পাঁচুঠাকুর বিরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পরে হালদারমশাই আর-এক প্রস্থ প্যান্টশার্ট পরে কাঁধে কিটব্যাগ ঝুলিয়ে এসে পড়লেন। বাঁ হাতে ভিজে নিংড়ানো কাপড়চোপড়। পায়ে রবারের স্যান্ডেল। মুখে প্রসন্ন হাসি। বললেন, “কর্নেল স্যারের সঙ্গে কনট্যাক্ট করার সুযোগ পাইনি রাত্তিরে। ফাঁদে পড়ে গিয়েছিলুম। নৌকোয় করে ওই চরে নিয়ে গিয়ে তারপর লোকটা ‘আসছি’ বলে নিপাত্তা। রাত্তিরে গঙ্গায় সাঁতার কাটার সাহস হল না। তাই দিনের আলো ফুটলে–আরে! ভদ্রলোক গেলেন কোথায়? উনিই তো আমাকে…খাইছে!”
ঘুরে দেখি, পাঁচুঠাকুর নেই। মন্দির চত্বরে ঢুকেও ওঁর পাত্তা পাওয়া গেল না। ঘরের দরজায় তালা ঝুলছে।
.
ছয়
হালদারমশাই বিড়বিড় করছিলেন, “কী আশ্চর্য! কী আশ্চর্য!”
কর্নেলের প্রশ্নের উত্তরে তিনি যা বললেন, তা সংক্ষেপে এই : এখানে এসে মক্কেলের নির্দেশমতো হালদারমশাই পাঁচুঠাকুরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কারণ পাঁচুঠাকুরই দুটো বেনামী চিঠি পেয়ে সেই মক্কেল ভদ্রলোককে অনুরোধ করেছিলেন, নাতিকে যেন উদ্ধারের ব্যবস্থা করেন। হালদারমশাইকে পাঁচুঠাকুর বলেন, তার ধারণা গঙ্গার ওই চরে তার নাতিকে আটকে রেখেছে কারা। সন্ধের মুখে নৌকোয় সেখানে পৌঁছে দেবেন হালদারমশাইকে। তবে চুপিচুপি যেতে হবে। হালদারমশাই শ্মশানবটের ওদিকে অপেক্ষা করবেন। পাঁচুঠাকুর নৌকো ভাড়া করে আনবেন। কথামত নৌকো এল। পাঁচুঠাকুরও এলেন। তারপর নৌকো চরে পৌঁছলে পাঁচুঠাকুর মাঝিদের অপেক্ষা করতে বলে হালদারমশাইকে নিয়ে চরের জঙ্গলে ঢোকেন। একখানে তাকে দাঁড় করিয়ে রেখে ‘আসছি’ বলে পাঁচুঠাকুর চলে যান। তারপর আর তার পাত্তা নেই। নৌকোর খোঁজে এসে দ্যাখেন, নৌকোও নেই। কিটব্যাগটা কী ভেবে সঙ্গে নিয়ে যাননি। বটগাছের গুঁড়ির ওপর লুকিয়ে রেখেছিলেন। শুধু টর্চ আর রিভলভার সম্বল। সারারাত চরের জঙ্গলে কী কষ্টে যে কাটান, বলার নয়। ভোরবেলা রিভলভার আর টর্চটা নরম বালিতে পুঁতে রেখে ‘জয় মা’ বলে গঙ্গায় ঝাঁপ দেন। এখন আবার নৌকো ভাড়া করে ওই জিনিস দুটো আনতে যেতে হবে। কিন্তু কথা হল, পাঁচুঠাকুর কেন এমন অদ্ভুত ব্যবহার করলেন, গোয়েন্দা ভদ্রলোক বুঝতে পারছেন না।
হালদারমশাই কথা শেষ করে পা বাড়ালেন। “মক্কেলকে গিয়ে বলি। একটা নৌকোর ব্যবস্থা করতে হবে।”
“এক মিনিট হালদারমশাই!” কর্নেল বললেন, “আপনার নোটবই!”
“হঃ!” বলে ঘুরে হাত বাড়ালেন ডিটেকটিভ।
কর্নেল তার পিঠে আটকানো ব্যাগ থেকে নোটবইটা বের করে দিয়ে বললেন, “আমার একটা ভুল হয়েছিল। স্বীকার করা উচিত। নোটবইয়ে রায়সাহেবের নাম ঠিকানা টোকা দেখেই আমি ভুলটা করেছি। এখন বুঝতে পারছি, আপনার মক্কেল রায়গড়ের সাধুচরণ লাহা।”
“হঃ!” বলে হালদারমশাই হন্তদন্ত চলে গেলেন।
আমি এবার হালদারমশাইয়ের ভঙ্গিতে বললুম, “কী আশ্চর্য! কী আশ্চর্য!”
“আশ্চর্য হওয়ার সময় পরে আরও পাবে, ডার্লিং! পাঁচুঠাকুর আর এবেলার মতো ডেরায় ফিরবেন না মনে হচ্ছে। ততক্ষণে ওঁর ঘরটা একটু দেখা দরকার।” বলে কর্নেল জ্যাকেটের ভেতর থেকে যে জিনিসটা বের করলেন, সেটা সম্ভবত ‘মাস্টার-কি’ ওই যন্ত্রটি দিয়ে যে-কোনো সাধারণ তালা খোলা যায়।
জানলাগুলো খোলা ছিল। ঘরের ভেতর একটা সেকেলে প্রকাণ্ড খাট। নোংরা বিছানা পাতা আছে। দেওয়াল-আলমারিতে পাঁজিপুঁথি ধর্মশাস্ত্রের বই ঠাসা। তলার তাকে স্কুলের বই, খাতাপত্তর, অনেক ডটপেন। আলমারির কাঁচ কবে ভেঙেচুরে গেছে। কোনার দিকে একটা কাঠের সিন্দুক। দড়িতে কিছু কাপড়চোপড় ঝুলছে। বিশুর প্যান্টশার্ট দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। বেচারাকে কারা কোথায় আটকে রেখেছে। এখনও অবশ্য প্রায় ৪৫ ঘণ্টা সময় আছে হাতে। এই সময়ের মধ্যে এ্যম্বক না পেলে কিডন্যাপাররা তাকে…
মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “ওঃ!”
কর্নেল বিশুর খাতাপত্তর ঘাঁটছিলেন। বললেন, “হুঁ, বড্ড মশা!”
“মশা নয়। বেচারা বিশুর কথা ভাবছি।”
কর্নেল খাতাগুলো রেখে খাটের কাছে গেলেন। বালিশের তলা খুঁজলেন, তারপর গদির তলায় হাত ভরলেন। বললেন, “তুমি একটু বারান্দায় যাও, জয়ন্ত! কাউকে আসতে দেখলে জানাবে।”
বারান্দায় গিয়ে নজর রাখলুম। কেউ কোথাও নেই। সেই পাখির খাঁচাটা তেমনই পড়ে আছে জঞ্জালের গাদায়। একটু পরে কর্নেল বেরিয়ে বললেন, “পাঁচুঠাকুর লোকটি সত্যিই বড় অদ্ভুত। হরির কথা ঠিক। উনি লাহাবাবুকে ত্র্যম্বক বেচেছিলেন। রায়সাহেবের কয়েকটা চিঠি থেকে বোঝ গেল, পূর্বপুরুষের দেবতার ধন হারিয়ে যাওয়ার কথা শুনে রায়সাহেব পাঁচুঠাকুরের ওপর বেজায় খাপ্পা। তারও সন্দেহ, পাঁচুঠাকুরই ওটা কাউকে বেচে দিয়েছেন। ওটা না পেলে এবার পুলিশকে জানাবেন। বেগতিক দেখে ঠাকুরমশাই অগত্যা একটা চাল চেলেছেন মনে হচ্ছে। জয়ন্ত, এখনই আমাদের লাহাবাবুর কাছে যাওয়া দরকার।”
দরজার তালাটা কোনোরকমে আটকে কর্নেল বারান্দা থেকে নামলেন। ফের বললেন, “কুইক! এখানে থাকা আর নিরাপদ মনে হচ্ছে না।”
রাস্তায় কিছুক্ষণ হেঁটে একটা সাইকেলরিকশা পাওয়া গেল। লাহাবাবুর বাড়ি রায়গড় বাজার এলাকা ছাড়িয়ে গঙ্গার ধারে। মাইকে সঙ্কীর্তনের ঘটা শুনেই বুঝলুম, লাহাবাবুর বাড়ি এসে গেছি। দোতলা বিরাট বাড়ি। ভেতর দিকে সঙ্কীর্তন চলেছে। গেটেই হালদারমশাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। “আসুন! আসুন!” বলে সম্ভাষণ করে বসার ঘরে নিয়ে গেলেন আমাদের। যেন হালদারমশাইয়েরই বাড়ি।
