“কেতোর সঙ্গে তোমার কীসের বিবাদ?”
ভুতো ফিসফিস করে বলল, “কেতো লাহাবাবুর নার্সারিতে চুরি করতে যাবে বলেছিল। আমি যেন ওর সঙ্গে থাকি। কিন্তু ব্যাঙাদা আমার মাসতুতো দাদা, স্যার। তাই ভাবলুম, ব্যাঙাদাকে দলে টানতে পারলে ভালো হয়। আমি তো জানতুম না ব্যাঙাদার সঙ্গে কেতোর আদায়-কাঁচকলায় সম্প। ব্যাঙাদাকে কথাটা বললুম। অমনই ব্যাঙাদা পইপই করে আমাকে বারণ করল। তারপর এক কেলেঙ্কারি। সেদিনই বিকেলে লাহাবাবু আর ম্যানেজারবাবু পুলিশ নিয়ে কেতোর বাড়ি হাজির। বেগতিক দেখে গা-ঢাকা দিলুম। দারোগাবাবু কেতোকে থানায় নিয়ে গিয়ে ভোলাই দিয়ে ছেড়ে দিলেন। সেই থেকে কেতোর আমার ওপর রাগ।”
“গত রাতে নার্সারিতে চোর ঢুকেছিল জানো তো?”
ভুতো পিটপিট করে তাকিয়ে বলল, “ব্যাঙাদা বলছিল। এতক্ষণ কেতোকে ধরতে পুলিশ বেরিয়েছে।”
“তা হলে আর কেতোর ভয় করছ কেন?”
“কিছু বলা যায় না স্যার। এবার কেতো কোথাও লুকিয়ে আছে। ঠাকুরমশাই নিশ্চয় জানেন। তাই ওকে ডাকতে গেলেন।” বলে ভুতো কর্নেলের পা ধরার চেষ্টা করল। “আমাকে ছেড়ে দিন স্যার! আর কক্ষনো এমন কাজ করব না।”
কর্নেল তাকে ছেড়ে দিতেই সে খিড়কির দরজা খুলে গুলতির বেগে উধাও হয়ে গেল। পাঁচুঠাকুরও এসে গেলেন তক্ষুনি। মুখটা বেজায় তুম্বো। সঙ্গে কেউ নেই। বললেন, “ব্যাটাটা কই?”
কর্নেল বললেন, “হাত ফসকে পালিয়ে গেল।”
পাঁচুঠাকুর প্রায় ভেংচি কেটে বললেন, “পালিয়ে গেল! আপনার হাতে পিস্তল ছিল। তবু পালিয়ে গেল? খেলনা পিস্তল নাকি?”
“ঠিক ধরেছেন। কিন্তু আপনার কেতো কই?”
“নেই। ওর বউ বলল, গত রাত্তিরে বেরিয়েছে। এখনও বাড়ি ফেরেনি। মরবে হতচ্ছাড়া।”
“আপনার নাতির খবর কী?”
“আছে কোথাও।” পাঁচুঠাকুর তাড়া দিলেন, “যান। চান করে আসুন। পুজোর জোগাড় করি। আর শুনুন, ওই ম্লেচ্ছ বস্ত্র পরে থাকলে তো চলবে না। সঙ্গে ধুতি পট্টবস্ত্রাদি আছে তো?”
“তা তো নেই!”
“ঠিক আছে। কলিতে সবই জলচল। আর দশটা টাকা ধরে দেবেন।”
গতিক বুঝে বললুম, “আচ্ছা ঠাকুরমশাই, কলিতে বিনা স্নানেও কি চলবে না? যদি আর দশটা টাকা ধরে দিই?”
পাঁচুঠাকুর মাথা দুলিয়ে সায় দিয়ে বললেন, “তা হলে অন্তত আচমনটা করে আসুন। হ্যাঁ–হিসেবটা বুঝিয়ে দিই। পুজোর বাকি পাওনা হল গে কুড়ি। বস্ত্রের দশ। চানের বাবদ দশ। একুনে চল্লিশ।”
খিড়কির দরজার নীচেই পুরোনো ঘাট ধাপে-ধাপে নেমে গেছে গঙ্গায়। শ্যাওলা আর ঘাস গজিয়ে আছে। গঙ্গার জলে লাল আভা ছড়িয়ে রয়েছে। ওপারে কুয়াশাঢাকা গাছপালার মাথায় লালচে ছটা। কর্নেল বাইনোকুলারে ওপারটা দেখছিলেন। হঠাৎ বলে উঠলেন, “মাই গুডনেস!”
“কী হল?”
“ওটা দেখছি একটা দহ।”
“তাতে অবাক হওয়ার কী আছে?”
“আছে। কারণ এই ঠাণ্ডা হিম জলে সাঁতার কেটে এপারে আসছেন,–হুঁ, আমাদের হালদারমশাই-ই বটে। পূর্ববঙ্গের বরিশাল জেলার মানুষ। তাতে পুলিশে চাকরি করতেন। কিন্তু বোঝা যাচ্ছে না, শেষ মার্চের এই ভোরবেলা ওঁর সাঁতার কাটার ইচ্ছে হল কেন?”
এতক্ষণে দূরে কালো একটি বস্তুর নড়াচড়া দেখতে পেলুম। বাতাস বন্ধ। তাই জল নিস্তরঙ্গ। বললুম, “কী সর্বনাশ!”
“সর্বনাশের কী আছে? এর আগেও বহুবার হালদারমশাইকে গঙ্গায় সাঁতার কাটতে দেখেছি। তুমিও নিশ্চয় দেখেছ। কেন? গতবার সেই কাটরার মাঠে তুলারাম দণ্ডীমশাইয়ের ফার্মে কাকতাড়ুয়া রহস্যের কথা ভুলে গেলে?”
আমি কিছু বলার আগেই পিছনে পাঁচুঠাকুরের সাড়া পেলুম। “কী? এখনও আচমন হয়নি?” কর্নেল বললেন, “সাঁতার কাটা দেখছি ঠাকুরমশাই!”
“আঁ! সাঁতার কাটা? এদিকটায় অথৈ দহ। কার সাধ্যি সাঁতার কাটে?”
“ওই দেখুন, কালো একটা মুণ্ডু।”
পাঁচুঠাকুর কিছুক্ষণ চেষ্টার পর দেখতে পেয়ে বললেন, “মরবে! একেবারে মারা পড়বে। তা মরুক গে! গঙ্গায় ডুবে মলে মোক্ষ। আপনারা আসুন। মাহেন্দ্রযোগ বেশিক্ষণ থাকে না।”
“আপনি পুজোয় বসুন। যাচ্ছি।”
পাঁচুঠাকুর চলে গেলেন। হালদারমশাই কোনাকুনি সাঁতার কেটে আসছিলেন। কিছুক্ষণ পরে ঘাটে পৌঁছে গেলেন। উনি ধাপে উঠে বসতে দেখলুম, পরনে প্যান্টশার্ট লেপটে আছে। পায়ে জুতো নেই। মুখ থেকে জল মুছতে থাকলেন। কর্নেল ডাকলেন, “হালদারমশাই!”
“ক্কী?” বলে ঘুরলেন প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে. কে. হালদার। তারপর তড়াক করে উঠে দাঁড়ালেন। আবার চোখ দুটো মুছে তাকালেন গুলিগুলি চোখে। “ওটা কেডা? জয়ন্তবাবু না?”
বললুম, “আপনার ঠাণ্ডা লাগছে না হালদারমশাই?”
“লাগলে আর কী করুম! এটু রেস্ট লই। জাস্ট আ মিনিট!”
কর্নেল বললেন, “জয়ন্ত, তোমার ব্যাগে কাপড়চোপড় আছে। বের করো। আগে তোয়ালেটা!”
হালদারমশাই উঠে এলেন ধাপ বেয়ে। তারপর কোনো কথা না বলে দৌড়ে চললেন ঝোঁপঝাড়ের ভেতর দিয়ে। উনি উধাও হয়ে গেলে বললুম, “ওঁর কি মাথা খারাপ হয়ে গেল?”
কর্নেল চোখে বাইনোকুলার তুলে ওঁর গতিবিধি দেখতে থাকলেন। একটু পরে বললেন, “অসাধারণ! এই না হলে ডিটেকটিভ? জয়ন্ত, হালদারমশাই শ্মশানবটে প্রকৃত টিকটিকির মতোই উঠে যাচ্ছেন। আই সি! ওঁর কিটব্যাগটা লুকনো ছিল দেখছি।”
পাঁচুঠাকুর এলেন আবার। “বিনি যজমানেই পুজো হয়ে গেল। কই, চল্লিশ টাকা দিন।”
কর্নেল বললেন, “চলুন, দিচ্ছি। আমাদের এক বন্ধু আসছেন। একটু অপেক্ষা করুন।”
