প্রাইভেট ডিটেকটিভ নড়ে বসলেন, আপনার ছাতা? আপনিই বিজ্ঞাপন দিছিলেন পেপারে?
গোবর্ধনবাবু বললেন, আজ্ঞে হ্যাঁ। ওই ছাতা নিয়ে কী বিপদে পড়েছিলাম বলার নয়। কর্নেল বললেন, বলুন গোবর্ধনবাবু!
—আজ্ঞে, ছাতাটার আসল মালিকের খোঁজ পেয়ে গেছি। আমার এক ভাগনে ভবানীপুরে থাকে। সে আমাকে কথায়-কথায় কাল সন্ধ্যাবেলা—
—এক মিনিট! আপনি তা হলে কলকাতাতেই ছিলেন?
—থাকব না তো কোথায় যাব? আমার কি কোথাও যাওয়ার উপায় আছে?
—বেশ। আপনি ছাতা ফেরত নিতে এসেছেন তো?
—আজ্ঞে!
কর্নেল টেবিল থেকে ছাতাটা তুলে ওঁকে দিলেন। উনি ছাতাটা বগলদাবা করে উঠে দাঁড়ালেন। কর্নেল একটু হেসে বললেন, আপনার টনসিল সেরে গেছে দেখছি!
গোবর্ধনবাবু কেমন একটু হকচকিয়ে গেলেন। বললেন, আজ্ঞে তা–
—আপনার ছাতারও টনসিলের অসুখ ছিল গোবর্ধনবাবু! সারিয়ে দিয়েছি।
—ছাতার টনসিলের অসুখ। কী বলছেন কর্নেলসাহেব!
কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট ফেলে বললেন, আপনার টনসিলের অসুখ সেরেছে বটে, কিন্তু আপনি একটু রোগা হয়ে গেছেন।
গোবর্ধনবাবু হাসবার চেষ্টা করে বললেন, ভয়ে কর্নেলসাহেব! ভয়ে আর দুশ্চিন্তায়। আচ্ছা চলি।
—একটু কফি অন্তত খেয়ে যান!
—আরেকদিন এসে খাব। একটু তাড়া আছে।
-–আচ্ছা গোবর্ধনবাবু! আপনি কি রোজই কার্জন পার্কে বেড়াতে যান?
—যাই কর্নেলসাহেব। অফিস থেকে বেরিয়ে কার্জন পার্কে কিছুক্ষণ বসে থাকি।
—আপনি এত সকালে চুল হেঁটেছেন দেখছি! গোঁফটাও হেঁটেছেন! গোবর্ধনবাবু আবার একটু ভড়কে গেলেন। যাওয়ারই কথা। আমিও কর্নেলের প্রশ্নের মাথামুণ্ডু খুঁজে পাচ্ছি না। হালদারমশাই গুলি-গুলি চোখে তাকিয়ে আছেন। উত্তেজনায় তাঁর গোঁফ তরতর করে কাঁপছে। গোবর্ধনবাবু কাঁচুমাচু হেসে বললেন, আসার পথে ফুটপাতে হেঁটে নিলাম।
—আপনার বাড়ি টেলিফোন আছে। আপনি ফুটপাতে চুল আর গোঁফ ছাঁটলেন? এটা আপনাকে মানায় না। যাই হোক, কাল আপনি বাড়ি থেকে বেরুনোর সময় ঘরে তালা দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। তাই প্রাইভেট ডিটেকটিভ হালদারমশাই আপনার ঘরে ঢুকতে পেরেছিলেন। তাই না হালদারমশাই?
হালদারমশাই শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে শুধু বললেন, -হঃ!
সর্বনাশ! তা হলে তো এতক্ষণ আমার সব চুরি হয়ে গেছে।—বলে গোবর্ধনবাবু পা বাড়ালেন।
কর্নেল বললেন, না। আপনার ঘরের দরজায় একটা তালা আমরা কাল রাতে দেখে এসেছি। তাই না হালদারমশাই?
প্রাইভেট ডিটেকটিভ বললেন, হঃ! কোন ব্যাটা তালা আটকাইয়া দিছিল। তখন আমি ওনার ঘরে ভরা। ওঃ। সে কী মশা! ও বাড়িতে থাকেন কী কইরা বুঝি না।
কর্নেল বললেন, তাকামিও আকামা কোম্পানির ছাতাটা নিয়ে যাচ্ছেন, যান। কিন্তু মনে রাখবেন, ছাতাটার টনসিলের অসুখ আমি সারিয়ে দিয়েছি।
গোবর্ধনবাবু কেমন চোখে তাকিয়ে থাকার পর আবার ঘুরে দরজার দিকে পা বাড়ালেন।
কর্নেল এবার খুব গম্ভীর কণ্ঠস্বরে বলে উঠলেন, আপনাকে একটু বসতে হবে জনার্দনবাবু!
ঘরে যেন বিনামেঘে বাজ পড়ল। আমি ও হালদারমশাই পরস্পর তাকাতাকি করলাম। কর্নেল পকেট থেকে সেই ছোট্ট গোল ফিল্মরোলের মতো জিনস বের করে বললেন, জনার্দনবাবু! এই জিনিসটা আপনার কাছে পৌঁছুনোর কথা। এটাই ছাতার টনসিলের মধ্যে ছিল। কিন্তু আপনার দুর্ভাগ্য! আপনি কোনও কারণে সেদিন কার্জন পার্কে সময়মতো পৌঁছুতে পারেননি। এদিকে আপনার যমজভাই গোবর্ধনবাবু সেখানে নেহাত খেয়ালে গিয়ে পড়েছিলেন। তাই এই ছাতাটা তারই সামনে ফেলে রেখে চলে যায় আপনার স্মাগলিং গ্যাংয়ের কোনও কো… না-না। পালানোর চেষ্টা করবেন না।
হালদারমশাই ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছেন। একলাফে এগিয়ে গিয়ে জনার্দন সর্বাধিকারীকে ধরে ফেললেন, এই ব্যাটা আমারে ঘরে আটকাইয়া রাখছিল! এই সে ভূত। এই ভূতের জন্য—ওঃ! সে কী মশা!
কর্নেল বললেন, -জনার্দনবাবু! কাল রাতে আপনার ঘরে ঢুকে সব দেখেছি। আপনার নামও জানতে পেরেছি। খাটের তলায় বিদেশি ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম থেকে শুরু করে নানা দামি জিনিস ঠাসা আছে। আপনি আপনার যমজ ভাই গোবর্ধনবাবুর টেলিফোন ট্যাপ করে রেখেছিলেন, তা-ও দেখেছি। আমরা যাওয়ার পর বেগতিক বুঝে ওঁর টেলিফোনের তার ছিঁড়ে ফেলেছিলেন আপনি।
এই সময় ডোরবেল বাজল। কর্নেল হাঁকলেন, ষষ্ঠী!
একটু পরে আমার পরিচিত কাস্টমস অফিসার রথীন মৈত্র এবং তার দুজন অনুচর ঘরে ঢুকলেন। রথীন মৈত্র বললেন, ৩৩/১ নস্কর লেনের একটা ঘরে রেইড করে প্রচুর ড্রাগ ক্যাপসুল পেয়েছি কর্নেল সরকার! তো এই বুঝি সেই জনার্দন সর্বাধিকারী? একবার ভুল করে এঁর যমজ ভাইকে অকারণ হ্যারাস করেছিলাম আমরা। এই জনার্দনরা ড্রাগ পাচার করে এনে দেশটার সর্বনাশ করছে।
কর্নেল সেই ফিল্মরোলের মতো জিনিসটা ওঁর হাতে দিয়ে বললেন, —এতেও নিষিদ্ধ ড্রাগ ভরা আছে। আপনারা পরীক্ষা করলে বলতে পারবেন, এর কত দাম। আর জনার্দনবাবুর ছাতাটাও নিয়ে যান।
রথীন মৈত্র জনার্দনবাবুকে ছাতাসহ পাকড়াও করে নিয়ে গেলেন। হালদারমশাই একটিপ নস্যি নিয়ে বললেন, কী কাণ্ড! যমজ ভাই, তা বুঝলেন ক্যামনে কর্নেলসার?
কর্নেল বললেন, গতরাতে যখন জনার্দনবাবুর ঘরে ঢুকি, তখন কিছু বুঝতে পারিনি। জনার্দন সর্বাধিকারীর বিজনেস কার্ড ওই ঘরে দেখতে পেলেও ওঁকে তো তখনও চর্মচক্ষে দেখিনি! এদিকে গোবর্ধনবাবুও বলেননি তার কথা। হাজার হলেও সহোদর ভাই। তাই আমার কাছে কথাটা গোপন রাখা স্বাভাবিক। তবে হ্যাঁ—এটা সুস্পষ্ট যে, উনি টের পেয়েছিলেন ভূতের উৎপাত কে বাধিয়েছে। আসলে উনি ভাইটিকে বাঁচানোর জন্যই শেষ পর্যন্ত ছাতাটা আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু আজ সকালে যখন ওঁর ফোন এল, তখন প্রথমে একটু খটকা লাগল। কণ্ঠস্বর কতকটা এক হলেও টনসিলের রোগীর মতো নয়। তারপর কিছুক্ষণ আগে যখন ষষ্ঠী এসে বলল, কালকের সেই ভদ্রলোক এসে দাঁড়িয়ে আছেন, তখন খটকাটা বেড়ে গেল। গোবর্ধনবাবুর তো সোজা এ ঘরে ঢুকে পড়া উচিত ছিল। তারপর আমার প্রশ্নগুলো স্মরণ করুন। চুলের ছাঁট, গোঁফ, একটু রোগাটে গড়ন এবং আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর থেকে স্পষ্ট বুঝলাম, ইনি কখনই গোবর্ধনবাবু নন। এঁকে যমজভাই বলে সাব্যস্ত করতেই হল।
