একটু হেসে বললুম, “হঠাৎ আমাকে নিয়ে পড়লেন কেন? হালদারমশাই…”
আমাকে থামিয়ে কর্নেল বললেন, “তোমাদের দৈনিক সত্যসেবক’ পত্রিকায় খবরটা বেরিয়েছে।”
“কত খবর বেরোয় কাগজে, সব খবর পড়তেই হবে, তার মানে নেই।” বলে হাত বাড়িয়ে কাগজটা টেনে নিলুম। হালদারমশাইয়ের ব্যাপারটা বোঝার জন্যই।
ষষ্ঠীচরণ কফি আর স্ন্যাক্সের ট্রে এনে টেবিলে রাখল। তারপর চোখে ঝিলিক তুলে চাপা স্বরে আমাকে জিজ্ঞেস করল, “টিকটিকিবাবু বাথরুমে নাকি?”
“নাহ! ওঁর কফিটা বরং তুমিই গিলে ফেলো গে ষষ্ঠী।”.
ষষ্ঠী ডিটেকটিভ বলতে পারে না, কিংবা হয়তো ইচ্ছে করেই ‘টিকটিকি’ বলে। কারণ সে হালদারমশাইয়ের ভাবভঙ্গি লক্ষ করে প্রচুর আমোদ পায়। কর্নেল তার দিকে চোখ কটমটিয়ে তাকাতেই সে বিব্রতভাবে বলল, “খামোকা অতটা দুধ নষ্ট। আজকাল দুধের যা আকাল। টিকটিকিবাবু বেশি দুধ ছাড়া কফি খান না।”
বলে সে আমার পরামর্শমতো অতিরিক্ত দুধ-মেশানো কফির পেয়ালাটা তুলে নিয়ে চলে গেল।
কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, “ষষ্ঠী হালদারমশাইকে টিকটিকিবাবু বলে। জয়ন্ত, আশা করি টিকটিকি কথাটা জানো। পুলিশের গোয়েন্দাদের একসময় টিকটিকি বলা হত। সেটা ডিটেকটিভ শব্দটার ব্যঙ্গাত্মক বিকৃতি।”
“কিন্তু খবরটা কোথায়?”
“ছয়ের পাতায় আট নম্বর কলামের মাথায়।”
খবরটা এবার চোখে পড়ল।
.
রায়গড়ে ভৌতিক উপদ্রব
রায়গড়, ২৩ মার্চ–সম্প্রতি এখানে এক অদ্ভুত উপদ্রব শুরু হয়েছে। গভীর রাতে অনেক বাড়ির জানলায় কে বা কারা খটখট শব্দ করে ভুতুড়ে গলায় বলে, ‘লাফাং চু দ্রিদি। কিন্তু তন্নতন্ন করে খুঁজে কাউকে দেখা যায় না। এমনকি বাড়ির চারপাশে আলো জ্বললেও এই ঘটনা ঘটছে। সাহসী যুবকরা দলবেঁধে পাহারা দিয়েও এর কিনারা করতে পারেনি। পুলিশকে জানানো হয়েছে। কিন্তু পুলিশও এ রহস্য ফাঁস করতে ব্যর্থ হয়েছে। আশ্চর্য ব্যাপার, ২০ মার্চ রাতে থানার বড়বাবুর কোয়ার্টারেও এই ভুতুড়ে ঘটনা ঘটেছে। তিনি রিভলভার থেকে কয়েক রাউন্ড গুলিবর্ষণ করেন। তাতেও কাজ হয়নি। তার ঘণ্টাটাক পরে ‘বনশোভা নার্সারি’র প্রোপ্রাইটর সাধুচরণ লাহার বাড়ির জানলায় ‘লাফাং চু দ্রিদিম্বা’ শোনা যায়। শ্রীলাহা এবং তার পরিবার প্রচণ্ড আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। প্রথমত উল্লেখ্য, এখানে গঙ্গার ধারে শ্মশানের কাছে যে প্রাচীন শিবমন্দির আছে, সেটি ঐতিহাসিক। রায়গড়ের রাজা কীর্তিমান রায় ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দে এই মন্দির নির্মাণ করেন। মন্দিরের বর্তমান সেবাইত পঞ্চানন আচার্য মহাশয়ের মতে, রায়গড়বাসীদের অনাচারে ক্রুদ্ধ দেবতা মহাদেব তার ভূতগণকে লেলিয়ে দিয়েছেন। অবিলম্বে তার তুষ্টিসাধনের জন্য মহাযজ্ঞ, বলিদানাদি পুণ্যকৃত্য আবশ্যক।
খবরটা খুঁটিয়ে পড়ার পর হাসতে হাসতে বললুম, “বোগাস! আসলে অনেক সময় কাগজের পাতা ভরার জন্য আজেবাজে বা উদ্ভট খবর দরকার হয়। যাঁরা খবর জোগাড় করেন, তাঁরাও এই কম্মটি করে থাকেন। তা ছাড়া তিলকে তাল না করলে খবর হয় না। বিশেষ করে লোকে তো মুখরোচক খবরই চায়।”
কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, “খবরটা পড়ার পর মনে হচ্ছিল, হালদারমশাইয়ের আবির্ভাব আসন্ন। কারণ ক’দিন আগে উনি ফোনে দুঃখ করে বলছিলেন, কেস-টেস একেবারে পাচ্ছেন না। জীবনটা একঘেয়ে লাগছে। দেশ থেকে রহস্য-টহস্য কমে গেলে ওঁর এজেন্সিই যে তুলে দিতে হবে। ভেবে দ্যাখ জয়ন্ত, গণেশ অ্যাভিনিউয়ে তেতলার ছাদে ছোট্ট একখানা ঘরের ভাড়া পাঁচশো টাকা! হালদারমশাইয়ের মতো রিটায়ার্ড মানুষের পক্ষে কী সাঙ্ঘাতিক সমস্যা তা হলে!”
“কাজেই হালদারমশাই রায়গড়ের ট্রেন ধরতে গেলেন।” কফিতে চুমুক দিয়ে বললুম, “কিন্তু উনি আপনার সঙ্গে পরামর্শ না করে অমনভাবে বেরিয়ে গেলেন, এটাই আশ্চর্য ব্যাপার।”
“একটু আগেই বলেছি, রহস্যটা যে কাগজের খবর হবে সেটা আঁচ করতে পারেননি, কর্নেল অভ্যাসমতো হেলান দিয়ে চোখ বুজলেন। “হু, তুমি ঠিকই বলেছ। ওঁর হঠাৎ চলে যাওয়াটা আমাকেও অবাক করেছে।”
“কিন্তু কর্নেল, তা-ই বা আপনি ধরে নিচ্ছেন কেন? এমন হতে পারে, হালদারমশাই নেহাত আড্ডা দিতেই এসেছিলেন। খবরটা পড়েই রহস্যের টানে ছুটে গেলেন। ওঁর পাগলামির কথা আমরা ভালোই জানি।”
কর্নেল হাসলেন। “তুমি আসার আগেই হালদারমশাই এসেছিলেন কি না?”
“হ্যাঁ। কিন্তু ওঁর মধ্যে কোনো উত্তেজনা দেখিনি।”
“তুমি লক্ষ করোনি, ডার্লিং! উনি এসেই ষষ্ঠীকে ছাদে পাঠিয়েছিলেন আমাকে খবর দিতে। নিজেই যেতে পারতেন। যাননি, তার কারণ তোমার জানা উচিত। তুমিও এসে সোজা ছাদে চলে যেতে। কিন্তু যাওনি।”
“ছাদের দরজায় কী সব সাঙ্ঘাতিক ক্যাকটাস রেখেছেন যে!”
“হুঁ। অ্যাপোরোক্যাকটাস ফ্ল্যাজেলিফর্মিস। এই সিরিউস প্রজাতির ক্যাক্টি ব্যালকনিতে রাখার উপযুক্ত। এরা বৃষ্টি সইতে পারে না। অথচ ঠাণ্ডা পরিবেশ চাই। ভীষণ কাটায় ভরা, কতকটা অক্টোপাসের গড়ন। কিন্তু কী অসাধারণ লাল ফুল ফোটে। উঁকি মেরে দেখে এসো বরং।”
“প্লিজ কর্নেল!” বিরক্ত হয়ে বললুম, “হালদারমশাই এবং লাফাং চু দ্রিদিম্বা…”
হাত তুলে কর্নেল বললেন, “ওই ক্যাক্টিগুলো ছাদে ওঠার মুখে রেখেছি, যাতে কেউ হুট করে গিয়ে আমাকে বিরক্ত করতে না পারে। ক্যাক্টি আর অর্কিড অনেক বেশি মনোযোগ ও সেবা দাবি করে ডার্লিং!”
