“কর্তামশাই আর বাগসায়েব বলাবলি করছিলেন। দয়া করে ওঁদের যেন বলবেন না আমি এসব কথা বলেছি। গরিব মানুষ স্যার! ঘরে একদঙ্গল পুষ্যি।”
“হুঁ।” কর্নেল আস্তে বললেন, “তা হলে দেবতার ধন বেচে দিয়েছেন পাঁচুঠাকুর? কিন্তু
দেবতার ধন কিনল কে? কিনলে তো মহাপাপ। তাই না হরি?”
হরি একটু ইতস্তত করে বলল, “আজকাল পাপের ভয় কেউ করে না স্যার। আমার আবার মন্দ…”।
বাইরে কেউ হেঁড়েগলায় ডাকল, “হরি! হরি! অ্যাই হোরে!”
হরি বিরক্ত হয়ে বলল, “আমার মরারও সময় নেই। ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো এই হরি-হরি আর হেরে! পরে বলব স্যার!”
বলে সে বেরিয়ে গেল। বললুম, “দেবতার ধন নিশ্চয় সেই ত্র্যম্বক। কিন্তু কর্নেল, পাঁচুঠাকুর যদি তা কাউকে বেচে দিয়ে থাকেন, তাঁর কাছে তা-ই দাবি করে তার নাতিকে কিডন্যাপ করা হল কেন? উড়োচিঠিটা তাকে উদ্দেশ করেই লেখা।”
কর্নেল কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে বললেন, “একটা চিঠি নয়। দুটো।”
অবাক হয়ে বললুম, “কী করে বুঝলেন দুটো?”
“হালদারমশাই নোটবইয়ে টোকা চিঠিটা দ্বিতীয় চিঠির কপি। কারণ ওতে ‘আবার বলা হচ্ছে’ এই কথাটা আছে।” কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন। কিন্তু ঠাকুরমশাইকে দেখে মনে হল, কোনো উড়োচিঠি পাননি এবং নাতিকে গুম করে রাখা হয়েছে, তা-ও জানেন না। আমার অবাক লাগছে এটা।”
“সম্ভবত খুব ধূর্ত লোক। গভীর জলের মাছ।”
কর্নেল হাসলেন। “চিঠিতে ‘আদরের নাতি’কথাটা আছে কিন্তু! তা ছাড়া ত্র্যম্বক যে ওঁর কাছেই এখনও আছে, কিডন্যাপার যে বা যারাই হোক, তারা এতে নিঃসন্দেহ। আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, রিকশাওয়ালার কথা শুনে এবং এই নার্সারিতে আসার পর বুঝতে পেরেছি, বিশু কিডন্যাপড হওয়ার কথা এখানে এখনও জানাজানি হয়নি।”
“কর্নেল! পাঁচুঠাকুর বলছিলেন, বিশু কেতোর বাড়ি যাচ্ছে বলে বেরিয়ে যায়। আর ফেরেনি। কে কেতো সেটা জেনে নেওয়া উচিত। তার সঙ্গে কথা বলা দরকার।”
“তার আগে ছোটপুজো ডার্লিং!”
বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালুম। পুবের বারান্দায় গিয়ে বসব ভেবে দরজার কাছে গেছি, হঠাৎ আলো নিভে গেল। কর্নেল বললেন, “চুপচাপ ঘরেই বসে থাকো জয়ন্ত। ঠাকরুনের প্রেতাত্মার আবির্ভাব যে-কোনো মুহূর্তে হতে পারে।”
ঘরে-বাইরে ঘুটঘুট্টে অন্ধকার। ভূতপ্রেতে বিশ্বাস না থাকলেও এমন কথা শুনে গা ছমছম করা স্বাভাবিক। নিজেকে সাহস দিতে শুকনো হাসি হাসলুম। কিন্তু চেয়ার খুঁজতে গিয়ে শোবার খাটের সঙ্গে ধাক্কা লাগল। কর্নেল টর্চ জ্বাললেন। হাসতে হাসতে বললেন, “সাবধান জয়ন্ত! প্রেতাত্মা এসব চান্স মিস করে না।”
এইসময় বাইরে কে হেঁড়ে গলায় চেঁচাল, “হরি! মুকুন্দকে বল জেনারেটর চালিয়ে দিক।”
হরি ডাকছিল, “মুকুন্দবাবু! মুকুন্দবাবু।”
বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল। তারপর আবার চেঁচামেচি শোনা গেল। এবার অন্যরকম চিৎকার-চেঁচামেচি। তারপর বন্দুকের শব্দ। কর্নেল টর্চ জ্বেলে বেরোলেন। আমিও ওঁকে অনুসরণ করলুম। অন্ধকার নার্সারিতে এদিকে-ওদিকে টর্চের আলোর ঝলকানি এবং “চোর! চোর! চোর!” বিকট হাঁকডাক ছুটোছুটি চলেছে।
এতক্ষণে কাছাকাছি কোথাও জেনারেটর চালু হল। আলো জ্বলে উঠল। লনে আমাদের দেখে হরি হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বলল, “চোর ঢুকেছিল স্যার! একটা চটের থলে ফেলে পালিয়ে গেছে। কাটাতার কেটে পাঁচিল টপকে ঢুকেছিল। কী সাহস দেখুন!”
কর্নেল গম্ভীর মুখে শুধু বললেন, “চটের থলে?…”
.
চার
নার্সারিতে চোর পড়ার খবর পেয়ে ম্যানেজার বাগসায়েব হন্তদন্ত ফিরে এসেছিলেন রায়গড় থেকে। এসেই প্রথমে গার্ডদের একচোট নিলেন। উত্তর দিকের পাঁচিলের মাথায় কাঁটাতারের বেড়া কেটে চোর ঢুকেছিল। তখনই সেখানটা জোড়া দেওয়ার ব্যবস্থা করা হল। চটের থলেটা পড়ে ছিল যেখানে, সেখানে অনেকটা জায়গা জুড়ে ক্যাক্টির অজস্র টব। বাগসায়েব ফেরার আগেই কর্নেল থলেটা দেখে এসেছেন। মুখটা বেজায় গম্ভীর। আস্তে বললেন, “চলো জয়ন্ত, ঘরে গিয়ে বসি।”
বাগসায়েবের হম্বিতম্বি আর ছোটাছুটি দেখে হাসি পাচ্ছিল। ঘরে ঢুকে বললুম, “একেই বলে মশা মারতে কামান দাগা। ওইটুকু একটা চটের থলে দেখে বোঝা যাচ্ছে নেহাত ছিঁচকে চোর।”
কর্নেল চুরুট ধরিয়ে চোখ বুজে টানছিলেন। আমার কথা শুনে বললেন, “কিন্তু তারকাটা চোর!”
“আজকাল এটা কোনো ব্যাপার নয়। আগের দিনে চোরেরা সিঁদকাঠি ব্যবহার করত। এখন তারকাটা প্লাস ব্যবহার করে। হার্ডওয়্যার স্টোরে কিনতে পাওয়া যায়। দামও তত কিছু বেশি নয়।”
“থলেতে কী চুরি করতে এসেছিল বলে তোমার ধারণা?”
“দামি কোনো প্ল্যান্টের কাটিং।”
কর্নেল চোখ খুলে সোজা হয়ে বসে হাসলেন। “ঠিক ধরেছ। এই নার্সারিতে অনেক বিদেশি আর দুষ্প্রাপ্য প্ল্যান্টের কাটিং মজুত রয়েছে। তবে এত ঝুঁকি নিয়ে নার্সারিতে ঢুকেছে যে, সে ওইটুকু থলে এনেছিল কেন, এটাই প্রশ্ন।” বলে একটু চুপ করে থাকলেন কর্নেল। তারপর বললেন, “দ্বিতীয় প্রশ্ন, ওই সময়ই হঠাৎ লোডশেডিং।”
বাইরে জেনারেটরের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। এতক্ষণে বন্ধ হল এবং এবার আলো লাল হতে-হতে নিভে গেল। আবার সেই গাঢ় অন্ধকার। তার আধমিনিটটাক পরে উজ্জ্বলতর হয়ে আলো জ্বলে উঠল। বললুম, “কলকাতা হলে অন্তত দু ঘণ্টার আগে কারেন্ট আসত না!”
বাগসায়েব ঘরে ঢুকে ধপাস করে বসে বললেন, “ভারি অদ্ভুত ব্যাপার, কর্নেল!”
