–তাই আপনি কলেজ স্ট্রিটে জগমোহনের দ্বারস্থ হয়েছিলেন?
–তা তো বটেই! বইটা ফেরত পেলে রাজাবাহাদুর খুশি হতেন, আমারও মাইক্রোফিল্ম কপি হয়ে যেত।
–এবং পেরেক-উদ্ধারে অবতীর্ণ হতেন!
আমার মন্তব্য শুনে গোয়েন্দাপ্রবর একটু হাসলেন। ব্যাপারটা বোধ করি অত সহজ নয়, ডার্লিং! তবে আত্মচরিতের পরিশিষ্ট অংশটা পড়ে আমার মনে হয়েছিল, কথাগুলোর মধ্যে কী যেন ইঙ্গিত আছে। তো…
ষষ্ঠীচরণ এসে বলল,–এক ভদ্রলোক এয়েছেন! খুব হাঁফাচ্ছেন। চোখ-মুখ লাল হয়ে রয়েছেন।
কিন্তু ভদ্রলোক অনুমতির অপেক্ষা না করেই ভেতরে ঢুকে আমার পাশে ধপাস করে বসে পড়লেন। ষষ্ঠীচরণ কড়াচোখে তার দিকে তাকিয়ে চলে গেল। ভদ্রলোকের গড়ন নাদুসনুদুস। পরনে দামি স্যুট। হাতে ব্রিফকেস। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। পুরু কঁচাপাকা গোঁফ আর মাথায় অল্প টাক আছে। রুমালে মুখ ঘষে বললেন, আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে স্যার! দু’লক্ষ টাকার মাল সাপ্লাইয়ের অর্ডার বাতিল হতে চলেছে! আমায় বাঁচান!
কর্নেল তীক্ষ্ণদৃষ্টে লক্ষ করছিলেন ভদ্রলোককে। বললেন,–কে আপনি?
–আজ্ঞে, আমার নাম রামদুলাল সিনহা। আরবমুলুকে ইলেকট্রনিক গুডস রফতানির কারবার আছে। স্যার, পার্ক স্ট্রিটে আমার সিনহা ট্রেডিং কোম্পানির পাশের চেম্বারে আপনি যাতায়াত করেন।…
–হুঁ, ডক্টর বৈদ্য আমার বন্ধু।
–তিনিই পরামর্শ দিলেন আপনার কাছে আসতে।
–কিন্তু সাপ্লাই অর্ডার বাতিল হওয়ার ব্যাপারে আমি কী করতে পারি?
–না স্যার, না! সেজন্য আসিনি। একখানা বই চুরি গেছে।
ভুরু কুঁচকে তাকালেন গোয়েন্দাপ্রবর।–বই? কী বই?
এক মিনিট স্যার! বলছি।–রামদুলালবাবু ব্রিফকেস খুলে একটুকরো কাগজ বের করলেন। কর্নেলের হাতে দিয়ে বললেন, এই দেখুন বইটার নাম-টাম সব লেখা আছে। কলেজ স্ট্রিটের জগমোহন বোস আমার সম্পর্কে বেয়াই হন। তাকে বলে রেখেছিলুম বইটার জন্য। কাল সন্ধ্যাবেলা উনি ফোন করলেন, বইটা পাওয়া গেছে। পাঁচশো টাকার এক পয়সা কমে হবে না। পার্টি দাঁড়িয়ে আছে বই নিয়ে। দু-লাখ টাকার ডিল স্যার! দৌড়ে গেলুম টাকা নিয়ে।
–দাঁড়ান! এই হাতের লেখা কার?
–যাঁকে প্রেজেন্ট করতুম, তার স্যার। ওনার মাধ্যমেই তো অর্ডারটা পেয়েছি স্যার!
–ইংরেজিতে লেখা কেন?
–উনি যে বাংলা জানেন না স্যার!
–কী নাম?
–এক রোডরিগ। গোয়র লোক স্যার! থাকেন বোম্বেতে।
–উনি বাংলা বই কী করবেন?
রামদুলালবাবু মাথা নেড়ে বললেন,–তা তো জানি না স্যার! কদিন আগে বোম্বে গেলুম, তখন এই কাগজে লিখে দিয়ে বললেন, বইটা জোগাড় করে দিলে দু’লাখ টাকার অর্ডার পাইয়ে দেবেন।
–বেশ। এবার বলুন–বইটা কীভাবে চুরি গেল?
রামদুলালবাবু বললেন,–এক গেলাস জল খাব স্যার।
ষষ্ঠীচরণ ভেতরের পর্দা তুলে দৃশ্যটা উপভোগ করছিল। কর্নেল বলার আগেই জল দিয়ে গেল। রামদুলালবাবু জলটা ঢকঢক করে খেয়ে রুমালে মুখ মুছে বললেন,–বইটা অফিসেই টেবিলের ড্রয়ারে রেখে বাড়ি গিয়েছিলুম। অফিসে কিছু কাজ ছিল। সারতে রাত দশটা বেজে গিয়েছিল। আজ সওয়া বারোটার ফ্লাইটে বোম্বে যেতুম বইটা সঙ্গে নিয়ে। অফিসের কিছু কাগজপত্রও নেওয়ার দরকার ছিল। তাছাড়া থাকি সেই বেহালায়। ভেবেছিলুম, যাওয়ার পথে অফিস হয়ে সব নিয়ে যাব। তো অফিসে এসে দেখি, বইটা নেই। তন্নতন্ন খুঁজে অফিসের সব্বাইকে জিজ্ঞেস করে কোনো হদিশ পেলুম না।
–ড্রয়ারে তালা দেওয়া ছিল?
–ঠিক খেয়াল হচ্ছে না স্যার! এসে দেখলুম তালা দেওয়া নেই। ড্রয়ারের তালা কিন্তু ভাঙা নেই।
–চাবি আপনার কাছে থাকে তো?
–হ্যাঁ স্যার! তবে অফিসের চাবি দারোয়ানের কাছে থাকে। কিন্তু দারোয়ান কেন বই চুরি করবে?
–অফিসে রাতে দারোয়ান ছাড়া আর কে থাকে?
রামদুলালবাবু চমকে উঠলেন।–আর কেউ থাকে না। তবে গত রাতে… স্যার! তাহলে কি সেই নোকটাই?
–কোন্ লোকটা?
–রোডরিগ সায়েবের রিপ্রেজেন্টেটিভ। কাল বিকেলে বোম্বে থেকে ভদ্রলোক এসেছিলেন। কার্ড দেখালেন। বললেন, রাত্তিরটা থেকে গৌহাটি যাবেন ভোরের ফ্লাইটে। আমি বললুম, তাহলে কষ্ট করে হোটেলে গিয়ে লাভ কী? অফিসে দুখানা ঘর–মাঝখানে পার্টিশান। ওঁকে পাশের ঘরে থাকবার ব্যবস্থা করে দিলুম। সকালে অফিসে এসে দারোয়ানের কাছে জিজ্ঞেস করলুম। বলল,–ভদ্রলোক ভোরে চলে গেছেন।
–কী নাম?
একটু ভেবে নিয়ে রামদুলালবাবু বললেন,–কী যেন–আর মৈত্র, নাকি এস মৈত্র। তবে স্যার, অবিশ্বাস করব কেমন করে? রোডরিগ সায়েবের কত রিপ্রেজেন্টেটিভ তো মাঝে-মাঝে কলকাতা আসে। আমার অফিসে রাত কাটিয়ে যায়।
–কেমন চেহারা?
–ছিপছিপে গড়ন। ফর্সা রং। মুখে দাড়ি।
কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ঠিক আছে। আপনি এখন আসুন। আমি দেখছি।
রামদুলালবাবু কর্নেলের হাত জড়িয়ে ধরে বললেন, আমার সাংঘাতিক ক্ষতি হবে স্যার, বইটা না পেলে। বেয়াই বলেছে ও বই মাথা ভাঙলেও আর পাওয়া যাবে না কোথাও। মাত্র ওই একটা কপি ছিল। তাছাড়া, আমি আবার বেয়াইয়ের দোকানে গিয়েছিলুম স্যার! সেখান থেকেই আসছি। জগমোহন বোস একই কথা বলল।
আরও কিছুক্ষণ সাধাসাধি করে রামদুলালবাবু বিদায় নিলেন।
কর্নেল গম্ভীরমুখে দাঁড়িয়ে আছেন। বললুম,–জগমোহন এর পেছনে নেই তো? হয়তো বইটার আরও শাঁসালো খদ্দের জুটে গেছে।
