বলে বাগসায়েব জোরে বেরিয়ে গেলেন। বললুম, “ভদ্রলোক কেমন যেন গোঁয়ার-গোবিন্দ টাইপ।”
“হুঁ! তবে হর্টিকালচার বিদ্যায় এমন এক্সপার্ট আমি এ-পর্যন্ত দেখিনি। বিশেষ করে ক্যাক্টি সম্পর্কে উনি আস্ত এনসাইক্লোপিডিয়া!” কর্নেল স্বগতোক্তি করার মতো মিঃ বাগের প্রশস্তি শুরু করলেন। কিন্তু একটা ব্যাপারে খটকা লাগছে। ওই বারান্দার একিনোক্যাকটাস গ্রুসিনিয়িতে কেন ফুল ফোঁটাতে ব্যর্থ হলেন? পরীক্ষা করে দেখলুম, ফুল ফোঁটানোর জন্য বেচারা তৈরি। অথচ–এক মিনিট!”
কর্নেল পুবের দরজা খুলে আবার বেরোলেন। আমি চুপচাপ বসে রইলুম। আমার প্রকৃতিবিদ বন্ধুর অজস্র বাতিকের সঙ্গে আমি পরিচিত।
প্রায় পাঁচ মিনিট পরে উনি ঘরে ফিরলেন। মুখে প্রশান্ত হাসি। বললেন, ‘ফুল না ফোঁটার কারণ বুঝতে পেরেছি। সত্যিই প্রকৃতি বড় রহস্যময়ী, ডার্লিং! শুধু বুঝতে পারছি না, এই মূল্যবান অকালকুষ্মটা কেন ওখানে হেলাফেলায় রাখা হয়েছে? কেন?” চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে চুরুট ধরালেন কর্নেল। চোখ বুজে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ সোজা হয়ে বসলেন। আস্তে বলে উঠলেন, “মাই গুডনেস! তা হলে কি চোরের কবল থেকে বাঁচাতেই এমন হেলাফেলা করে রাখা এবং পিছনের দিকের খোলাবারান্দায়? চোর যদি বিশেষ একটা অকালকুষ্ম চুরি করতেই আসে, স্বভাবত সে ঢুকবে ক্যাক্টির বাগানে। সেখানেই সে ওটা খুঁজবে। এবং ঠিক তা-ই ঘটেছে। চোর ক্যাক্টির বাগানেই ঢুকেছিল। দৈবাৎ কারও চোখে পড়ায় থলে ফেলে পালিয়ে গেছে। অথচ যেটা সে চুরি করতে এসেছিল, সেটা এখানে থাকার খবর সে জানত না।”
না বলে পারলুম না, “ব্যাপারটা কী, খুলে বলুন তো?”
কর্নেল চোখ নাচিয়ে বললেন, “ব্যাপার যাই হোক, ভোরবেলা ছোটপুজো দিতে যাচ্ছি। বিছানা থেকে হিড়হিড় করে টেনে ওঠাব, জয়ন্ত। বাবা ভোলানাথ পুজো দেওয়ার আগেই প্রসন্ন হয়ে বর দিয়েছেন মনে হচ্ছে।”
ভাবনায় পড়ে গেলুম। ভোরে ওঠা অভ্যাস নেই। তা ছাড়া এখানে এখনও শীত চলে যায়নি। কপালে ভোগান্তি আছে মনে হচ্ছে।
রাত দশটা বেজে গেল। তখনও বাগসায়েব ফিরলেন না। হরির তাগাদায় আমরা খেতে গেলুম। খাওয়ার পর হরি আমাদের ঘরে এল বিছানা সাজাতে। মশারি খাঁটিয়ে দিয়ে সে বলল, “বড্ড মশা হয়েছে ইদানীং। আর-একটা কথা বলি স্যার, রাতবিরেতে যেন বেরোবেন না।”
কর্নেল বললেন, “লাফাং চু দ্রিদিম্বা?”
হরি সেই রিকশাওয়ালার মতো কপালে হাত ঠেকিয়ে চাপাস্বরে বলল, “দোর ধন যতদিন দোর কাছে ফেরত না যাচ্ছে, ততদিন ঠাকরুনের আত্মা শান্তি পাবে না।”
“দেবতার ধন গেল কোথায়, হরি?”
হরি ফিসফিস করে বলল, “তখন বলতে-বলতে বলা হল না। আমার সন্দ স্যার, পাঁচুঠাকুর আমাদের কর্তামশাইকেই বেচে দিয়েছে।”
“কেন তোমার এ সন্দেহ হচ্ছে?”
“পাঁচুঠাকুর ইদানীং প্রায়ই কর্তামশাইয়ের কাছে আসত। দু’জনে চুপিচুপি কীসব কথাবার্তা হত। তারপর তো দিদিঠাকরুন রাতবিরেতে বাড়ির আনাচে-কানাচে এসে সাড়া দিতে লাগলেন। অমনই কর্তামশাইয়ের তরাস বাজল। ভয়ে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। বুঝুন স্যার! ভয় তো সব্বাই পেয়েছে। কিন্তু কর্তামশাইয়ের ভয়টা এত বেশি কেন?” হরি একটু হাসল। “কর্তামশাইয়ের বাড়ি রোজ পুজোআচ্চা, অষ্টপ্রহর সঙ্কীর্তন চলেছে। কিন্তু পাঁচুঠাকুরকে পুজোআচ্চায় ডাকেননি। বুঝুন তা হলে!”
“দেবতার ধন জিনিসটা কী, জানো হরি?”
হরি কপালে ফের হাত ঠেকিয়ে বলল, “বাবার মাথায় থাকেন সাপ, সেই সাপের মাথার মণি।”
“তুমি দেখেছ?”
“না স্যার, শুনেছি।”
হরি চলে গেলে কর্নেল বললেন, “দরজা বন্ধ করে দাও, জয়ন্ত! আর শোনো, হরির কথা অক্ষরে-অক্ষরে পালন কোরো। রাতবিরেতে বাইরে বেরিও না–যা কিছু ঘটুক। সাবধান!”
কর্নেল হাসিমুখে কথাটা বললেও মনে হল, সত্যিই সাবধান করে দিচ্ছেন আমাকে। দরজা বন্ধ করে চুপচাপ শুয়ে পড়লুম। নতুন জায়গায় গেলে সহজে ঘুম আসতে চায় না। তা ছাড়া একটা জমজমাট রহস্যের মধ্যে এসে পড়লে তার জট ছাড়ানোর চেষ্টা করাও আমার বরাবর অভ্যাস। কর্নেলকে টেক্কা দেওয়ার ইচ্ছে মাথাচাড়া দেয়। কিন্তু এ এমন এক রহস্য, যার কোনো খেই খুঁজে পাচ্ছি না।
কখন চোখের পাতা জড়িয়ে এসেছিল ঘুমের টানে। হঠাৎ ঘুমটা ছিঁড়ে গেল। বাইরে পুবের বারান্দায় কী খুটখাট শব্দ হচ্ছে। জানলা খোলা আছে। কিন্তু উঠে গিয়ে উঁকি মেরে দেখার সাহস হল না। শব্দটা থেমে গেলে চুপিচুপি ডাকলুম, “কর্নেল! কর্নেল!” কর্নেলের নাক ডাকা থামল না। তারপর ঘুম আর আসতেই চায় না।
একসময় কর্নেলের ডাকাডাকিতে চমকে উঠে দেখি, সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছিলুম। কর্নেল বললেন, “উঠে পড়ো, ডার্লিং! ছোটপুজো দিতে যেতে হবে। সাড়ে পাঁচটা বাজে। আর শোনো, ব্যাগট্যাগ সব গুছিয়ে নাও। আমরা সম্ভবত আর নার্সারিতে ফিরছি না।”
.
পাঁচ
বাইরে গাঢ় কুয়াশা জমে আছে। সদর গেট দিয়ে বেরিয়ে বাঁ দিকে একটা পোড়ো জমি পেরিয়ে গঙ্গার ধারে নিচু বাঁধে উঠলুম। তারপর গতরাতে বাইরের সেই সন্দেহজনক শব্দটার কথা বললুম কর্নেলকে। কর্নেল হাসতে-হাসতে বললেন, “চোরের ওপর বাটপাড়ি হয়ে গেছে বলা চলে। তবে এ চোর অন্য চোর।”
“হেঁয়ালি করার অভ্যাস আপনার গেল না!”
“পুবের বারান্দার সেই অকালকুষ্মাণ্ড টবসমেত উধাও।”
