-গোবরা কবরখানা কিন্তু বাড়িটার কাছাকাছি হালদারমশাই!
আমিও না বলে পারলাম না, কর্নেল! আমরা গিয়েও কিন্তু ভূতুড়ে উৎপাত দেখেছি। ঢিল পড়ছিল। ছাদের ওপর কী একটা অদ্ভুত শব্দ শুনেছি। সে-কথা হালদারমশাইকে বলা উচিত।
হালদারমশাই উত্তেজিতভাবে বললেন, হেভি মিস্ত্রি! তবে আমার নামও কে.কে. হালদার। ভূতের বাপের শ্রাদ্ধ যদি করতে না পারি, আমার কান কাইট্টা কুত্তার গলায় লটকাইয়া দিমু।
বলেই উনি সবেগে বেরিয়ে গেলেন। বরাবর দেখে আসছি, প্রচণ্ড উত্তেজনায় ওঁর মুখে দেশোয়ালি ভাষা বেরিয়ে যায়। আমি হেসে ফেললাম, কর্নেল! হালদারমশাই আবার ওবাড়িতে হানা দিতে গেলেন না তো?
কর্নেল সে-কথায় কান না দিয়ে বললেন, তুমি কী বুঝলে বলো জয়ন্ত?
বললাম, অনেক আগেই বুঝে গেছি।
-বাহ্। বলো শুনি!
—পুকুর বুজিয়ে যে-প্রোমোটার ওখানে বাড়ি তুলছে, এটা তারই চক্রান্ত। ভূতের উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে গোবর্ধনবাবু বাড়ি বেচে অন্য কোথাও চলে যেতে চাইবেন এবং প্রোমোটার ওঁর বাড়িটা কিনে নিয়ে বহুতল বাড়ি তুলবে।
—কিন্তু তাকামিও আকামা কোম্পনির তৈরি ছাতার সঙ্গে এর কী সম্পর্ক?
—হঠাৎ ভূতের উৎপাতের সঙ্গে ওই কালো ছাতাটা তো জড়িয়েই গেছে। গোবর্ধনবাবু ওটা কুড়িয়ে পাওয়ার পর থেকে ভূতের উৎপাত শুরু হয়েছে। পোমোটারের লোক কার্জন পার্কে গোবর্ধনবাবুর চোখে পড়া জায়গায় ছাতাটা ফেলে রেখেছিল।
-হুঁ। গোবর্ধনবাবু কার্জন পার্কে ঘাসের ওপর বসেছিলেন। হঠাৎ পাশেই ওই ছাতাটা পড়ে থাকতে দেখেছিলেন বটে!
ঘড়ি দেখে বললাম, আমি উঠি। এগারোটা বাজতে চলল।
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, এত রাতে সল্টলেকে একা ফিরবে! ইস্টন বাইপাসে তোমার গাড়ির ভেতর ভূত ঢুকে গেলেই বিপদ। নস্কর লেন থেকে বাইপাস বেশি দূরে নয়। হা—এমনও হতে পারে, নস্কর লেন থেকে আমাদের ফলো করে এস, ভূত তোমার গাড়ির তলায় ঘাপটি পেতে বসে আছে।
—ভূত-টুত বোগাস!
—টুত আরও সাংঘাতিক, ডার্লিং! কাজেই আমার বাড়িতেই রাতটা কাটিয়ে যাও। ষষ্ঠী! আমরা এবার খেতে যাচ্ছি।
কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে রাত কাটানো নতুন কিছু নয়। তবে আমি বিছানা থেকে দেরি করে উঠি। এদিন ঘুম ভাঙল পৌনে আটটায়। তা-ও ষষ্ঠী না ডাকলে আরও কিছুক্ষণ বিছানায় পড়ে থাকতাম।
আটটা নাগাদ ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই কর্নেলের সম্ভাষণ শুনলাম, মর্নিং জয়ন্ত! আশাকরি সুনিদ্রা হয়েছে।
—মর্নিং! আপনার দেখছি সত্যিই পেছনে একটা চোখ আছে!
প্রাজ্ঞ রহস্যভেদী একটা আলমারির কাচের দিকে তর্জনি তুলে বললেন, —ওখানে তোমার প্রতিবিম্ব পড়েছিল। ডার্লিং! সবসময় সচেতন থাকলে অনেককিছু জানা এবং দেখা হয়ে যায়। তো বসো! হালদারমশাইকে টেলিফোন করে আসতে বলেছি। না, উনি গতরাতে আর নস্কর লেনে ওত পাততে যাননি। আজ রাতে যেতেন। আমি বললাম, আর ওখানে যাওয়ার দরকার হবে না। বরং এখানে চলে আসুন।
—কী ব্যাপার?
—সাতটায় ছাদের বাগানে ছিলাম। তখন ষষ্ঠী গিয়ে খবর দিল, গোবর্ধনবাবু নামে এক ভদ্রলোক টেলিফোন করেছেন। জরুরি দরকার। অগত্যা নেমে এসে কথা বলতে হল। গোবর্ধনবাবু আমার সঙ্গে দেখা করতে চান। জরুরি দরকার আছে।
—কিন্তু আপনি তো ওঁকে গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে বলেছেন!
—বলেছি। অথচ উনি দেখা করতে চান। তাই ওঁকে নটার মধ্যেই আসতে বলেছি। ষষ্ঠী ট্রেতে কফি-দুধ-চিনি-পেয়ালা আর স্ন্যাক্স রেখে গেল। কর্নেল কফি শেষ করে চুরুট ধরালেন। তারপর হঠাৎ উঠে ভেতরে চলে গেলেন। সেই কালো ছাতাটা নিয়ে ফিরে এলেন। ছাতাটা টেবিলে রেখে কর্নেল বললেন, তাকামিও আকামা কোম্পানির এই ছাতাটার গলায় টনসিলের অসুখ ছিল। কাল দুপুরে অসুখটা সারিয়ে দিয়েছি।
-ওঃ কর্নেল! আবার হেঁয়ালি করছেন।
-হেঁয়ালি? মোটেও না। ছাতাটার গলায় প্রায় এক ইঞ্চি ব্যাস এবং তিন ইঞ্চি লম্বা গোল শক্ত জিনিস আটকে ছিল। ছাতার মাথার টুপি খুলে সেটা বের করে ফেলেছি। ছাতাটা এখন সুস্থ।
—জিনিসটা কী?
—জানি না। যথাস্থানে পরীক্ষা করাতে হবে। তবে এখন ওসব কথা নয়।
মুখটি বুজে থাকো।
বলেই কর্নেল সোজা হয়ে বসলেন।
দোতলায় লিন্ডাদের কুকুরটা চঁচামেচি করছে। হালদারমশাই আসছেন। কেন জানি না, কুকুরটা ডিটেকটিভ ভদ্রলোককে সহ্য করতে পারে না।-ষষ্ঠী! দরজা খুলে দে।
তখনই ডোরবেল বাজল। এবং একটু পরে হালদারমশাই সবেগে ঘরে ঢুকে সোফায় বসে বললেন, মিস্ত্রি স হইল ক্যামনে?
কর্নেল বললেন, কফি খান। নার্ভ চাঙ্গা করুন। খবরের কাগজ পড়ুন। তারপর সে-সব কথা হবে।
ষষ্ঠী হালদারমশাইয়ের জন্য বেশি দুধ-মেশানো স্পেশাল কফি নিয়ে এল। উনি গম্ভীর মুখে কফিতে চুমুক দিয়ে খবরের কাগজ টেনে নিলেন। অন্যদিনের মতো একটা খাইছে শোনার জন্য উদগ্রীব ছিলাম। কিন্তু উনি আমাকে নিরাশ করলেন।
কিছুক্ষণ পরে আবার ডোরবেল বাজল। ষষ্ঠী দেখে এসে বলল—কালকের সেই ভদ্রলোক এসেছেন।
কর্নেল ধমক দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, ওঁকে নিয়ে আয় হতভাগা। এরপর আস্তে পর্দা তুলে গোবর্ধন সর্বাধিকারী ঘরে ঢুকে বিনীতভাবে নমস্কার করে বললেন, কর্নেলসাহেবকে বিরক্ত করার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু–
কর্নেল বললেন, আপনি বসুন।
গোবর্ধনবাবু বসলেন। তারপর আমাকে এবং হালদারমশাইকে একবার দেখে নিলেন। হালদারমশাই তাঁকে দেখছিলেন। কর্নেল বললেন, আলাপ করিয়ে দিই! উনি হালদার প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সির মিঃ কে কে হালদার। হালদারমশাই! ইনিই মিঃ গোবর্ধন সর্বাধিকারী।
