কর্নেল বললেন, “মেন সুইচ কেউ অফ করে দিয়েছিল নাকি?”
মিঃ বাগ চমকে উঠে বললেন, “হাঃ!”
“চোরকে সুইচবোর্ডের তালা ভাঙতে হয়েছে তা হলে?”
“আপনি দেখেছেন বুঝতে পারছি!”
“নাহ মিঃ বাগ! আমার অনুমান।”
মিঃ বাগ অবাক হয়ে কর্নেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “এর আগেও নার্সারিতে চোর পড়েছে শুনেছি। তাই পাঁচিলের ওপর কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছিলেন সাধুদা। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, এবার সুইচবোর্ডের তালা ভেঙে মেন সুইচ অফ করে এবং কাঁটাতারের বেড়া কেটে চোর কী চুরি করতে এসেছিল?”
“সম্ভবত অকালকুষ্মণ্ড।”
“কী বললেন? কী বললেন? অকালকুষ্মাণ্ড?” মিঃ বাগ হো-হহা করে হেসে উঠলেন।
কর্নেল গম্ভীর মুখেই বললেন, “ওইটুকু চটের থলেতে বড় জোর ওইরকম জিনিসই চুরি করে নিয়ে যাওয়া যায়।”
“আপনার রসিকতার তুলনা হয় না।” মিঃ বাগ দামি বিদেশি সিগারেট ধরিয়ে বললেন, “যাই হোক, আমি বুঝতে পেরেছি, চোরের সহকারী এই নার্সারিতেই আছে।”
“বাগের ঘরে ঘোগের বাসা আর কি! সরি–বাঘের ঘরে।”
বাগসায়েব আবার একচোট হাসলেন।”একটু রিলিফ পাওয়া গেল। আপনি না থাকলে মেজাজ এখনও কতক্ষণ বিগড়ে থাকত।” বলে একটু ঝুঁকে এলেন কর্নেলের দিকে। চাপা গলায় বললেন, “আমার সন্দেহ হচ্ছে গণেশ ড্রাইভারকে। সাধুদা ডেকে পাঠিয়েছিলেন। জিপ ড্রাইভিং আমার এখনও তত সড়গড় হয়নি। গণেশকে ডাকতে পাঠালুম। হরি এসে বলল, গণেশের নাকি জ্বর। ব্যাটাচ্ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দেব কি না ভাবছি।”
“তার আগে দেখা উচিত, সত্যি-সত্যি জ্বর কি না।”
“ঠিক বলেছেন। দেখে আসি।”
মিঃ বাগ তখনই বেরিয়ে গেলেন। কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। গঙ্গার দিকের দরজা খুলে বললেন, “এসো জয়ন্ত! এদিকের বারান্দায় বসা যাক।”
বেরিয়ে গিয়ে বললুম, “এই ঠাণ্ডার মধ্যে বসার কোনো মানে হয় না। মার্চের শেষেও এখানে দেখছি শীত চলে যায়নি।”
ছোট্ট বারান্দায় সুন্দর সব নানারকম ক্যাক্তি আর মরসুমি ফুলের টব সাজানো রয়েছে। গেট পর্যন্ত লনের দু’ধারেও পুষ্পসজ্জা, কেয়ারি করা ঝোঁপ। এদিকটাতেও যথেষ্ট আলো। বেতের চেয়ারে বসে বললুম, “আপনি মিঃ বাগকে অকালকুষ্মণ্ড বললেন। উনি কথাটা বুঝতে পারেননি।
“তুমি পেরেছ?”
“হ্যাঁ। সকালে ফোনে রায়সায়েবের সঙ্গে কথা বলার সময় আপনার মুখে শুনেছি। তা ছাড়া সেই অকালকুম্মাণ্ড নেওয়ার ছলেই আপনি এখানে এসেছেন।”
“হুঁ, একিনোক্যাকটাস গ্রুসিনিয়ি।” বলে কর্নেল আঙুল তুললেন একটা টবের দিকে, “ওই দ্যাখো ডার্লিং, অকালকুষ্মণ্ড!”
বারান্দার কোনার দিকে টবে অজস্র তীক্ষ্ণ কাটায় ভরা গোলাকার একটা ক্যাক্টি দেখতে পেলুম। হঠাৎ কর্নেল উঠে গেলেন টবটার কাছে। টর্চের আলো ফেলে খুঁটিয়ে দেখতে থাকলেন। বললুম, ‘অতক্ষণ ধরে কী দেখছেন?”
“ফুল ফোটেনি কেন? আশ্চর্য তো!”
“আপনিই বলছিলেন প্রকৃতিতে প্রচুর রহস্য আছে।”
“আছে।”
কর্নেল আরও কিছুক্ষণ টর্চের আলোয় খুঁটিয়ে দেখার পর উঠে এলেন। তারপর এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে গুম হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। বললুম, “কী ব্যাপার?”
“তুমি ঠিকই বলেছ। বারান্দায় ঠাণ্ডাটা বড্ড বেশি। গঙ্গার ধারে বলেই এদিকটা এত ঠাণ্ডা।”
কর্নেল কথাটা বলেই ঘরের দরজার দিকে ঘুরেছেন এবং আমিও উঠে দাঁড়িয়েছি, কাছাকাছি কোথাও বিদঘুঁটে নাকিস্বরে কে বলে উঠল, “লাফাং চু দ্রিদিম্বা! লাফাং চু দ্রিদিম্বা!”
আমার বুকটা ধড়াস করে উঠেছিল। উত্তেজিতভাবে ফিসফিসিয়ে উঠলুম, “কর্নেল!”
কর্নেল প্রায় লাফ দিয়ে বারান্দার নীচে নেমে গেলেন। আমি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইলুম। এপাশে-ওপাশে উঁচু গাছপালার আড়ালে অন্ধকার থেকে কে যেন আমাদের দেখছে। এই অস্বস্তিকর অনুভূতি আমাকে পেয়ে বসেছিল। কর্নেল এদিকে-ওদিকে টর্চের আলো ফেলছিলেন। আর প্রেতাত্মার সাড়া পাওয়া গেল না।
একটু পরে কর্নেল ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে মিটিমিটি হেসে বললেন, “গুড লাক, ডার্লিং! রায়গড়ে আসা তা হলে সার্থক হল বলো!”
“গলার স্বরটা আমার কিন্তু মেয়েলি বলেই মনে হল।”
“ঠাকরুনের প্রেতাত্মার গলা। কাজেই মেয়েলি হওয়া স্বাভাবিক।”
“ভূত-প্রেত বলে কিছু থাকতে পারে না।”
“কিন্তু তুমি ভীষণ ভয় পেয়েছিলে!”
“আচমকা ওইরকম নাকিস্বরে কেউ উদ্ভুট্টে কীসব বলে উঠলে মানুষ একটু চমকে উঠতেই পারে।”
মিঃ বাগ ফিরে এলেন এতক্ষণে। বললেন, “গণেশের সত্যি জ্বর। তবে জ্বর গায়ে সুইচবোর্ডের তালা ভাঙাটা ওর পক্ষে কঠিন কিছু নয়। গ্যারাজঘরের পাশেই ট্রান্সফর্মার আর সুইচবোর্ড আছে। সাধুদার সঙ্গে পরামর্শ না করে পুলিশে খবর দেওয়া ঠিক হবে না। আবার রায়গড় যেতে হবে। কী ঝামেলা দেখুন তো! আপনার সঙ্গে জম্পেশ করে আড্ডা দেব, তার উপায় নেই। আমার ফিরতে দেরি হলে আপনারা খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়বেন। হরিকে বলে যাচ্ছি।”
কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন, “মিঃ বাগ! একটু আগে আমরা বাইরে কোথাও লাফাং চু দ্রিদিম্বা শুনতে পেয়েছি।”
“কী, কী?” মিঃ বাগ ভুরু কুঁচকে বললেন, “লাফাং চু দ্রিদিম্বা? আশ্চর্য ব্যাপার তো!”
“হরিও নাকি গত রাতে শুনেছে। আপনাকে বলতে সাহস পায়নি।”
মিঃ বাগ রুষ্ট ভঙ্গিতে বললেন, “সাধুদাও শুনেছিলেন। এমন ভিতু লোক দেখা যায় না। ভয়ে বাড়ি থেকে বেরোচ্ছেন না। কদিন ধরে বাড়িতে যাগ-যজ্ঞ শান্তি-স্বস্ত্যয়নের ধুম চলেছে। যাই বলুন কর্নেল, মফস্বলের লোকেরা এখনও বড় কুসংস্কারাচ্ছন্ন। তবে দেখুন, আমাকে উত্যক্ত করতে এলে ভূত হোক আর যে-ই হোক, গুলি করে মারব।”
