সোফায় ছড়ি হাতে বেঁটে প্রকাণ্ড এক ভদ্রলোক গম্ভীর মুখে বসে ছিলেন। পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি। কপালে লাল তিলক। কর্নেলকে দেখে তার মুখে একটু করুণ হাসি ফুটল। বললেন, “এ-সবই আমার পাপের ফল স্যার! আর বেশি কী বলব? ওই বদমাশ পাঁচুঠাকুরের পেটে এত কুবুদ্ধি তা কি জানতুম?”
একটু চুপ করে থেকে লাহাবাবু বললেন, “আপনার মনে পড়তে পারে। বলেছিলুম, নার্সারিতে একটা শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করব। গত শিবচতুর্দশীতে তার ভিত হয়ে গেছে। তারপর ত্র্যম্বক আমার হাতে এল। নার্সারিতে নিয়ে গিয়ে দেবতার ধন যত্ন করে রাখলুম। একটু অসাবধান হয়েছিলুম। দেবতার ধনে কে আর হাত দেবে? ব্যস! রাতারাতি চুরি গেল আলমারি থেকে। অথচ আলমারির তালাও কেউ ভাঙেনি।”
“সে রাতে আপনি নার্সারিতে ছিলেন না?”
“না। যাই হোক, রায়রাজাদের সম্পত্তি। গোপনে কিনেছিলুম। গোপনে শিবমন্দিরেই রাখতুম। চুরি গেলে তাই তা নিয়ে হইচই করিনি। হঠাৎ ওই রাতবিরেতে ভৌতিক উপদ্রব। লোকে বলত। কিন্তু বিশ্বাস করিনি। সে রাতে আমার ঘরের জানলার বাইরে–দোতলায়, বুঝলেন? একেবারে মেয়েলি গলায় বলছে, লা…”।
কর্নেল ওঁর কথার ওপর বললেন, “বলছে, লাহাবাবু আমি বিশুর দিদিমা!”
লাহাবাবু নড়ে বসলেন। “ঠিক, ঠিক। সবাই শুনছে লাফাং চু দ্রিদিম্বা। কিন্তু আমি শোনামাত্র বুঝতে পারলুম কে কী বলছে।” লাহাবাবু চোখ বুজে শিউরে ওঠার ভঙ্গি করে করজোড়ে দেবতার উদ্দেশে প্রণাম করলেন।
হালদারমশাই খাইছে’ বলে একটিপ নস্যি খুঁজলেন নাকে।
কর্নেল বললেন, “তারপর কী হল বলুন?”।
লাহাবাবু বললেন, “তার পরদিন পাঁচুঠাকুর এসে হাজির। ওর হাতে দুটো বেনামী চিঠি। কাঁদতে-কাঁদতে বলল, ত্র্যম্বকের টাকা শোধ দেবে কিস্তিতে। ওর নাতিকে বাঁচাতে হবে। বিপদে পড়ে গেলুম। ত্র্যম্বক তো চুরি গেছে। সম্প্রতি কাগজে এই ডিটেকটিভদ্রলোকের বিজ্ঞাপন দেখেছিলুম। কাটিং রাখা ছিল। চুরি যাওয়া ত্র্যম্বক উদ্ধার করার কথা ভেবেই ওটা রেখেছিলুম। এবার ভাবলুম, ত্র্যম্বক এবং বিশু উভয়কেই ভালোয়-ভালোয় উদ্ধার করা যায় কি না। তাই চুপিচুপি গত পরশু কলকাতা চলে গেলুম। ব্যাপারটা গোপন রাখার জন্য নাম-ঠিকানা কাউকে জানাতে নিষেধ করলুম। কিন্তু তখনও কি জানি, আপনিও একজন আরও পাকা ডিটেকটিভ? এইমাত্র হালদারবাবু সব বললেন।”
হালদারমশাই উঠে দাঁড়ালেন, “আপনারা কথা বলুন। আমি দেখি, নৌকো পাই নাকি।”
কর্নেল বললেন, “সেই চিঠি দুটো কি আপনি হালদারমশাইকে দিয়েছেন?”
হালদারমশাই বললেন, “না কর্নেল সাব! আমি শুধু শেষ চিঠিটার কপি রেখেছি। আচ্ছা চলি! উইপন হাতে না থাকলে কাজে নামা রিস্কি।”
উনি বেরিয়ে গেলে লাহাবাবু পাঞ্জাবির তলায় ফতুয়ার ভেতরকার পকেট থেকে দু’টুকরো ভজ করা কাগজ বের করে কর্নেলকে দিলেন। কর্নেল চিঠি দুটো খুলে পড়ার পর বললেন, “হু, শ্রীমান বিশুর খাতা থেকে ছেঁড়া কাগজ। আর হাতের লেখাটাও শ্রীমান বিশুর।”
লাহাবাবু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বললেন, “আঁ! তা হলে দাদু-নাতি মিলে আমার কাছ থেকে ত্র্যম্বক আদায়ের ফন্দি? ওরে বাবা! ছেলেটাকে সবাই যে বিচ্ছু বলে, ঠিকই বলে দেখছি।”
“বিশু হয়তো দাদামশাইয়ের কথা শুনে মজা পেয়েই এমনটা করেছে। তার দেখা যতক্ষণ না পাচ্ছি, ততক্ষণ তাকে দোষী করা উচিত হবে না।” কর্নেল চুরুট জ্বেলে বললেন ফের, “গত রাতে আপনার ফার্মে চোর পড়েছিল শুনেছেন নিশ্চয়?”
“হ্যাঁ। বাগ রাত্তিরে এসে সব বলল। পাঁচুঠাকুরের স্যাঙাত ওই কেতোর কাজ। বাগ পুলিশকে জানিয়েছে। এর আগেও কেতো চুরির প্ল্যান করেছিল। ক্যাক্টি বা বিদেশি প্ল্যান্টের খদ্দের প্রচুর। আজকাল সবাই গার্ডেনিংয়ের নেশায় পড়ে গেছে। কম দামে পেলে তো কথাই নেই।”
“ব্যাঙা নামে আপনার নার্সারিতে একটা লোক আছে?”
“চোর। এক নম্বর চোর। বাগের অনুরোধে ওকে তাড়াচ্ছি না।”
“বাগসায়েব সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?”
লাহাবাবু হাসলেন, “বাগ আমার ছেলের মতো। আমার ছেলেপুলে তো নেই। ও অবশ্য আমাকে সাধুদা বলে ডাকে। রায়সায়েবকে একজন হর্টিকালচার-এক্সপার্ট দেখে দিতে বলেছিলুম। আমার বয়স হয়েছে আর অত ছোটাছুটি করতে পারিনে। তো..” লাহাবাবু জিভ কেটে উঠে দাঁড়ালেন।”আপনাদের খালিমুখে বসিয়ে রেখেছি। একটু বসুন। গোপাল! হারাধন! কই রে সব? কেত্তনে মেতে আছে, বুঝলেন?”
উনি ডাকতে-ডাকতে ছড়ি খুটখুট করে চলে গেলেন ভেতরে। এতক্ষণে বললুম, “বিশুর হাতে লেখা চিঠি! তা হলে বিশু কিডন্যাপড হয়নি। তাই না কর্নেল?”।
কর্নেল এ-কথার জবাব না দিয়ে মিটিমিটি হেসে বললেন, “মাথার মণি হারিয়ে সাপটা এখন পাগল হয়ে উঠেছে। দেখলেই ছোবল দেবে। শুধু বোঝা যাচ্ছে না, কেতো কেমন করে জানল এ্যম্বক কোথায় লুকননা আছে? ব্যাঙা তার শত্রু। অতএব নার্সারিতে অন্য কেউ আছে, যে কি না কেতোকে খবরটা পাচার করেছে। এটা ঠিক, সে জানত না জিনিসটা ঠিক কোনখানে কীভাবে লুকননা আছে। শুধু জানত, কোনো একটা ক্যাক্টির মধ্যেই আছে। হয়তো মণিচোরকে দৈবাৎ মণিটা লুকনোর ব্যবস্থা করতে দূর থেকে দেখেছিল। সেই ক্যাকিটা ছোট্ট থলেয় ঢোকানো যায়। অথচ তীক্ষ্ণ কাটার জন্য চটের পুরু থলে চাই।”
অবাক হয়ে বললুম, “আঁ?”
কর্নেল দাড়ি নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ!”
