চোপরার হাতে একটা বাঁটুল। হিস্টোফোন ফিসফিস করে বলল, “ওই দেখুন, দেবতার বলটা আমার মেয়ের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে কি না। খামকা আমাকে ওরা ভোগাল!” একটু পরে চোপরা উঠে দাঁড়াল। বাঁকা নাকওয়ালা সঙ্গীকে কিছু বলল। ওর সঙ্গী ডাকল, “ওই জাম্বু! খুব হয়েছে।”
জাম্বু পেছনে, ওরা সামনে–কয়েক পা এগিয়েছি, অমনি পাথরের আড়াল থেকে গর্জন করে বেরিয়ে এল রক্তাক্ত আহত সেই চিতাবাঘটা। জাম্বু পাল্টা গর্জন করল। তারপর চিতাটা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। চোখের পলকে দুটি জানোয়ার মরণপণ লড়াইয়ে নেমে গেল। শিম্পাঞ্জি আর চিতাবাঘ পরস্পর জন্ম-শত্রু।
চোপরা পকেট থেকে পিস্তল বের করেছে, কিন্তু গুলি ছুঁড়তে পারছে না।–পাছে শিম্পাঞ্জিটার গায়ে গুলি লাগে। দুটি হিংস্র জন্তুর গর্জনে ও লড়াইয়ে তুমুল কাণ্ড চলেছে। চিতাটা আমার গুলিতে জখম না হলে হয়ত পিঠটান দিত শিম্পাঞ্জির এক থাপ্পড় খেয়েই। কিন্তু আহত চিতাবাঘটা মরিয়া হয়ে উঠেছে। সে আচমকা শিম্পাঞ্জিটার গলা কামড়ে ধরল। শিম্পাঞ্জিটা নেতিয়ে পড়ল। সেই সুযোগে চোপরা চিতাটার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করল। তখন চিতাটাও নেতিয়ে পড়ল। ক্রমশ দুটি প্রাণীর দেহ নিস্পন্দ হয়ে গেল।
দুটি জানোয়ারই মারা পড়েছে। চোপরা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই সময় হিস্টোফোন দৌড়ে পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে গিয়ে চোপরার পায়ের তলা থেকে তার বাঁটুলটা কুড়িয়ে নিল। চোপরা তো তার দিকে পিস্তল তাক করে বলল, “এই ব্যাটা নাগপা! ওটা দে, বলছি। নইলে তোর মুণ্ডু উড়িয়ে দেব।”
কর্নেল আমাদের ইশারা করলেন। আমাদের তিনজনের হাতেই আগ্নেয়াস্ত্র। কর্নেল বাজখাঁই গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন, “পিস্তল ফেলে দাও ভোমরালাল! চোপরা ভড়কে গিয়ে পিস্তল ফেলে দিল। আর ওর ঢ্যাঙা বাজনেকো সঙ্গীটা গতিক বুঝে দৌড়ে জঙ্গলের ভেতর পালিয়ে গেল। তাকে তাড়া করে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলুম।
চোপরা কোনো কথা বলল না। শিম্পাঞ্জিটার কাছে ধপাস করে বসে পড়ল। কর্নেল বললেন, “শোক প্রকাশ পরে করবেন ভোমরালালজী! এখন আমাদের সঙ্গে আসুন।”
চোপরা ঘাড় গোঁজ করে বসে রইল।
তখন কর্নেল বললেন, “জয়ন্ত, তুমি হোটেলে গিয়ে প্রণববাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করো। ব্রিগেডিয়ার অর্জুন সিংকে বললে উনি যোগাযোগ করিয়ে দেবেন। তুমি ওদের নিয়ে এস। আসামীকে গ্রেফতার করে কলকাতা নিয়ে যেতে হবে।”
আমি পা বাড়ালুম। হিস্টোফান বলল, “দেবতার বল ফিরে পেয়েছি আর আমার ভয় নেই। সর্দারকে গিয়ে দেখালেই আমার সব দোষ মাফ। আমি বস্তিতে ফিরে চললুম।”
সে দৌড়ে খাল পেরিয়ে চলে গেল। আমি চললুম হোটেলের দিকে। উঁচু রাস্তার উঠে বাঁ-দিকে ঘুরে দেখলুম, হিস্টোফানকে দেখে তার মেয়ে ওণ্টি দৌড়ে আসছে। কুকুরটাও তার দিকে দৌড়চ্ছে। বস্তি থেকে দলে-দলে লোকেরা বেরিয়ে অবাক হয়ে ওদের দেখছে। ডাইনির গুহা থেকে যে বেঁচে ফিরতে পেরেছে এবং শুধু তাই নয়, দেবতার বল উদ্ধার করে নিয়ে গেছে, সম্ভবত বস্তিতে এবার তার সম্মান বেড়ে যাবে।
বাবা-মেয়ের উজ্জ্বল মুখ দূর থেকে রোদ ঝলমল করতে দেখে আমার মন আনন্দে ভরে গেল।
কিন্তু হোটেলের কাছাকাছি পৌঁছেই ফিরতে হল। ব্রিগেডিয়ার অর্জুন সিং আর প্রণব রুদ্র একদল পুলিশ নিয়ে এদিকেই হন্তদন্ত হয়ে আসছেন।…
৩.০২ লাফাং চু দ্রিদিম্বা রহস্য
প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে. কে. হালদার সোফায় হেলান দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। হঠাৎ সোজা হয়ে বসে চমকে-ওঠা ভঙ্গিতে বললেন, “খাইছে!”
জিজ্ঞেস করলুম, “কে কাকে খেল হালদারমশাই?”
গোয়েন্দা ভদ্রলোক উত্তেজিতভাবে বললেন, “লাফাং চু!”
“তার মানে?”
“দ্রিদিম্বা!” বলেই কাগজটা যেমন-তেমন করে দুমড়ে রেখে হালদারমশাই সটান বেরিয়ে গেলেন। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে হাঁ করে তাকিয়ে রইলুম। ব্যাপারটার মাথামুণ্ডু কিস্যু বোঝা গেল না।
এ-কথা ঠিকই যে, হালদারমশাই মাঝে-মাঝে বেমক্কা কিছু-কিছু উদ্ভুট্টে কাণ্ড করে ফেলেন। সেটা সম্ভবত ওঁর ছিটগ্রস্ত স্বভাবের দরুনই বটে। তা ছাড়া সব-তাতে নাক গলানোর অভ্যাসও আছে। একসময় পুলিশে চাকরি করতেন। রিটায়ার করার পর একটি প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলেছেন। কালে-ভদ্রে দু-একজন মক্কেল জোটে, অর্থাৎ’কে’ হাতে পান। সেই কেস জটিল হলে সুখ্যাত রহস্যভেদী কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের এই জাদুঘরসদৃশ ড্রয়িংরুমে পরামর্শ নেওয়ার জন্য হাজির হন এবং ঘনঘন নস্যি নেন। এদিন সাতসকালে ওঁর আবির্ভাব দেখে অবশ্যি তেমন কিছু অনুমান করতে পারিনি। কিন্তু ওই দুর্বোধ্য দুটি শব্দ আওড়ে ওঁর আকস্মিক প্রস্থানের কারণটা কী?
“কী হল ডার্লিং? তোমাকে অমন দেখাচ্ছে কেন?”
ঘুরে দেখি এতক্ষণে ছাদের বাগান থেকে নেমে এসেছেন কর্নেল। আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “লাফাং চু।”
বৃদ্ধ প্রকৃতিবিদ তার সাদা দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, “হুঁ। তো হালদারমশাই কোথায় গেলেন?”
“দ্রিদিম্বা।”
কর্নেল অট্টহাসি হেসে এগিয়ে এসে ইজিচেয়ারে বসলেন। “বোঝা যাচ্ছে খবরটা কাগজেও বেরোবে, সেটা আঁচ করতে পারেননি হালদারমশাই।”
“খবর? কীসের খবর?”
মুখে কপট ভর্ৎসনার ছাপ ফুটিয়ে কর্নেল বললেন, “তুমি একজন সাংবাদিক, জয়ন্ত! সাংবাদিক হিসেবে তোমার যথেষ্ট সুনামও আছে। অথচ আমার অবাক লাগে, নিজের পেশার প্রতি তুমি একেবারে উদাসীন।”
