ঘরের মেঝে উঁচুতে বলে জানলা দিয়ে বাইরেটা দেখা যায়। তাই ঘরে ফিরে আবার বাইনোকুলারে চোখ রাখলুম।
সেই নৌকো তরতর করে চলে যাচ্ছে। কোথাও হালদারমশাইকে দেখতে পাওয়া গেল না। আলোর রং ধূসর হয়ে গেছে। সব আবছা হয়ে পড়েছে এবার।
একটু পরে কর্নেল এবং মিঃ বাগের সাড়া পেলুম। কথা বলতে বলতে দু’জনে ঘরে ঢুকলেন। মিঃ বাগ সুইচ টিপে আলো জ্বেলে বললেন, “জয়ন্তবাবু হয়তো লক্ষ করেননি আমরা মাঠেঘাটে থাকলেও সিটিলাইফের আরাম ভোগ করি।”
কর্নেল বললেন, “জয়ন্ত মাঝে-মাঝে নেচারকে কাছে পেতে চায়। আমারই সঙ্গদোষে।”
মিঃ বাগ হাসলেন, “সমস্যা হল, নেচার খুব একটা নিরাপদ কিছু নয়। এই নার্সারিতে বেজায় সাপের উৎপাত হয়। অবশ্য এখন মার্চের শেষাশেষি, সাপেদের ঘুমের শেষ প্রহর। এপ্রিলের মাঝামাঝি একবার পাশ ফিরে শশাবে। তারপর মে মাসে বেরোতে শুরু করবে। জুনে তো সাঙ্ঘাতিক অবস্থা। নার্সারি ওদের কামোফ্লেজের পক্ষে চমৎকার জায়গা। গত জুনে ক্যাক্টি ভেবে একটা-নাহ, জয়ন্তবাবু ভাবলেন ওঁকে ভয় দেখাচ্ছি!”
কর্নেল সকৌতুকে বললেন, “জয়ন্ত অলরেডি ভয় পেয়ে গেছে।”
মিঃ বাগ জিভ কেটে বললেন, “সরি! আচ্ছা, আপনারা বিশ্রাম করুন। আমি একটু কাজ সেরে নিইগে ততক্ষণ। আর-এক দফা কফিও বলে দিচ্ছি। কর্নেলসায়েব তো ভীষণ কফিভক্ত।”
উনি চলে যাওয়ার পর কর্নেল বললেন, “তোমাকে এত মনমরা দেখাচ্ছে কেন ডার্লিং? অন্ধকারে চুপচাপ দাঁড়িয়ে কী ভাবছিলে?”
চাপা স্বরে হালদারমশাইয়ের ব্যাপারটা বললুম। নৌকোটার কথাও।
শুনে কর্নেল গম্ভীর হয়ে গেলেন। তারপর বললেন, “হালদারমশাইয়ের কাছে রিভলভার আছে। তুমি গুলির শব্দ শুনেছ কি?”
“নাহ।”
“অবশ্য এত দূর থেকে রিভলভারের শব্দ শোনা অসম্ভব। তবে তোমার বর্ণনা শুনে মনে হল, নৌকোতে ওঁর প্রতিপক্ষের লোক-টোকই ছিল। যদি ওঁর কোনো বিপদ না হয়ে থাকে, শিগগির আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।”
“উনি কি জানেন আপনিও এখানে এসেছেন?”
“উনি আমাকে আসতে বলেছেন। বনশোভা নার্সারিতে থাকতে বলেছেন।”
“তখন স্টেশন থেকে টেলিফোনে তা-ই বলছিলেন বুঝি?”
“হুঁ।“
কর্নেল চোখ বুজে দাড়ি টানছিলেন। বললুম, “এই বাগভদ্রলোককে আমার সুবিধের মনে হচ্ছে । আপনি লক্ষ করেছেন কি না জানি না, তখন গেটে ক্যাক্তির কথা বলামাত্র উনি যেন চমকে উঠলেন।”
“হুঁ।”
“একটু আগে সাপের ভয় দেখাচ্ছিলেন।”
“কী খালি হুঁ-হুঁ করছেন? খুলে আলোচনা করুন।”
কর্নেল সেই পাঁচুঠাকুরের মতো ঢুলুঢুলু চোখে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন, “আমি ছোটপুজোর কথা ভাবছি, জয়ন্ত! আগামীকাল প্রত্যূষে ছয় ঘঃ তেত্তিরিশ মিঃ চুয়াল্লিশ সেঃ মাহেন্দ্রযোগ।”
“আমি কিন্তু যাচ্ছি না।”
“ত্র্যম্বক দর্শনের পুণ্য মিস করা উচিত নয়, ডার্লিং! না, না–আমি মহাদেবের মাথার সাপের মণি-টনির কথা বলছি না। ত্র্যম্বক স্বয়ং মহাদেব।”
আমরা চাপাস্বরে কথা বলছিলুম। এই সময় একটা লোক ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকল। এই লোকটা আগেরবার কফি এনেছিল। কর্নেল বললেন, “এসো হরি! তোমার জন্য হা-পিত্যেশ করছিলুম!”
হরি ট্রে রেখে সেলাম ঠুকে বলল, “একটু দেরি হয়ে গেল স্যার! বাগসায়েবকে কর্তামশাই ডেকে পাঠিয়েছেন। জিপগাড়ি হাঁকিয়ে চলে গেলেন বাগসায়েব। গণেশড্রাইভারকে ডাকতে পাঠিয়েছিলেন। তা গণেশের এদিকে জ্বর। অগত্যা…”
“আচ্ছা হরি, এদিকের গেটের চাবি কার কাছে? একটু গঙ্গার ধারে ঘুরতে যেতুম।”
হরি জিভ কেটে বলল, “এঃ হে! একটু আগে বললে-গেটের চাবি বাগসায়েবের কাছে থাকে। তবে স্যার, আমার মতে, রাতবিরেতে না বেরনোই ভালো। অবস্থা আর আগের মতো নেই। লোকে সন্ধ্যার পর আর বাইরে বেরোচ্ছে না ইদানীং।”
“ভূতপ্রেতের ব্যাপার নাকি?”
হরি মুখে ভয়ের ছাপ ফুটিয়ে বলল, “আজ্ঞে তা-ই বটে! রাতবিরেতে জানলার বাইরে কে খোনাগলায় কী যেন বলে। আমিও শুনেছি।”
“বলো কী? কবে শুনেছ?”
“এই তো গত রাত্তিরে। ভয়ে কাউকে বলিনি।”
কর্নেল সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললেন, “কিন্তু কী বলে ভূতটা?”
হরি বলার আগে আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “লাফাং চু দ্রিদিম্বা?”
“তা-ই বটে, তা-ই বটে!” হরি আড়ষ্টভাবে হাসল। “তবে আমার মনে হয়, উনি বুড়িঠাকরুনের আত্মা। আজ্ঞে স্যার, অপঘাতে মরণ বলে কথা। খিড়কির দোর থেকে আর মাত্তর কয়েক-পা নামলেই মা গঙ্গা। জলে পড়লেই আত্মার উদ্ধার হত। কিন্তু বডি পড়েছিল দোরগোড়ায়।”
কর্নেল বললেন, “তুমি কার কথা বলছ হরি?”
“আজ্ঞে পাঁচুঠাকুরের গিন্নি ছিলেন তিনি। বেজায় দজ্জাল মেয়ে ছিলেন। কথায় বলে, স্বভাব যায় না মলে। মারা গিয়েও লোককে জ্বালাচ্ছেন।”
‘অপঘাতে মরণ বলছ কেন?”
হরি সতর্ক ভঙ্গিতে চাপা স্বরে বলল, “কাউকে যেন বলবেন না স্যার! ভেতর-ভেতর কথাটা সবাই জানে। পাঁচুঠাকুর নেশাভাং করেন। রোজ একভরি আফিং তার চাই। ঠাকরুনের গয়নাগাঁটি, সোনাদানা সব লুকিয়ে বেচে দিতেন। এই নিয়ে দু’জনকার ঝামেলা। শেষে নাকি দেবতার ধন পর্যন্ত বেচতে চেয়েছিলেন পাঁচুঠাকুর। বেগতিক দেখে ঠাকরুন রাতদুপুরে দেবতার ধন লুকিয়ে রাখতে যাচ্ছিলেন। পাঁচুঠাকুর ঘড়েল লোক। তক্কেতক্কে ছিলেন। যে-ই ঠাকরুন বেরিয়েছেন, অমনি পেছন থেকে গলা টিপে ধরে…”
হরি ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে থেমে গেল। কর্নেল বললেন, “কার কাছে শুনেছ এসব কথা?”
