কর্নেল বাইনোকুলার তুলে পাখি দেখার চেষ্টা করছিলেন। বললেন, “একটা নিষেধাজ্ঞা রইল জয়ন্ত, তুমি সবসময় মুখটি বুজে থাকবে–বিশেষ করে যখন আমি কারও সঙ্গে কথা বলব।”
অভিমান চেপে বললুম, “ও কে বস!”
কর্নেল হাসলেন। “না, না। অন্যান্য কথা বলবে। শুধু এই ঘটনাসংক্রান্ত কোনো কথা বাদে। তবে যখন তুমি-আমি একা থাকব, তখন যথেচ্ছ কথা বলার বাধা নেই।”
ফটক দিয়ে ঢুকে একটা চত্বর দেখা গেল। এখানে-ওখানে দেশি ফুল-ফলের গাছ। সামনে প্রকাণ্ড শিবমন্দির। ধাপ বেয়ে উঠতে হয়। ডাইনে একতলা কয়েকটা ঘর। ঘরগুলোর দরজা-জানলা বন্ধ। জুতো খুলে আমরা মন্দিরের দরজায় উঠে গেলুম। ভেতরটা আবছা অন্ধকার। কর্নেল জ্যাকেটের পকেট থেকে ছোট্ট টর্চ বের করে জ্বাললেন। সেই আলোয় একটি কালো পাথরের শিবলিঙ্গ দেখা গেল। সিঁদুরের ছোপ পড়েছে আগাগোড়া। কিছু মিইয়ে যাওয়া ফুল আর বেলপাতা পড়ে আছে। হঠাৎ কর্নেল টর্চ নিভিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “প্রণাম করো ডার্লিং! ঝটপট প্রণাম!”
উনি হাঁটু মুড়ে বসে মাথা ঠেকালে আমি অবাক হয়েছিলুম। কারণ এ যাবৎ আমার বৃদ্ধ বন্ধুকে কোথাও এমন ভক্তি প্রদর্শন করতে দেখিনি। ওঁর দেখাদেখি আমাকেও মাথা ঠেকাতে হল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ঘুরে দেখি, নীচের চত্বরে এক প্রৌঢ় দাঁড়িয়ে আছেন। লম্বাটে গড়ন। পরনে খাটো করে পরা ধুতি আর হাফ ফতুয়া। কপালে লাল তিলক। গলায় রুদ্রাক্ষমালা। খালি পা।
কর্নেল বিনীতভাবে বললেন, “আমার আন্তরিক ইচ্ছে, পুজো দিই। তা আপনিই কি এই মন্দিরের পুরোহিত?”।
“আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি!”
“বনশোভা নার্সারিতে অথবা লাহাবাবুর বাড়িতে…”
“উঁহু। গঙ্গার ধারে। আপনার গলায় সেই যন্তরটাও ঝুলছে দেখছি। কী দ্যাখেন ওই দিয়ে?”
“পাখি-টাখি দেখি। পাখি দেখতে আমার ভালো লাগে ঠাকুরমশাই!” ।
এর ঠাকুরমশাই তা হলে সেই পঞ্চানন আচার্য। মুচকি হেসে বললেন, “আমার নাতি বিশেটারও ওই নেশা। বুঝলেন? একটা টিয়াপাখি পুষেছিল। রাগ করে খাঁচা খুলে উড়িয়ে দিয়েছি। তাতে হতভাগার এমন রাগ যে না-খাওয়া না-দাওয়া, কোথায় উধাও। যা না যেখানে যাবি। কদিন কে খেতে দেয় দেখব’খন। আবার এই শর্মার পায়ের তলায় এসে হুমড়ি খেয়ে পড়তেই হবে।”
কর্নেল এবং তার পিছনে আমি সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলুম চত্বরে। কর্নেল বললেন, “আপনার নাতির বয়স কত? কোন ক্লাসে পড়ে?”
ঠাকুরমশাই বললেন, “বারো-তেরো হবে। ক্লাস সিক্সে গাড়া খেয়ে পড়ে আছে। আর বলবেন না মশাই! বিশু নয়, বিচ্ছু। বুঝলেন? কী বুঝলেন?”
“বিচ্ছু।”
ঠাকুরমশাইয়ের চোখ দুটি কেমন ঢুলুঢুলু এবং মুখে অমায়িক ভাব। চোখ নাচিয়ে হেসে বললেন, “মশাইদের কি কলকাতা থেকে আসা হচ্ছে?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ।” কর্নেল এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে বললেন, “ছোট ছেলের এই নিরিবিলি জায়গায় একা থাকতে ভালো লাগবে কেন? তাই হয়তো মাঝে-মাঝে কোনো আত্মীয়স্বজনের বাড়ি চলে যায়। আপনি খোঁজ নিচ্ছেন না কেন?”
পঞ্চানন আচার্য এবার একটু বিরক্ত হলেন। “ধুর মশাই! আত্মীয়স্বজন বলতে ওর কেউ কোথাও আছে নাকি? রায়গড়েই কারও বাড়ি গিয়ে থাকে। এবারও তা-ই আছে।”
“তা আপনি ওর পাখি খুলে দিলেন কেন?”
“অত কৈফিয়ত দিতে পারব না মশাই!”
কর্নেল পকেট থেকে পার্স বের করে বললেন, “আগামীকাল পুজো দেব। জিনিসপত্র কেনাকাটার জন্য কত অ্যাডভান্স লাগবে বলুন। আমি লাহাবাবুর নার্সারিতে আছি।”
ঠাকুরমশাই পার্সের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ছোট, না মাঝারি, না বড়পুজো?”
“আজ্ঞে?”
“ছোটপুজোর রেট পঞ্চাশ। মাঝারি পাঁচশো। বড় সাড়ে সাতশো।”
“এত তফাত কেন?”
ঠাকুরমশাই হাসলেন। “ছোটতে নিরিমিষ। মাঝারিতে কেজি দশেক, বড়তে কেজি পনেরো থেকে বিশ। পাঁঠার যা দাম বেড়েছে, আর বলবেন না মশাই! ওই তো হাড়িকাঠ দেখতে পাচ্ছেন। অবস্থা দেখুন না ঘুণ ধরে নড়বড় করছে। মাঝারি বা বড়পুজো হলে কেতোকে খবর দিতে হবে। তাকেও মজুরি দিতে হবে।”
কর্নেল পার্স থেকে দুটো দশ টাকার নোট ঠাকুরমশাইয়ের পায়ের কাছে রেখে বললেন, “ছোটই দেব। রক্তক্ত আমার ধাতে সয় না। এই রইল অ্যাডভান্স।”
ঠাকুরমশাই নোট দুটো দেখতে দেখতে বললেন, “আর-একটা চাই। পুজোসামগ্রীর বেজায় দর।”
কর্নেল আর-একটা দশ টাকার নোট রাখলেন। তারপর বললেন, “কখন আসব বলুন?”
“দাঁড়ান। পাঁজি দেখে আসি।”
টাকা তুলে নিয়ে কেমন যেন ঘোরের মধ্যে হেঁটে গেলেন ঠাকুরমশাই। একতলা একটা ঘরের দরজায় তালা ঝুলছে। ফতুয়ার পকেট থেকে চাবি বের করে তালা খুললেন। ভেতরে ঢুকে গেলেন।
চাপাস্বরে বললুম, “সত্যিই কি পুজো দেবেন নাকি?”
কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন, “মাঝে-মাঝে একটু ধর্মকর্ম করলে মনে শান্তি আসে ডার্লিং!”
ঠাকুরমশাই বেরিয়ে আসছিলেন। এবার চোখে চশমা। হাতে পাঁজি। বারান্দা থেকে নামার সময় একটা শূন্য পাখির খাঁচায় মাথার টোক্কর লাগল। অমনি ‘হ্যাত্তেরি’ বলে খাঁচাটা হ্যাঁচকা টানে খুলে ছুঁড়ে ফেললেন।
তারপর পাঁজির পাতা ওলটাতে-ওলটাতে এগিয়ে এলেন। “হা! কালবেলা গতে ছয় ঘঃ তেত্তিরিশ মিঃ চুয়াল্লিশ সেঃ মাহেন্দ্রযোগ-আপনারা সূর্য ওঠার আগেই চলে আসুন।”
কর্নেল করজোড়ে প্রণাম করে পা বাড়িয়ে বললেন, “আচ্ছা, আপনি যে খাঁচাটা ফেলে দিলেন, আপনার নাতি এসে রাগ করবে না?”
