ওই জানালার বাইরে এক বিশাল নিমগাছ। সেখানে ঝাঁকে-ঝকে শীতের কুচকুচে কালো কাক তুমুল চ্যাঁচামেচি করছে। সেটাই কি আমার বৃদ্ধ বন্ধুর বিরক্তির কারণ? উনি কি ওদের শাপমন্যি করছেন? করারই কথা। ওই কদাকার পাখিগুলো ছাদের যত্নলালিত প্ল্যান্ট ওয়ার্ল্ডের দুষ্প্রাপ্য অর্কিড এবং ক্যাকটাসের ওপর প্রায়ই হামলা করে।
‘গুড মর্নিং’ সম্ভাষণের জবাব না পেয়ে একটু ইতস্তত করার পর সোফায় বসে পড়লুম। একটু পরে ষষ্ঠীচরণ নিঃশব্দে কফির পেয়ালা রেখে গেল। তার মুখখানাও বেশ তুম্বো। অনুমান করলুম –তাহলে নির্ঘাত এই সুন্দর শীতের সকালে প্রভু-ভৃত্যে কোনো মনকষাকষি হয়ে থাকবে এবং প্রভু-ভদ্রলোক পেয়ারের ভৃত্যের উদ্দেশেই গোপনে শাপান্ত করছেন।
কিন্তু কী করে থাকতে পারে ষষ্ঠীচরণ? কোনো প্রজাপতির ঠ্যাং ভেঙে ফেলেছে? নাকি টোরা দ্বীপ থেকে সংগৃহীত তিনপেয়ে অলুক্ষুণে বাদুড়টির খাঁচা খুলে দিয়েছে? যতদূর জানি, ষষ্ঠী ওই কিস্তৃত স্তন্যপায়ী উড়ুকু জন্তুটিকে দু-চক্ষে দেখতে পারে না।
কফিতে চুমুক দিয়ে আড়চোখে দেখলুম কর্নেল এবার টেবিলের দিকে ঝুঁকে কী যেন লিখছেন। মিনিট দুই পরে উনি হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন এবং পায়চারির ভঙ্গিতে আমার দিকে এগিয়ে এলেন। তখন বললুম,–ষষ্ঠীচরণটা বড্ড বাজে।
আমার বৃদ্ধ বন্ধু গলার ভেতর বললেন,–ষষ্ঠীর চেয়ে বাজে লোক জগমোহন বোস।
–জগমোহন আবার কে?
কর্নেল একটা ভারী শ্বাস ছেড়ে বললেন,–আসলে লোকটা প্রচণ্ড অর্থপিশাচ। দেখো জয়ন্ত, টাকার চেয়ে দামি জিনিস হল মুখের কথা। কথা দিয়ে যে কথা রাখে না তার মতো পাপী আর কে?
–ঠিক, ঠিক। কিন্তু কী কথা দিয়ে কথা রাখেনি আপনার এই জগমোহন?
দুঃখিত স্বরে কর্নেল বললেন,–আগেও লোকটা ঠিক এরকম করেছিল। এম্মানুয়েল দ্য সামসার লেখা ‘দা ফ্লোরা অ্যান্ড ফনা অফ ক্রিসো আইল্যান্ডস’ বইটার দরদাম ঠিক করে এলুম। পরদিন আনতে গিয়ে শুনি, বেশি দাম পেয়ে কাকে বেচে দিয়েছে। ১৭৮৪ সালের বই। অতি দুষ্প্রাপ্য। আমার ক্ষোভের কারণ শুধু তাই নয়, জগমোহন দাঁত বের করে হাসছিল। ভাবতে পারো?
সহানুভূতি দেখিয়ে বললুম,–ভীষণ অন্যায়।
ফোঁস করে ফের শ্বাস ছেড়ে কর্নেল বললেন, তুমি কি এই প্রবাদ শুনেছ ডার্লিং? যত হাসি তত কান্না-বলে গেছেন রাম শন্না।
–শুনেছি। সত্যি তো হাসি ভালো নয়। জগমোহন কেঁদে কূল পাবে না পরে।
কর্নেল বললেন,–রাম শন্না অর্থাৎ রামশংকর শর্মা ১৮৫৯ সালে ‘আত্মচরিত’ নামে নিজের জীবনী লেখেন। খুব রোমাঞ্চকর তার জীবন। কম বয়সেই বাড়ি থেকে পালিয়ে জাহাজে সি-বয়ের চাকরিতে ঢোকেন। সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ান। বৃদ্ধ বয়সে নদীয়ার গ্রামে ফিরে পৈতৃক ভিটেতে প্রকাণ্ড বাড়ি তৈরি করেন। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহ হয়। রামশংকর গোপনে বিদ্রোহীদের অর্থসাহায্য করতেন। তার ফলে ইংরেজ শাসকদের কোপে পড়েন এবং বিচারে তাঁর ফাঁসি হয়। ফাঁসিসেলে থাকার সময় তিনি ওই আত্মচরিতখানি লিখেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর সরকারের অনুমতি নিয়ে তাঁর ভাই শ্যামশংকর বইটি ছেপে বের করেন। বইটি সত্যি মূল্যবান এবং দুষ্প্রাপ্য। জগমোহনকে কিছুদিন যাবত তাগিদ দিচ্ছিলুম, বইটি যদি জোগাড় করতে পারে।
বাধা দিয়ে বললুম,–জগমোহনের কি বইয়ের দোকান আছে?
–হুঁ। কলেজ স্ট্রিটে গেলে দেখতে পাবে, সাইনবোর্ডে লেখা আছে : ‘হারানো বই’। ঘুপচি ঘরের ভেতর আগাপাশতলা পুরোনো বইতে ঠাসা। দাঁড়াবার জায়গা পর্যন্ত নেই। ফুটপাথ থেকে কথা বলতে হবে। তবে জগমোহনকে তুমি পুরোপুরি দেখতে পাবে না। বইয়ের গাদার ফাঁকে ওর নাকটুকু ছাড়া আর কিছু চোখে পড়বে না। শরীরের বাকি অংশ দেখতে হলে তোমাকে টাকা বের করতে হবে। তখন দেখবে বইয়ের সুড়ঙ্গ থেকে ফ্যাকাশে একটা হাতের তালু বেরিয়ে আসছে।
কর্নেল করুণ হাসলেন। ফের বললেন,–গতকাল সন্ধ্যায় সে ফোনে বলল : শিগগির চলে আসুন। বইটা পাওয়া গেছে। কিন্তু এদিকে হতচ্ছাড়া ষষ্ঠী এমন কীর্তি করে বসে আছে যে তখন আমার মরবারও ফুরসত নেই। পাগল হয়ে খুঁজছি।
–কী?
–বৈজ্ঞানিক নাম হল ভ্যানেসা আর্টিসি। বাংলায় বলতে পারো কাছিম-প্রজাপতি। কারণ দূর থেকে দেখলে মনে হবে লিলিপুট কাছিম। উড়লেই কিন্তু ঝলমলে পরী। আমার বিশ্বাস, নচ্ছার ষষ্ঠী ওটাকে ওড়াতে চেয়েছিল। অমনি হাত ফসকে পালিয়েছে। ওঃ জয়ন্ত! কী কষ্ট করে না ওটা জোগাড় করে এনেছিলুম। তুমি জানো, এই শীতে ওদের ঘুমোবার সময়! বেচারাকে ঘুম থেকে খুঁচিয়ে জাগিয়ে ব্যাটাচ্ছেলে ষষ্ঠীচরণ…
ঝটপট উঠে দাঁড়িয়ে বললুম,–রাম শন্নার বইটা আর পাবেন কি না জানি না, তবে আপনার প্রজাপতিটা আপনি পাবেন–যদি স্থির হয়ে একটু দাঁড়ান।
ওঁকে ভীষণ চমকে দিয়ে ওঁর দাড়ি থেকে খপ করে প্রজাপতিটা ধরে ফেললুম। কর্নেল বিস্ময় ও আনন্দে এক চিক্কর ছেড়ে আমার হাত থেকে প্রিয় প্রজাপতিটা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে পাশের ঘরে দৌড়ে গেলেন। একটু পরে ফিরে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন,–ডার্লিং! এবেলা তোমার লাঞ্চে নেমন্তন্ন।
কিছুক্ষণ বৃদ্ধ প্রকৃতিবিদ যেন শিশু হয়ে গেলেন। ষষ্ঠীচরণকে ক্ষমা করে দিলেন। মুখ টিপে হেসে সে ঝটপট ফের দুপেয়ালা কফি এবং প্লেটভর্তি স্ন্যাক্স রেখে গেল। কফি খেতে-খেতে কর্নেলকে স্মরণ করিয়ে দিলুম, এত হাসি হয়তো ভালো না। কারণ রাম শন্না বলে গেছেন, যত হাসি তত কান্না।
