“তার মানে সেই অকালকুষ্মাণ্ডটা? সেটা তো আপনি…”
“চুপ। চুপ। দেওয়ালের কান আছে।”
উত্তেজনা চেপে বললুম, “ওক্কে বস।”
.
লাহাবাবুকে আশ্বাস দিয়ে কর্নেল বেরোলেন। তখন প্রায় ন’টা বেজে গেছে। কর্নেল একটা সাইকেলরিকশা ডাকলেন। বললেন, “রায়রাজাদের শিবমন্দির দর্শনে যাব।”
রিকশায় যেতে-যেতে বললুম, “আবার ওখানে কেন?”
“শ্রীমান বিশুকে খুঁজে বের করা দরকার।”
শিবমন্দির এলাকা এখনও তেমনই নিরিবিলি সুনসান। সাইকেলরিকশাটা চলে যাওয়ার পর কর্নেল বাইনোকুলারে চারদিক দেখে নিয়ে আস্তে বললেন, “পাঁচিলের এপাশে গুঁড়ি মেরে এগোতে হবে। সাবধান।”
কথা না বাড়িয়ে ওঁকে অনুসরণ করলুম। একতলা বাড়ির দিকটায় পাঁচিলে একটা প্রকাণ্ড ফোকর দেখা গেল। সেখানে গিয়ে কর্নেল উঁকি দিলেন। আমিও উঁকি দিলুম। কিছুক্ষণ পরে দেখি, পাঁচুঠাকুর এদিক-ওদিকে তাকাতে-তাকাতে মন্দিরের দিকে যাচ্ছেন। হাতে একটা ছোট্ট রেকাবি। পুজোর নৈবেদ্য ছাড়া আর কী হতে পারে?
কর্নেল ফোকর দিয়ে ঢুকলেন। আমিও ঢুকলুম। তারপর পা টিপেটিপে হেঁটে মন্দিরের পেছনে চলে গেলুম দু’জনে। চত্বর থেকে মন্দিরের মেঝে প্রায় ফুট পাঁচেক উঁচু। এদিকে একটা ছোট্ট ঘুলঘুলি। লোহার গরাদ আছে। কর্নেল উঁকি মেরে কিছু দেখার পর চোখের ইশারায় আমাকেও দেখতে বললেন। কর্নেলের মুখে মিটিমিটি হাসি। ঘুলঘুলিতে চোখ রাখতেই দেখলুম, অন্যদিকের ঘুলঘুলি থেকে রোদ ঢুকেছে এবং স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, পাতালঘরের মেঝেয় একটা যেমন-তেমন বিছানা পাতা। সেই বিছানায় বসে পাঁচুঠাকুর একটা বছর দশ-বারো বয়সের ছেলেকে আদর করে খাওয়াচ্ছেন। দু’জনের চাপাস্বরে কথাবার্তাও কানে এল।
“আর আজকের দিনটা একটু কষ্ট করে থাক। কাল ভোরবেলা দু’জনে তোর মাসির বাড়ি চলে যাব। দেখি না ত্র্যম্বক দেয় নাকি লাহাবাবু?”
“এখানে আমার আর থাকতে ইচ্ছে করছে না দাদামশাই! বড্ড ভয় করছে।”
“আঃ! কাঁদে না। আমি তো রাত্তিরে তোর কাছে থাকি। না কি? ভয় কীসের?”
“ত্র্যম্বক লাহাবাবু যদি না দেয়?”
“না দিলে রায়সায়েব আমাকে খুন করে ফেলতেন। ওই কেতো হারামজাদাটা কী লাগিয়ে এসেছে ওঁর কানে। না হলে উনিই বা কেমন করে জানবেন?”
“তুমি আমার পাখি উড়িয়ে দিলে কেন বলো?”
“সাধে কি তোকে বোকা বলি? তুই খেয়ে নে। আমি একবার শ্মশানতলা দেখে আসি, ত্র্যম্বক রেখে গেছে নাকি।”
কর্নেল আমাকে টেনে সরিয়ে আনলেন। তারপর ফিসফিস করে বললেন, “কুইক! চলে এসো।”
দু’জনে সাবধানে সেই ফোকর দিয়ে বেরিয়ে গেলুম। হাঁটতে-হাঁটতে শ্মশানবটের কাছে পৌঁছে কর্নেল বললেন, “তুমি ওই ঝোঁপের আড়ালে চলে যাও।”
ঝোঁপের আড়াল থেকে দেখলুম, কর্নেল জ্যাকেটের ভেতর পকেট থেকে একটা কালো কাগজে মোড়া ছোট্ট কী একটা জিনিস গুঁড়ির নীচে সেই চৌকো পাথরটার ওপর রাখলেন। তারপর চলে এলেন আমার কাছে। কিছুক্ষণ পরে দেখি, পাঁচুঠাকুর আসছেন। চঞ্চল চাউনি। পা টিপেটিপে এসে থমকে দাঁড়ালেন। চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। “জয় বাবা! জয় বাবা!” বলে করজোড়ে চৌকো পাথরটার সামনে এসে ভূমিষ্ঠ হলেন। দেখলুম, দু’চোখে জল গড়াচ্ছে।
কিন্তু যেই দু’হাতে কাগজে মোড়া জিনিসটা উনি তুলে নিয়ে কপালে ঠেকিয়েছেন, গুঁড়ির আড়াল থেকে বাগসায়েব বেরিয়ে এলেন।”অ্যাই বিচ্ছু! দে ওটা। নইলে গুলিতে খুলি ছাদা করে দেব।”
বাগসায়েবের হাতে রিভলভার। পাঁচুঠাকুর ককিয়ে উঠে মোড়কটা ওঁর হাতে দিতে যাচ্ছেন, এমন সময় বটগাছের ডাল থেকে কে বাগসায়েবের কাঁধে পড়ল। বাগসায়েবের রিভলভার থেকে গুলি বেরিয়ে গেল। পাখিরা চ্যাঁচামেচি জুড়ে দিল। দু’জনে ধস্তাধস্তি চলেছে, পাঁচুঠাকুর সেই সুযোগে কেটে পড়ার তালে ছিলেন। হঠাৎ এক সুটপরা স্মার্ট চেহারার ভদ্রলোককে মন্দিরের দিক থেকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল। পাঁচুঠাকুর তাকে দেখে চেঁচিয়ে উঠলেন, “রায়সায়েব! রায়সায়েব! এই নিন আপনাদের ত্র্যম্বক!”
কর্নেল বেরিয়ে গিয়ে বললেন, “হ্যাল্লো রায়সায়েব!”
রায়সায়েব হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করলেন। এতক্ষণে বাগসায়েবের কাঁধে ঝাঁপিয়ে-পড়া লোকটাকে চিনতে পারলুম। আমাদের হালদারমশাই বাগসায়েবের পিঠে চেপে বসে আছেন। বললেন, “ঘুঘু দ্যাখছে, ফাঁদ দ্যাখে নাই!”
কর্নেল বললেন, “ঘুঘু নয় হালদারমশাই! টিয়ে! ওই শুনুন!”
গাছের উঁচ ডালপালার ভেতর থেকে শোনা গেল, “লাফাং চ দ্রিদিম্বা।”
হালদারমশাই ভড়কে গেলেন। অমনই তাকে উলটে দিয়ে ধরাশায়ী করে অরিন্দম বাগ ঝোঁপঝাড়ের ভেতর দিয়ে উধাও হয়ে গেলেন। হালদারমশাই চেঁচিয়ে উঠলেন, “পাকড়োয় পাকড়ো!”
কর্নেল বললেন, “ছেড়ে দিন। বাগসায়েবের চাইতে লাফাং চু দ্রিদিম্বা-বলা পাখিটাকে ধরার চেষ্টা করুন।”
পাঁচুঠাকুর আকৰ্ণ হেসে বললেন, “আমার নাতি ওই বুলি শিখিয়েছিল স্যার। লাহাবাবুকে ভয় দেখিয়ে ত্র্যম্বক আদায় করতে চেয়েছিল। তবে দোষটা আমারই।”
কর্নেল বললেন, “এখন আপনি নাতিকে মন্দিরের পাতালঘর থেকে বের করে আনুন। বেচারা বড় মুষড়ে পড়েছে।”
রায়সায়েব বললেন, “এটা আমার পূর্বপুরুষের ধন, কর্নেল! একে বলে ক্যাটস আই। বৈদূর্যমণি। কেতোকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। দেখি, ওকে বাঁচানো যায় কি না।”
পাঁচুঠাকুর দৌড়ে মন্দিরের দিকে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে বিশুকে বের করে আনলেন পাতালঘর থেকে। বিশু বেরিয়ে এসে শিস দিতেই টিয়াপাখিটা ওর কাঁধে এসে বসল। বিশু খিকখিক করে হেসে বলল, “লাহাবাবু খুব ভয় পেয়েছিল। ওকে ভয় দেখাতেই পাখিটাকে শিখিয়েছিলুম, ‘লাহাবাবু, আমি বিশুর দিদিমা!’ লোকে ভাবত লাফাং চু দ্রিদিম্বা।”..
৩.০৩ বলে গেছেন রাম শন্না
সেদিন কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের জাদুঘর-সদৃশ ড্রয়িংরুমে ঢুকে একটু হকচকিয়ে গেলুম। বৃদ্ধ প্রকৃতিবিদ বেজায় গম্ভীরমুখে কোনার দিকে বসে আছেন এবং ভুরু কুঁচকে জানালার বাইরে কার উদ্দেশে বিড়বিড় করে কী যেন বলছেন। ওঁর ঋষিতুল্য সাদা দাড়িতে একটা কালো চকরাবকরা প্রজাপতি নিশ্চুপ বসে আছে, নিশ্চয় ওঁর সংগ্রহশালার কোনো দুর্লভ প্রজাতি। কিন্তু কর্নেলের এ-ব্যাপারে কোনো দৃকপাত নেই।
