথ্যা কওনের সাধ্যি নাই। হ, বইখান ভৈরবগড় রাজবাড়ির। ওই পোড়াকপাইলা হরিসাধন আমার এ সর্বনাশ করল! আপনে যেমন অর্ডার দিছলেন, আমার বেয়াইমশয় সিঙ্গিবাবুও দিছিল। তো কথা হইল…
