কর্নেল বললেন : হ্যাঁ–জগমোহনের আচরণে সত্যি দুঃখ পেয়েছি, জয়ন্ত। কাল রাত নটায় দোকান বন্ধ করার সময় ফোন করে বলেছে, আমি যাইনি বলে অন্য এক খদ্দেরকে বইটা বেচে দিয়েছে। দেখো ওর কাণ্ড। সন্ধ্যা সাতটায় বইটা পেয়েছে বলে খবর দিল। তার দু’ঘণ্টা পরে জানাল, অন্য একজনকে বেচে দিয়েছে। আবার সেই সঙ্গে ফ্যাক-ফ্যাক করে হাসি।
কর্নেল হঠাৎ কোনার সেই টেবিলটার দিকে উঠে গেলেন। তারপর একটুকরো কাগজ হাতে নিয়ে ফিরলেন। কাগজটার দিকে তাকিয়ে একটুখানি বিড়বিড় করার পর বললেন,–আচ্ছা জয়ন্ত, এমন পাঁচটা পাখির নাম করো তো, যা ক অক্ষর দিয়ে শুরু।
ভেবে নিয়ে বললুম,–কাক, কোকিল, কাঠঠোকরা, কাকাতুয়া, কাদাখোঁচা…
–খাসা জয়ন্ত, খাসা! দিশি মতে ক অক্ষর খুব পয়মন্ত। ব্যঞ্জনবর্ণের প্রথম অক্ষর। হিন্দুদের দেবতা কৃষ্ণের নাম এই অক্ষর দিয়ে শুরু। ভক্ত প্রহ্লাদের গল্পে আছে, পাঠশালায় বালক প্রহ্লাদ ক পড়তে গিয়ে কেঁদে ফেলত। তো জয়ন্ত, তুমি যে পঞ্চপাখির নাম বললে,–প্রাচীন মিশরীয় চিত্রলিপিতে তারা ছিল পাঁচটি পবিত্র শব্দের প্রতীক। স্যাটর, আরেপো, টেনেট, অপেরা, রোটাস। মিশরে রোমানদের রাজত্বকালে এই শব্দগুলো দিয়ে এক আশ্চর্য ধাঁধা বানানো হয়েছিল। এই দেখো।
তাহলে তখন আমার বিজ্ঞ বন্ধু কাগজে এই ধাঁধা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিলেন। কাগজটার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলুম। তাতে লেখা আছে :
চুপ করে আছি দেখে কর্নেল বললেন,–কোনো বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ছে না?
-হ্যাঁ। যেদিক থেকে যে অক্ষর ধরে পড়ি, পাঁচটা একই শব্দ পাচ্ছি। মিশরীয়রা মাথা খাঁটিয়ে অদ্ভুত সাজিয়েছে তো!
–শুধু তাই নয়। ছকটা চারদিকে SATOR শব্দ দিয়ে ঘেরা। রোমানরা একে বলত Cirencester Word Square এবং এ নাকি এক রহস্যময় শব্দবর্গ। সম্ভবত খ্রিস্টীয় চতুর্থ-পঞ্চম শতকে প্যাপিরাসে মিশরীয় চিত্রলিপিতে এই শব্দবর্গ লেখা হয়। উনিশ শতকে এটি উদ্ধার করা হয়। হিড়িক পড়ে যায় এই ধাঁধার জট ছাড়াতে। আপাতদৃষ্টে রোমান ভাষায় শব্দগুলো পর পর রেখে মানে করলে দাঁড়ায় : The Sower Arepo holds the wheels carefully. অর্থাৎ সোজা কথায় : ‘আরেপো নামে একটা লোক শস্যের বীজ ছড়ানোর সময় বীজ ছড়ানো যন্ত্রের চাকাগুলো সাবধানে ধরে থাকে। কিন্তু এ কথায় কী বলতে চাওয়া হয়েছে? নানা জনে নানা মানে বের করলেন। তারপর ১৮৪৭ সালে এক ইংরেজ আবিষ্কার করলেন একটা অদ্ভুত জিনিস। সিন্দুকের ভেতর পাঁচটা চামড়ার মোড়ক। মোড়কের ভেতর একটা করে প্রকাণ্ড পেরেক। আর মোড়কগুলোর গায়ে রোমান হরফে লেখা আছে SATOR, AREPO, TENET, OPERA, ROTAS। প্রতিটি পেরেকে নাকি রক্তের দাগ এবং রোমান ভাষায় কিছু খোদাই করা বাক্য। ইউরোপে আরও হইচই পড়ে গেল। পণ্ডিতরা একবাক্যে রায় দিলেন, তাহলে এই হচ্ছে সেই পাঁচটা পেরেক, যা বিধিয়ে যিশু খ্রিস্টকে ক্রুশে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। ভ্যাটিকানে যিশুর পবিত্র রক্তমাখা পেরেকগুলো রাখার আয়োজন হল। বিশেষ জাহাজ গেল সেই উদ্দেশে। কিন্তু ফেরার পথে ভূমধ্যসাগরে জাহাজটা ডুবে গেল প্রাকৃতিক দুর্যোগে। ব্যস, সেখানেই এই ঘটনার শেষ।
বললুম,–তাহলে বোঝা যাচ্ছে শব্দগুলো পাঁচটা পেরেকের নাম। কিন্তু এতকাল পরে ওগুলো আপনার মগজে বিধিয়ে দিল কে?
–রামশংকর শর্মা ওরফে রাম শন্না।
–সে কী!
কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন,–গতকাল ভৈরবগড় রাজবাড়িতে ওঁদের পারিবারিক লাইব্রেরিতে বইটা দেখি। ২০৪ পৃষ্ঠার বই। খুব জীর্ণ অবস্থা। একরাতেই পড়ে শেষ করি। এক অসাধারণ বাঙালি অ্যাডভেঞ্চারিস্টের আশ্চর্য কীর্তিকলাপ। কিন্তু এক জায়গায় রামশংকর লিখেছেন : ত্রিনিদাদের গ্রামে বাস করার সময় ঝড়জলের রাতে একজন রুগ্ন স্প্যানিশ পাদ্রি তার ঘরে আশ্রয় নেন। শেষরাতে তিনি মারা যান। তার আলখাল্লার মধ্যে চামড়ার একটা মোড়ক ছিল। স্থানীয় গির্জায় পাদ্রির জিনিসপত্র পৌঁছে দেওয়ার আগে কৌতূহলবশে রামশংকর মোড়কটা খোলেন। তার ভেতর ফুটখানেক লম্বা কালো মোটা একটা লোহার পেরেক ছিল, তার গায়ে রোমান হরফে কীসব লেখা ছিল। পেরেকটাতে একটুও মরচে ধরেনি এবং আশ্চর্য ব্যাপার, তাতে রক্তের দাগ ছিল। চামড়ার মোড়কেও রোমান হরফে লেখা ছিল SATOR; কী ভেবে ওটা রামশংকর ফেরত দেননি। পরে এক বিশপের কাছে কথাটার মানে জিজ্ঞেস করে রহস্যটা টের পান। তাহলে জাহাজডুবির সময় অন্তত একটা পেরেক কেউ বাঁচাতে পেরেছিল–হয়তো সেই রুগ্ন পাদ্রিই।
জিজ্ঞেস করলুম,–রাম শন্না কী করলেন পেরেকটা?
সেটাই প্রশ্ন। আত্মচরিতে কোথাও সেকথা লেখা নেই। এমনকি, পরে ওটার উল্লেখ পর্যন্ত নেই।-কর্নেল চুরুটের ধোঁয়া ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে বললেন, বইটা রাজাবাহাদুরকে উপহার দিয়েছেন রামশংকরেরই এক বংশধর প্রণবশংকর বাঁড়ুজ্জে। খুব দুষ্প্রাপ্য বই। সঙ্গে মাইক্রোফিল্মের সরঞ্জাম ছিল না। ভাবলুম সময়মতো এসে মাইক্রোফিল্ম কপি করে নেব। তো আমার বরাত। কদিন আগে রাজাবাহাদুর ট্রাংককলে জানালেন, বইটা চুরি গেছে। তার সন্দেহ, রাজবাড়ির আশ্রিত এক ভদ্রলোকের জুয়াড়ি নেশাখোর ছেলে হরিসাধনই একাজ করেছে। কারণ ইতিপূর্বে তার লাইব্রেরি থেকে কিছু দুষ্প্রাপ্য বই চুরি গেছে।
