“বয়ে গেল!” ঠাকুরমশাই বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল দেখালেন। “গত সপ্তায় পাখি উড়িয়ে দিয়েছি। এ-সপ্তায় খাঁচা উড়িয়ে দিলুম। পাখি ফিরে এসে থাকবে কোথায়?” টেনে-টেনে হাসতে লাগলেন পঞ্চানন আচার্য।
“আপনার নাতি চলে গেল কবে?”
“আজ রোববার। বেতবার ইস্কুল থেকে বিকেলে এসে বইখাতা রেখে চলে গেল।”
“বলে যায়নি কোথায় যাচ্ছে?”
“বলল, কেতো ওর পাখি দেখতে পেয়েছে। ধরতে যাচ্ছে।”
“কেতে কে?”
“আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট। এক কোপে একশো পাঁঠা কাটে মশাই! বড়পুজো দিলে দেখতেন!”
রিকশাওয়ালাকে দেখা গেল ফটকের বাইরে। মুখে তিতিবিরক্ত ভাব। ডাকল, “বড্ড লেট হয়ে গেল স্যার! এমন করলে চলে? এতক্ষণ ফিরে গিয়ে আরও কয়েক খেপ পেসেঞ্জার টানতুম ইস্টিশনে।”
ঠাকুরমশাইয়ের কাছে বিদায় নিয়ে আমরা গিয়ে রিকশায় উঠলুম। রিকশাওয়ালা গজগজ করতে থাকল। “পাঁচুঠাকুরের পাল্লায় পড়তে আছে? সবসময় ভাং-এর নেশায় চুর হয়ে থাকেন। কিন্তু পুজো দিতে চাইলেই টনটনে হুশ। শুনেছি, রায়রাজাদের যখের ধন আগলাচ্ছেন সাতপুরুষ ধরে। তবু টাকার লোভ গেল না!”
কর্নেল বললেন, “বলো কী! যখের ধন?”
রিকশাওয়ালা প্যাডেলে পায়ের চাপ দিয়ে বলল, “আজ্ঞে স্যার, আপনারা শিক্ষিত লোক। আপনাদের কি অজানা আছে? শিবঠাকুরের মাথায় থাকেন সাপ। সেই সাপের মাথায় আছে এক মণি। সাতরাজার ধন কি না বলুন স্যার?”
“এই মন্দিরের শিবের মাথায় তো সাপ দেখলুম না হে! ন্যাড়া শিবলিঙ্গ আছে বটে। সাপ তো নেই।”
রিকশাওয়ালা দার্শনিকের ভঙ্গিতে বলল, “আছে। ছিল। কে দেখা পায়, কে পায় না। আর মণির কথা যদি বলেন, তা-ও আছে। ছিল। যে জানার সে ঠিকই জানে।”
“কে সে?”
“পাঁচুঠাকুর। আবার কে!”
ডাইনে গঙ্গা দেখা গেল এতক্ষণে। সামনে কিছুটা দূর বনশোভা নার্সারির গেট। দেওয়ালের ওপর কাঁটাতারের বেড়া। রিকশাওয়ালা রায়রাজাদের গল্প শোনাচ্ছিল। এসব গল্পের কাঠামো দেখেছি একইরকম। ধার্মিক রাজার সামনে সশরীরে দেবতার আবির্ভাব, পুজোর নির্দেশ, বর দান এবং একটি মন্দির নির্মাণ। এই গল্পে দেবতা নিজের মাথার সাপের মণিটিও দান করেছিলেন রায়রাজাকে।
ফিসফিস করে কর্নেলকে বললুম, “এ্যম্বক!”
কর্নেল চোখ কটমটিয়ে তাকালেন শুধু।
নার্সারির গেটে আমরা রিকশা থেকে নামতেই কে ভেতর থেকে চেঁচিয়ে উঠল, “হ্যালো, কর্নেল সরকার!”
কালো তাগড়াই চেহারা, থুতনিতে দাড়ি, পরনে লাল শার্ট, জিনস আর পায়ে গামবুট, পিঠে সম্ভবত কীটনাশকের খুদে ট্যাঙ্ক বাঁধা, হাতে স্প্রের নল। এক ভদ্রলোক ফুলের ঝোঁপ থেকে বেরিয়ে আসছিলেন। কর্নেল তাকে সম্ভাষণ করে বললেন, “হ্যালো মিঃ বাগ! কেমন আছেন? আপনার কর্তাবাবু কোথায়?”
মিঃ বাগ মুচকি হেসে বললেন, “সাধুদা ভূতের ভয়ে বাড়ি থেকে নার্সারিতে আসছেন না। কাগজে খবর পড়েননি? আজই তত বেরিয়েছে। এনি ওয়ে, ওয়েলকাম! মালিক নেই তো কী হয়েছে? নোকর আপনার সেবার জন্য হাজির।”
কর্নেল বললেন, “আমার কয়েকটা একিনোক্যাকটাস গ্রুসিনিয়ে চাই। রায়সায়েবের বাগানে দেখে দৌড়ে এসেছি।”
মিঃ বাগকে হঠাৎ যেন চমকে উঠতে দেখলুম। নাকি আমার চোখের ভুল? তখনই অবশ্য সহাস্যে বললেন, “আসুন। আসুন। সে হবে ‘খন। আপনাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে। বিশ্রাম করুন।…”
.
তিন
নার্সারির একটেরে গঙ্গার ধারে বাংলোধাঁচের সুন্দর একটা বাড়ি। ম্যানেজার অরিন্দম বাগ একা থাকেন সেখানে। ভদ্রলোক একজন হর্টিকালচার-বিশেষজ্ঞ। রায়সায়েবের সুপারিশে সাধুবাবু ওঁকে বছর দেড়েক আগে বহাল করেছেন। সাধুবাবু তাই এখন রাতে রায়গড়ের বাড়িতে গিয়ে থাকেন। আগে এই বাংলোতেই থাকতেন। মান্যগণ্য অতিথি এলে তাদের এখানে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। নার্সারির বেশির ভাগ কর্মী স্থানীয় লোক। তারা সন্ধ্যায় বাড়ি চলে যান। জনাতিনেক থাকেন উলটো দিকের একতলা সারবন্দি ঘরগুলোতে। সেখানেই নার্সারির অফিস আছে। গেটের কাছাকাছি ট্রাক
ও টেম্পোর গ্যারাজ আছে। রাতের পাহারার জন্য বন্দুকধারী গার্ডও আছে জনা দুই।
কফি খেতে-খেতে কর্নেল এবং মিঃ বাগ ক্যাক্টি নিয়ে দুর্বোধ্য আলোচনা চালিয়ে গেলেন। তারপর আমার কথা বেমালুম ভুলে দু’জনে বেরিয়ে গেলেন। সম্ভবত ক্যাক্টি পরিদর্শনে।
বেলা পড়ে এসেছে। জানলা দিয়ে গঙ্গাদর্শনেই মন দিলুম অগত্যা। এইসময় চোখে পড়ল, কর্নেলের বাইনোকুলারটা টেবিলে পড়ে আছে। তুলে নিয়ে চোখে রাখলুম। লেন্স অ্যাডজাস্ট করার পর গঙ্গার ওপার-এপার চমৎকার খুঁটিয়ে দেখা যাচ্ছিল। হঠাৎ চোখে পড়ল, শিবমন্দিরের দিকে একটা প্রকাণ্ড বটের গাছ এবং সেটাই হয়তো সেই শ্মশানঘাট, তার তলা থেকে বেরিয়ে এলেন স্বয়ং প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে. কে. হালদার।
গঙ্গার ধারে নিচু বাঁধে ঘন ঝোঁপঝাড়। সেখানে ঢুকে ঘাপটি পেতে বসে পড়লেন।
মিনিট পাঁচেক পরে একটা ডিঙি নৌকো এসে শ্মশানবটের কাছে ভিড়ল। ঝোঁপের আড়াল পড়ায় কিছু দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু হালদারমশাইকে গুঁড়ি মেরে এগোতে দেখলুম সেদিকে।
একটা কিছু ঘটতে চলেছে নিশ্চয়। হালদারমশাই অদৃশ্য হয়ে গেলে বাইনোকুলার নিয়ে পুবের দরজা খুলে বের হলুম। কিন্তু নিরাশ হতে হল। এদিকের গেটে তালা আঁটা আছে। বেরনো যাবে না। সবুজ রঙের লোহার কপাট অন্তত ফুট ছয়েক উঁচু। তার মাথায় গ্রিল এবং গ্রিলের ওপর কাঁটাতার। নার্সারি না দুর্গ?
