যমজদের বিষয়ে আমি কিছু পড়াশুনা করেছি। দেখতে একইরকম হলেও যমজদের মধ্যে আচরণগত কিছু তফাত থাকে। দুজনের আঙুলের ছাপও আলাদা। তার চেয়ে বড় কথা, কাল গোবর্ধনবাবুর সঙ্গে আমার কী কথা হয়েছিল ইনি তা জানেন না।
হালদারমশাই খি খি করে হেসে উঠলেন। আমি বললাম, এ তা হলে সুকুমার রায়ের সেই গোঁফচুরি পদ্যটার ব্যাপারই হয়ে দাঁড়াল। ছাতার আমি, ছাতার তুমি, ছাতা দিয়ে যায় চেনা! কিন্তু গোবর্ধনবাবুকে আপনি গা-ঢাকা দিতে বলেছিলেন কেন?
কর্নেল হাঁকলেন, ষষ্ঠী! আরেক রাউন্ড কফি!
তারপর বললেন, আমার সন্দেহ হয়েছিল, ছাতার মধ্যে এমন কিছু লুকোনো আছে, যার জন্য গোবর্ধনবাবু আরও সাংঘাতিক বিপদে পড়তে পারেন।
১.০৮ অকালকুষ্মাণ্ড
স্টেশন তখনও অন্তত আধকিলোমিটার দূরে, ট্যাক্সিটা বিগড়ে গেল। ট্রেনের সময় হয়ে এসেছে। ট্যাক্সির সামনে ও পিছনে গাদাগাদি করে প্রায় এক ডজন যাত্রী ঠাসা ছিল। এ-মুলুকে নাকি এটাই রেওয়াজ। তবে শীতের দাপটে অবস্থাটা খুব একটা অসহনীয় মনে হচ্ছিল না। তো ট্যাক্সিওয়ালা দশ কিলোমিটার পথ আসতে ইতিমধ্যে তিনবার ভাড়া বাড়িয়েছে। এবার এই কলকজা বিগড়ে যাওয়ার ব্যাপারটাকে চতুর্থ দফা ভাড়া বাড়ানোর ফন্দি ভেবেই আমরা যাত্রীরা ঝটপট নেমে এলুম। এবং যাঁদের ঠ্যাংগুলো লম্বা তাঁরা সবার আগে দেখতে-দেখতে উধাও হয়ে গেলেন।
একটু পরে দেখি, আমি আর ট্যাক্সিওয়ালা ছাড়া আর জনপ্রাণীটি নেই। ট্যাক্সিওয়ালার মুখের দিকে তাকিয়ে কোনও ফন্দিফিকির বা ধূর্তামির চিহ্ন খুঁজে পাচ্ছিলাম না। লোকটা করুণ মুখে এঞ্জিনের কলকজার দিকে তাকিয়ে আছে। বললুম, কী দাদা, কী বুঝছেন?
লোকটা হতাশভাবে মাথা নেড়ে বল, নেহি সাব। আপ পায়দল চলা যাইয়ে।
হুঁ, ভেবেছে আমি ওর হাড়জিরজিরে গাড়িটার মূৰ্ছাভাঙার অপেক্ষায় আছি। আসলে এতক্ষণ ঠাসাঠাসিতে আমার শরীর আগাগোড়া ঝিম মেরে গেছে। পা দুটোতে কোনও সাড় নেই। তাই সেই ঝিমুনি কাটিয়ে নিচ্ছি। এবং সেটা ওকে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্যেই রাস্তার উপরে পা দুটো ঘোড়ার মতো ঠুকতে-ঠুকতে কয়েক পা এগিয়ে গেলুম। কাছেই একটা ব্রিজ রয়েছে। নদীটা বেশ চওড়া। তবে আদ্ধেকের বেশি বালিতে ভরা, বাকিটায় কালো জল। স্রোত বইছে বলে মনে হচ্ছিল না।
বিকেল হয়ে গেছে। শীতের দিন ঝটপট ফুরিয়ে যায়। হিসেব করে দেখলুম, ট্রেনের এখনও মিনিট কুড়ি দেরি। স্বাভাবিক গতিতে হেঁটে গেলেও ট্রেন ধরা যাবে। সঙ্গে একটা কিটব্যাগ ছাড়া কোনও বোঝা নেই। তাছাড়া জায়গাটা কেন যেন খুব ভাল লাগছিল। একধারে ছোটবড় পাহাড়। তার উপত্যকা শীতের শস্যে সবুজ হয়ে আছে। অন্যধারেও পাহাড় আছে। আর আছে ঝোপঝাড় আর মাঝে-মাঝে ঘন জঙ্গল। সামনে ওই স্টেশনের কাছে যা একটা বসতি—তাছাড়া কাছাকাছি কোনও বসতির চিহ্ন চোখে পড়ছিল না। মনে হল, জায়গাটা ভ্রমণবিলাসীদের পক্ষে মোটামুটি পছন্দসই।
হঠাৎ আমার চোখ গেল ডাইনে নদীর পাড়ে জঙ্গলের দিকটায়। ঝোপের মধ্যে কী একটা বসে আছে যেন। বাঘ-ভালুক নাকি? বলা যায় না, এই জঙ্গলে জনহীন জায়গায় বিশেষ করে শীতকালে জন্তু-জানোয়ার বেরিয়ে পড়তেও পারে।
ধূসর রঙের প্রাণীটি আমার দিকে পিঠ রেখে ওত পেতে আছে। একবার ভাবছি, ট্যাক্সিওয়ালাকে ডেকে সাবধান করে দিই। আবার ভাবছি, আমার ডাকাডাকি শুনে যদি দাঁত-নখ বাগিয়ে তেড়ে আসে! অবশ্য রাস্তাটা যথেষ্ট উঁচু এবং আন্দাজ দেড়শো মিটার দূরত্বে রয়েছে ওটা।
কিন্তু আমাকে হকচকিয়ে দিয়ে ওটা উঠে দাঁড়াল এবং তক্ষুনি বুঝলুম, চোখের ভুল হয়েছে। ওটা ধূসর রঙের কোট-প্যান্ট পরা একজন মানুষই বটে। হাতে কী একটা রয়েছে। গা ছমছম করে উঠল এবার অন্যরকম ভয়ে। হাতে কি ওটা পিস্তল? কাউকে খুন করার জন্যে ওত পেতে আছে। লোকটা? কিন্তু কোটপ্যান্ট এবং দস্তুরমতো সায়েবি টুপিপরা কোনও লোক কাউকে খুন করার জন্যে ওভাবে ওত পেতেছে, এটা কিছুতেই যুক্তিসঙ্গত মনে হল না।
অথচ ওর গতিবিধি সন্দেহজনক। সন্দেহ আরও বাড়ল, যখন দেখলুম, লোকটা হাতের কালোরঙের জিনিসটা তুলে গুলি ছোড়ার ভঙ্গিতে একটু কুঁজো হল এবং ওইভাবে পা টিপে টিপে ঝোপঝাড় ভেঙে এগুতে থাকল।
তারপর দেখি, সে দৌড়তে শুরু করেছে। গুরুতর দুর্ঘটনার আশঙ্কায় আমার বুক ঢিপঢিপ করছে এবার। প্রতি মুহূর্তে আশঙ্কা করছি, গুলির শব্দ আর মানুষের আর্তনাদ শুনব। ওর হাতের জিনিসটা যদি বন্দুক হত, তাহলে তো শিকারিই ভাবতুম। পিস্তল দিয়ে কি কেউ পাখি বা জন্তুজানোয়ার শিকার করে?
দৌড়ে সে যেখানে ঢুকলে, সেখানে কিছু উঁচু-উঁচু গাছ রয়েছে। ছায়ায় অস্পষ্টভাবে তাকে দেখতে পাচ্ছি। তারপর সে অন্তত একমিনিটের জন্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। ট্যাক্সিওয়ালা ব্যাপারটা দেখেছে নাকি জানার জন্যে ওদিকে ঘুরলুম। না, ও এখনও এঞ্জিনের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে।
আবার যখন সেই লোকটাকে দেখতে পেলুম, তখন সে নদীর পাড়ে হাঁটু দুমড়ে বসেছে এবং পিস্তল তাক করে রেখেছে। আর চুপ করে থাকতে পারলুম না। দৌড়ে গিয়ে ট্যাক্সিওয়ালাকে ব্যাপারটা দ্রুত জানিয়ে দিলুম। দু-দুজন মানুষ এখানে থাকতে একটা খুনখারাপি হবে। যে ট্যাক্সিওয়ালা তিন-তিনবার যাত্রীদের চাপ দিয়ে ভাড়া বাড়িয়েছে, তার বিবেকও এবার নড়ে উঠল। এইসা? বলে সে তার ট্যাক্সি থেকে একটা লোহার রড বের করল। তারপর চোখ কটমট করে আমাকে ডাক দিল। আমারও একটা কিছু হাতে নেওয়া দরকার। অগত্যা ওর এঞ্জিনের মধ্যে রাখা একটা রেঞ্জ তুলে নিয়েই রওনা দিলুম। উত্তেজনায় মাথার ঠিক নেই।
