“এইজন্যই সেদিন এক ভদ্রমহিলা বলেছিলেন, আপনার ওই কর্নেল ভদ্রলোক…”
“নিঃসঙ্কোচে বলো ডার্লিং! আজ আমার মুড খাসা। ওপালটিয়া বাসিলারিস ক্যাক্টির একটা কাটিং মেক্সিকোর সোনোরা থেকে আনিয়েছিলুম। দারুণ ফুল উপহার দিয়েছে। অবিশ্বাস্য!”
“ভদ্রমহিলার মতে, আপনি খুব ন্যাকো।”
কর্নেল হা-হা হো-হো হেসে বললেন, “ব্রিলিয়ান্ট! ভদ্রমহিলা যথার্থ বলেছেন। ন্যাকা কথাটার মানে বলো তো?”
“যে জেনেও না-জানার ভান করে।”
“হুঁ। তবে কথাটা এসেছে আরবি নেক থেকে। নেক মানে পুণ্যবান, ভালোমানুষ। এক ভাষার শব্দ অন্য ভাষায় ঢুকে বিকৃত হয়ে যায়। মানেও বদলে যায়। নেক থেকে নেকা। এ ক্ষেত্রে উচ্চারণ এবং ব্যঙ্গাত্মক অর্থবিকৃতি ঘটেছে। একা যেমন অ্যাকা।”
প্রায় আর্তনাদ করলুম, “আহ কর্নেল!”
কর্নেল হঠাৎ গম্ভীর হয়ে টেলিফোনের দিকে হাত বাড়ালেন। একটা নম্বর ডায়াল করে বললেন, “সুপ্রভাত রায়সায়েব! কর্নেল সরকার বলছি। …আচ্ছা, আপনার বাগানে যে একিনোক্যাকটাস গ্রুসিনিয়ে দেখেছিলুম…হঁ, আপনি চমৎকার নাম দিয়েছেন কুমিণ্ড ক্যাক্টি..কী বললেন? অকালকুষ্মাণ্ড? হাঃ হাঃ হাঃ! এনিওয়ে, ওগুলো তো রায়গড় থেকে..বনশোভা নার্সারি? আই সি!…কী অবাক! আমি কল্পনাও করিনি আপনি রায়গড়ের ঐতিহাসিক রাজাদের বংশধর। আসলে রাজবংশধররা কুমারবাহাদুর বা প্রিন্স…হুঁ, আপনি পছন্দ করেন না তা হলে। …শুনুন, ওই অকালকুণ্ড আমার দরকার। কীভাবে…ধন্যবাদ। রাখছি।”
কর্নেল ফোন রাখার পর হাই তুলে বললুম, “কোনো এক রায়গড়ে ভূতের পেছনে দৌড়লেন এক ভদ্রলোক। এদিকে আর-এক ভদ্রলোক মনে হচ্ছে অকালকুষ্মণ্ডের পেছনে দৌড়তে চলেছেন। তবে এই যোগাযোগটা অদ্ভুত রকমের আকস্মিক।”
প্রকৃতিবিদ এতক্ষণে মাথার আঁটো-টুপি খুলে টাকে হাত বুলোচ্ছিলেন। বললেন, “রহস্য জিনিসটার সঙ্গে আকস্মিকতার সম্পর্ক অনিবার্য, জয়ন্ত!”
“আপনার এই অকালকুষ্মণ্ডে কোনো রহস্য আছে বুঝি?”
“আছে। প্রকৃতির চেয়ে বেশি রহস্য আর কোথায় আছে?”
“নাকি রথ দেখা কলা বেচা দুই-ই সেরে নিতে চান?”
কর্নেল আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। তারপর সোফার কাছে এগিয়ে নীচে থেকে একটা নোটবুক কুড়িয়ে বললেন, “বলেছি, তুমি হালদারমশাইকে লক্ষ করোনি। করলে চোখে পড়ত, খবরটা পড়ার পর ভদ্রলোক এমন উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন যে, নোটবইটার কথা ভুলে গেছেন। সম্ভবত ওটা আমাকে দেখানোর জন্য হাতে রেখেছিলেন। কর্নেল নোটবইটার পাতা ওলটাতে থাকলেন। “তারপর আমার আসতে দেরি হচ্ছে দেখে কাগজ পড়ার জন্য এটা সোফায় রাখেন। এত বড় নোটবই পকেটে ঢোকানো যায় না। এটা ওঁর ডিটেকটিভ এজেন্সির নোটবই মনে হচ্ছে। যাই হোক, খবরটা পড়ার পর হঠাৎ উঠে দাঁড়ানো এবং চলে যাওয়ার সময় নোটবইটা নীচে পড়ে যায়।…হঁ! এই তো! একটা বেনামী চিঠির কপি ছাড়া এটা আর কী হতে পারে? মূল চিঠিটা…জয়ন্ত! ফোনটা ধরো।”
টেলিফোন বাজছিল। সাড়া দিতেই হালদারমশাইয়ের গলা ভেসে এল। “জয়ন্তবাবু নাকি? কর্নেলস্যারকে দিন না, প্লিজ!”
“আপনি কোত্থেকে ফোন করছেন?”
“হাওড়া স্টেশন। আর কইবেন না! নোটবই ফ্যালাইয়া আইছি।”
“ওটা আপনার কর্নেলস্যারের হাতে রয়েছে।”
“ওঁকে ফোনটা দিন! ট্রেনের সময় হয়ে গেছে।”
হালদারমশাই পূর্ববঙ্গীয় ভাষাতেও কথা বলেন মাঝে-মাঝে। বিশেষ করে উত্তেজনার সময়। ফোন কর্নেলকে দিলুম। কর্নেল বললেন, “হুঁ, বলুন হালদারমশাই!…বলেন কী!…মক্কেলের নিষেধ? ঠিক আছে। সব পেশাতেই কিছু এথিক্স বা নীতি মেনে চলা হয়। আপনি ডিটেকটিভ। কাজেই…না, না! আপনার কাজ আপনি করুন।..গোপনে যোগাযোগ রাখবেন? বেশ তো!…ঠিক আছে উইশ ইউ গুড লাক!…”।
ফোন রেখে কর্নেল গম্ভীর মুখে ঘুরে দাঁড়ালেন। বললুম, “কী ব্যাপার?”
কর্নেল নোটবইয়ের একটা পাতা আমার সামনে তুলে ধরলেন। হালদারমশাইয়ের হস্তাক্ষরে লেখা আছে :
২৬ মার্চ রাত বারোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করা হবে। তার মধ্যে ত্র্যম্বক না পেলে আদরের নাতি বিশু বলিদান হবে। আবার বলা হচ্ছে, ত্র্যম্বক রেখে আসবে শ্মশানবটের গোড়ায় চৌকো পাথরটার ওপর। পুলিশকে জানালে শিবেরও সাধ্য নেই তোমাকে বাঁচায়। আর-একটা কথা। লাফাং চু দ্রিদিম্বা দিয়ে কাজ হবে না। ওই ভূতটাকে আমরা চিনি। তাকে ফঁদ পেতে ধরব। সাবধান।
পড়ার পর বললুম, “সর্বনাশ! কিডন্যাপ কেস মনে হচ্ছে যে!”
কর্নেল আস্তে বললেন, “হ্যাঁ। পঞ্চানন আচার্যের নাতি বিশুকে কারা গুম করে রেখেছে।”
“এ্যম্বক তা হলে নিশ্চয় কোনো দামি জিনিস?”
“এ্যম্বক শিবের এক নাম। তবে কথাটার মানে, যে-দেবতার তিনটে চোখ আছে।” কর্নেল নোটবইটা নিয়ে তার ইজিচেয়ারে বসলেন। “আমাদের হালদারমশাই নিজের পেশার ব্যাপারে খুব মেথডিক্যাল। ফোনে আমাকে ওঁর মক্কেলের নাম জানাতে চাইলেন না। বললেন, নিষেধ আছে। কিন্তু নোটবইয়ে নাম-ঠিকানা সবই লেখা আছে দেখছি।”
“ওঁর মক্কেল সেই শিবমন্দিরের সেবাইত পঞ্চানন আচার্য, সে তত বোঝাই যাচ্ছে!”
“নাহ জয়ন্ত!” কর্নেল একটু হাসলেন। “নাতি কিডন্যান্ড্রু হয়েছে যাঁর, তিনি মোটেও হালদারমশাইয়ের কাছে আসেননি। সম্ভবত তার জানার কথাও নয় যে, কে. কে. হালদার নামে একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ আছেন। হালদারমশাইয়ের মক্কেল হলেন রায়সায়েব, যাঁর সঙ্গে একটু আগে ফোনে কথা বললুম। বালিগঞ্জ লেনের প্রমোদরঞ্জন রায়। ভদ্রলোক ইন্টারন্যাশনাল হর্টিকালচার সোসাইটির একজন মেম্বার।”
