“বলেন কী!”
“জানতুম, টবটা এ-রাতেই উধাও হতে পারে। তাই ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে ওদিকে বেরিয়েছিলুম। দেখলুম, টবটা নেই। যাই হোক, এখন পুজো দিতে যাচ্ছি। আর ও-সব মন্দ কথা নয়। মনকে পবিত্র রাখা উচিত, ডার্লিং!”
হালদারমশাইকে যেখানে বসে থাকতে দেখেছিলুম, তার একটু তফাতে শ্মশানবট। কর্নেলকে জায়গাটা দেখিয়ে দিলুম। কিন্তু উনি গ্রাহ্য করলেন না। বটতলায় গিয়ে দেখি, অজস্র ঝুরি আর শেকড়বাকড়ে ঢাকা মাটিতে পাথরের টুকরো পড়ে আছে। কোনো পুরনো মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ সম্ভবত। বিশুর কিডন্যাপাররা এই বটগাছের গোড়ায় যে চৌকো পাথরে ‘ত্র্যম্বক’ রেখে আসতে বলেছে, কর্নেল সেটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। পাথরটা বেশ লম্বা-চওড়া। কতকটা বেদির মতো দেখতে। নীচে প্রচুর ছাই পড়ে আছে। সাধুসন্ন্যাসীরা এসে খুনি জ্বেলে বসে থাকেন মনে হল।
চারদিকে কুয়াশা। বটতলায় আবছা আঁধার জমে আছে তখনও। পাথরটা দেখে কর্নেল পা বাড়িয়েছেন, হঠাৎ বটগাছটার আড়াল থেকে দুটো লোক বাঘের মতো কর্নেলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমি মাত্র হাত তিনেক পিছনে ছিলুম। ঘটনার আকস্মিকতায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে গেছি। কর্নেল টাল সামলে নিয়ে কী একটা করলেন কে জানে। মাত্রা দু-তিন সেকেন্ডের ঘটনা। লোক দুটো দুধারে ছিটকে পড়ে ককিয়ে উঠল। কর্নেল ডান দিকের নোকটার পিঠে একটা পা চাপিয়ে দিলেন। এবার আমার হুঁশবুদ্ধি ফিরল। বাঁ দিকের লোকটার ওপর লাফ দিতে গেলুম। সে আমাকে এক ধাক্কায় ধরাশায়ী করে নিমেষে উধাও হয়ে গেল। ভাগ্যিস, পাথর বা শেকড়ের ওপর পড়িনি। উঠে দাঁড়িয়ে দেখি, কর্নেলের হাতে রিভলভার। লোকটার পিঠে পায়ের চাপ দিতেই সে আবার ককিয়ে উঠল। কর্নেল ঝুঁকে তার জামার কলার ধরে টেনে দাঁড় করালেন।
আন্দাজ বছর পঁচিশেক বয়সের এক যুবক। গাঁট্টাগোট্টা চেহারা। পরনে যেমন-তেমন একটা প্যান্ট আর নোংরা শার্ট। মাথার চুল খুঁটিয়ে ছাঁটা। গলায় একটা তক্তি। খালি পা। কারণ চপ্পল দুটো ছিটকে পড়েছে।
কর্নেল তার কানের পাশে রিভলভারের নল ঠেকিয়ে বললেন, “নাম কী?”
সে হাত দুটো জোড় করে বলল, “আর কখনও এমন করব না স্যার। এবারকার মতো ছেড়ে দিন।”
“নাম কী?”
“ভু-ভু-ভু…
“ভুতো?”
“হ্যাঁ স্যার। দয়া করে ছেড়ে দিন স্যার। আর কখনও এমন হবে না। নাক-কান মলছি স্যার!”
কর্নেল তাকে ঠেলতে-ঠেলতে নিয়ে চললেন। সে কাকুতি-মিনতি করতে থাকল। শিবমন্দিরের কাছাকাছি গিয়ে সে ভঁা করে কেঁদে উঠল। কর্নেল বললেন, “ছোটপুজোর বদলে বড়পুজোই দেওয়া যাবে, জয়ন্ত! কী বলো? বাবা মহাদেবের সামনে একে বলি দেব। কেতো এ-সব কাজে নাকি খুব পাকা। ঠাকুরমশাই বলছিলেন, শোনোনি?”
ভুতো হেঁড়ে গলায় কেঁদে উঠল। “ওরে বাবা! কেতো আমাকে পেলে সত্যি বলিদান দেবে। স্যার! স্যার! আপনার পায়ে পড়ি স্যার!”
স্যার তাকে পায়ে পড়ার সুযোগ দিলেন না। মন্দিরের সেই ফটক দিয়ে আমরা চত্বরে ঢুকলুম। ঢুকেই দেখি, পাঁচুঠাকুর তার ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। চোখে পলক নেই। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বললেন, “এ ব্যাটাকে কোথায় পেলেন আপনারা?”
কর্নেল বললেন, “বড়পুজোই দেওয়া যাক তা হলে। কী বলেন ঠাকুরমশাই?”
পাঁচুঠাকুর আকৰ্ণ হেসে বললেন, “কী রে ভুতো? কেতোকে ডেকে আনি তা হলে?”
ভুতো বেজায় কান্নাকাটি জুড়ে দিল। কর্নেল বললেন, “কেতোকে খুব ভয় পায় মনে হচ্ছে?”
পাঁচুঠাকুর বললেন, “সে তো দেখতেই পাচ্ছেন। কেতো ওকে পেলে এক্ষুনি বলি দেবে।”
“কেন বলুন তো?”
“কেন, তা কেতোই জানে। চোরে-চোরে মাসতুতো ভাই। যাকগে, পুজোর সময় হয়ে এল। যান, গঙ্গায় চান করে আসুন। আপনিও যান মশাই!” বলে পাঁচুঠাকুর আমাকেও চোখের ইশারায় খিড়কির দরজা দেখিয়ে দিলেন।
আঁতকে উঠে বললুম, “চান করতে হবে নাকি?”
“গঙ্গায় চান না করে এলে পুজো দেবেন কী করে? নিয়ম মেনে চলতে হবে না?”
কর্নেল বললেন, “কিন্তু এই ভুতোর কী হবে? এর একটা ব্যবস্থা করা দরকার। বটতলায় আমার ওপর আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এর সঙ্গে আর একজন ছিল।”
পাঁচুঠাকুর ভুতোকে বললেন, “সঙ্গে কে ছিল রে? সত্যি করে বল। তা হলে ছাড়া পাবি। নইলে খ্যাচাং করে বলিদান হয়ে যাবি। কেতো তক্কেতক্কে আছে।”
ভুতো নাক ঝেড়ে বলল, “ব্যাঙাদা ছিল।”
পাঁচুঠাকুর চোখ কপালে তুলে বললেন, “ব্যাঙা তোর মতো ছিনতাইবাজ হল কবে থেকে? সে তো লাহাবাবুর নার্সারিতে চাকরি করে। ভালো মাইনেকড়ি পায়।”
ভুতো ফেস-ফোঁস করে বলল, “তা জানি না ঠাকুরমশাই! মাইরি, বাবা মহাদেবের দিব্যি। শেষ রাত্তিরে আমাকে বাড়ি থেকে ডেকে এনেছিল। এই বুড়ো সায়েবের কাছে কী দামি জিনিস আছে, ছিনতাই করতে হবে। ব্যাঙাদা বলল, তুই জাপটে ধরবি। আমি জিনিসটা ছিনতাই করব।”
পাঁচুঠাকুর গুম হয়ে গেলেন এবার। আস্তে বললেন, “ক’টা বাজল। দেখুন তো মশাই?”
কর্নেল বললেন, “ছ’টা।”
“সময় আছে। আমি কেতোকে ডেকে নিয়ে আসি। এর একটা বিহিত করা দরকার। ব্যাটাকে ছাড়বেন না যেন।” বলে পাঁচুঠাকুর হনহন করে বেরিয়ে গেলেন।
ভুতো আবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। কর্নেল চাপাস্বরে বললেন, “ভুতো! তোমাকে ছেড়ে দেব, যদি একটা কথার সত্যি জবাব দাও।”
ভুতো কান্না থামিয়ে বলল, “বলব স্যার! বাবা মহাদেবের দিব্যি।”
