অবাক হয়ে বললুম, “ব্যাপারটা বড্ড গোলমেলে হয়ে গেল দেখছি!” কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট ধরিয়ে বললেন, “অবশ্য এমনও হতে পারে, রায়সাহেব তাদের রায়গড় শিবমন্দিরের সেবাইতমশাইয়ের নাতিকে সদিচ্ছাবশেই উদ্ধার করতে চেয়েছেন। হয়তো পঞ্চাননবাবুই ছুটে এসেছেন তার কাছে। তাই…” কর্নেল হঠাৎ থেমে গিয়ে হেলান দিলেন ইজিচেয়ারে। চোখ বন্ধ করে রইলেন।
“কিন্তু কর্নেল রায়সায়েব কেন হালদারমশাইকে নিজের নাম গোপন রাখতে বলবেন?” কর্নেল চোখ বন্ধ রেখেই বললেন, “ঠিক, ঠিক। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।”
“রায়সায়েব কি হালদারমশাইয়ের সঙ্গে আপনার সম্পর্কের কথা জানেন?”
“না জানলেও হালদারমশাই জানিয়ে থাকবেন। তাই…” কর্নেল চোখ খুলে সোজা হয়ে বসলেন।”, রায়সায়েব চান না আমি এতে নাক গলাই। তখন ফোনে বললেন, একিনোক্যাকটাস
সিনিয়ি–সেই অকালকুষ্মণ্ডের জন্য কষ্ট করে রায়গড়ে আমার যাওয়ার দরকার নেই। উনিই শিগগির পাঠিয়ে দেবেন।”
“তা হলে হালদারমশাই ওঁর অজ্ঞাতে আপনার সঙ্গে পরামর্শ করতে এসেছিলেন?”
“হুঁ।” কর্নেল চুরুটের একরাশ ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, “হালদারমশাই খুব মেথডিক্যাল। কিন্তু বড্ড হঠকারী। বহুবার নিজেই নিজের সাঙ্ঘাতিক বিপদ ডেকে এনেছেন, তা তো তুমিও দেখেছ। লাফাং চু দ্রিদিম্বা ভৌতিক রহস্যে আমার মাথাব্যথা ছিল না। অকালকুষ্মণ্ডও আমি ঘরে বসে পেয়ে যাব। কিন্তু হালদারমশাইয়ের জন্য আমার ভাবনা হচ্ছে, জয়ন্ত! এই দ্যাখো না! নিজের নোটবইটাই ফেলে গেলেন এবং স্টেশনে গিয়ে সেটার কথা খেয়াল হল। এদিকে রায়সায়েবের এমন লুকোছাপারই বা কারণ কী? তিনি তো আমার পরিচয় ভালোই জানেন। নাহ ডার্লিং! আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, এটা আমার প্রতি একটা চ্যালেঞ্জ।”
কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। বললুম, “আপনি কি এখনই রওনা দেবেন নাকি?”
“বনশোভা নার্সারিতে আমি বারতিনেক গেছি, জয়ন্ত! প্রোপ্রাইটর সাধুচরণ লাহা আমার চেনা লোক। গঙ্গার ধারে প্রায় তিরিশ একর জমি জুড়ে ওঁর বিশাল নার্সারি। নন্দনকানন বললেই চলে। এমন নার্সারি এদেশে আর দুটি নেই। লাহাবাবু দুর্লভ প্রজাতির অর্কিড আর ক্যাক্টি গ্র্যাফটিং করে নানা জায়গায় চালান দেন।”
“ঠিক আছে। উইশ ইউ গুড লাক।”
কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বললেন, “তুমিও যাচ্ছ।”
“সে কী! আমাকে যে আজ মুখ্যমন্ত্রীর প্রেস কনফারেন্সে যেতে হবে।”
“চিফ রিপোর্টারকে বাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দাও, মুখ্যমন্ত্রীমশাইয়ের ভাষণের চেয়ে লাফাং চু দ্রিদিম্বা রহস্য পাঠকরা বেশি খাবে। বরং ফোনটা আমাকে একবার দিও। বুঝিয়ে দেব।…”
.
দুই
রায়গড়ে পৌঁছতে প্রায় পৌনে চারটে বেজে গেল। গঙ্গার ধারে একটা পুরোনো গঞ্জের গায়ে একালের ছাপ পড়েছে। নতুন-পুরোনোতে মিলে অদ্ভুত একটা চেহারা। ভিড়ভাট্টা হইচইয়ে তুলকালাম অবস্থা। আমরা একটা সাইকেলরিকশা নিলুম। বসতি এলাকা ডাইনে রেখে রিকশা যে পথে এগোল, তার দু’ধারে ধ্বংসস্তূপ আর জঙ্গল। কিছুক্ষণ পরে কর্নেল হঠাৎ বলে উঠলেন, “রোখকে! রোখকে! শিবমন্দিরে প্রণাম করে আসি। এক মিনিট।”
রিকশাওয়ালা বলল, “বেশি দেরি করবেন না স্যার! নার্সারি থেকে আমাকে একা ফিরতে হবে। বেলা গড়িয়ে যাবে। সুনসান নিরিবিলি রাস্তা।”
কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন, “চোর-ছিনতাইয়ের ভয় আছে নাকি?”
রিকশাওয়ালা তুম্বো মুখে বলল, “না স্যার! ইদানীং এখানে বাবার চেলাদের খুব উপদ্রব শুরু হয়েছে।”
“তুমি কি ভূতপ্রেতের কথা বলছ?”
রিকশাওয়ালা বুকে-কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল, “আজ্ঞে, ঠিকমতো সেবাযত্ন না হলে বাবা রাগেন! পেখম রাগ পড়েছিল ঠাকুরমশাইয়ের গিন্নির ওপর। রাত্তিরে খিড়কির দোরের কাছে ঘাড় মটকে দিয়েছিলেন। এই তো দু’মাস আগের কথা! ডাক্তার বলল, হার্টফেল! আজকাল ডাক্তারদের এই এক কথা, হার্টফেল। তবে কেউ-কেউ বলেছিল বটে মার্ডারকেস। আমি বিশ্বাস করিনে স্যার!”
কর্নেল ভুরু কুঁচকে কথা শুনছিলেন। বললেন, “তুমি কার কথা বলছ?”
“আজ্ঞে এই মন্দিরের যে ঠাকুরমশাই আছেন, তেনার ওয়াইফ ছিলেন।”
“বুঝেছি। তা…”
“আর দেরি করবেন না স্যার! শিগগির প্রণাম করে আসুন।” কর্নেল পা বাড়িয়ে বললেন, “মন্দিরে এখন ঠাকুরমশাই আছেন তো?”
“থাকার তো কথা।”
“ওঁর বাড়িতে আর কে আছেন?”
“ওঁর নাতি বিশু। মা-বাপ মরা ছেলে স্যার! ঠাকুরমশাই মানুষ করছেন। ইস্কুলে পড়ে।”
“বিশুও নিশ্চয় আছে এখন? স্কুলের তো ছুটি হয়ে গেছে।”
রিকশাওয়ালা হাসল। “বিশুকে পাওয়া কঠিন। এই আছে তো এই নেই। কোথায়-কোথায় ঘোরে টোটো করে। তবে ছেলেটা বড্ড ভালো স্যার!”
আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “আচ্ছা, এই লাফাং চু দ্রিদিম্বা ব্যাপারটা..” রিকশাওয়ালা আঁতকে উঠে ফের কপালে-বুকে হাত ঠেকিয়ে বলল, “ওসব কথা বলবেন না স্যার! যান, যান! প্রণাম করে আসুন। বড্ড দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
রাস্তা থেকে একফালি পায়ে চলা পথ এগিয়ে গেছে শিবমন্দিরের জরাজীর্ণ ফটক পর্যন্ত। দু’ধারে ধ্বংসস্তূপ ঢেকে রেখেছে ঝোঁপঝাড় আর কিছু উঁচু গাছ। কর্নেল যেতে যেতে চাপা স্বরে বললেন, “বোঝা গেল, বিশু কিডন্যাল্ড হওয়ার কথা এখানে এখনও সম্ভবত কেউ জানে না।”
সায় দিয়ে বললুম, “আরও একটা কথা জানা গেল, সেবাইত ভদ্রলোকের স্ত্রীর মৃত্যুটা অনেকের কাছে সন্দেহজনক।”
