হিস্টোফোন হিংস্র মুখভঙ্গি করে দুর্বোধ্য ভাষায় কী বলল। তারপর সামনে পায়ের বাঁধনটা ঘষড়াতে থাকল। তার দেখাদেখি আমরাও অন্যপাশের দেয়ালের দিকে গড়িয়ে গেলুম। গুহার মুখে খানিকটা জায়গা বাইরের রোদের আভায় আলোকিত হয়ে আছে। কিন্তু মুখে ঝোঁপজঙ্গল বলে আলোটা খুব কম। উঁচু ধারাল একটা পাথর খুঁজে আমরা দুজনে পালাক্রমে আগে পায়ের বাঁধনটা ঘষড়াতে শুরু করলুম। হাতের বাঁধন আগে কাটা যাবে না। কারণ আমাদের প্রত্যেকের হাত পিঠের দিকে বাঁধা।
দড়িগুলো শক্ত লতা দিয়ে তৈরি। তাই সহজে ছেঁড়া যায় না। কতক্ষণ পরে হিস্টোফোনের কথা শুনে ঘুরে দেখি, সে বাঁধন কেটে ফেলেছে। হিংস্ৰমুখে সে বলল, “ডাইনিটা তোমাকে খেয়ে ফেলুক। তোমার জন্য আমার এই দুর্দশা। আমি চললুম।”
বললুম, “হিস্টোফোন! কথা শোনো। তুমি গিয়েও তো বস্তিতে ঢুকতে পারবে না! কিন্তু তোমার মেয়ে ওণ্টির কী হবে ভেবে দেখেছ হিস্টোফোন?”
হিস্টোফোন একটু ভড়কে গেল এবার। মুখ গোমড়া করে বলল, “সন্ধে অব্দি কোথাও লুকিয়ে থাকব। তারপর চুপিচুপি ওন্টিকে নিয়ে পালিয়ে যাব।”
“বরং এক কাজ করো হিস্টোফান! তুমি আমাদের বাঁধন খুলে দাও। আমাদের সঙ্গে হোটেলে গিয়ে থাকবে, তারপর সন্ধ্যায় তোমার মেয়েকে নিয়ে যাবে। রাতেই তোমাকে নিয়ে কলকাতা চলে যাব।”
হিস্টোফোনের মনে ধরল কথাটা। সে ভয়ের চোখে গুহার ভেতরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলল, “কিন্তু বাঁধন খুলে দিতে দিতে যদি ডাইনিটা এসে পড়ে?”
“আমার প্যান্টের পকেটে রিভলবার আছে। বের করে হাতের কাছে রাখো।”
“আমি গুলি ছুঁড়তে জানি না।”
“তোমাকে দেখিয়ে দিচ্ছি কী করতে হবে।”
হিস্টোফোন ঝটপট আমার পকেট থেকে রিভলভারটা বের করে ফেলল। তাকে মুখে বুঝিয়ে দিলাম, ট্রিগার কীভাবে টানতে হবে। সেফটি-ক্যাচ তোলার ঝামেলা নেই। অস্ত্রটা অটোমেটিক। ভাগ্যিস ওরা আমাকে চিত করে ফেলে দিয়েছিল–একটু কাত হলেই চোট খেয়ে গুলি বেরিয়ে যেত।
হিস্টোফোন আমার বাঁধন খুলে দিল। তারপর বেণীমাধবের বাঁধন খুলতে শুরু করল। আমি রিভলভার নিয়ে তৈরি রইলুম। কিন্তু ডাইনি হোক আর যেই হোক, মানুষখেকোটির কোনো সাড়া নেই। বেণীমাধবের বাঁধন খুলে দিলে উনি উঠে পড়লেন। তারপর আমরা তিনজনে গুহা থেকে বের হয়ে এলুম।
কিন্তু যেমনি পা বাড়াতে গেছি, চড়বড় করে গুহার সামনে একরাশ পাথর পড়ল। অমনি পিছিয়ে এলুম। হিস্টোফোন উত্তেজিতভাবে বলল, “সর্বনাশ, বস্তির লোকেরা আড়ালে ওত পেতে আছে। ওরা আমাদের বেরুতে দেবে না। বেরুলেই পাথর ছুঁড়বে।”
রাগে খেপে গিয়ে রিভলবার থেকে পরপর দুটো গুলি ছুড়লুম। পাহাড়ে প্রচণ্ড প্রতিধ্বনি হল। তারপর তিনজনে বেরিয়ে গেলুম গুহার বাইরে।
কিন্তু আবার চড়বড় করে পাথর পড়া শুরু হল, আবার গুহায় ঢুকতে হল। ওরা আড়ালে কোথাও ঘাপটি মেরে আছে। খামোকা গুলি ছুঁড়ে লাভ নেই।
হঠাৎ হিস্টোফোন কান খাড়া করে কী শুনে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “গুলির শব্দে ডাইনিটার ঘুম ভেঙে গেছে! সর্বনাশ! এবার কী হবে?”
ঘুরে দেখি গুহার ভেতর অন্ধকারে দুটো হলদে আলো জুলজুল করছে। অজানা ভয়ে কেঁপে উঠলুম। আলো দুটো ক্রমশ এগিয়ে আসছিল। বেণীমাধবের হাতে তাঁর পিস্তলটা দেখতে পেলুম এতক্ষণে। আমি আলো দুটো লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ার আগেই উনি পিস্তলের গুলি ছুড়লেন। অমনি কানফাটানো গর্জন শুনলুম। পলকের মধ্যে দেয়ালের ধারে সরে গিয়েছিলুম সহজাত আত্মরক্ষা প্রবৃত্তির বশেই। কী একটা হলুদ-কালো প্রাণী লাফ দিয়ে পড়ল মাঝখানে। সঙ্গে সঙ্গে আমি রিভলভারের ট্রিগারে চাপ দিলুম। আবার বিকট গর্জন শুনলুম। তারপর দেখি, একটা চিতাবাঘ ডিগবাজি খেতে-খেতে বেরিয়ে গেল গুহার বাইরে।
“তাহলে ইনিই নাগপাদের মানুষখেকো ডাইনি।” বেণীমাধব মন্তব্য করলেন।
হিস্টোফোন গম্ভীর মুখে বলল, “ডাইনিটা এখন চিতাবাঘ সেজেছে।”
গুহার মুখে উঁকি মেরে দেখলুম, চিতাবাঘের পিঠে রক্ত দগদগ করছে। সে গড়াতে গড়াতে নেমে চলেছে পাথরের উপর দিয়ে। ওদিকে একদঙ্গল নাগপাকে দেখলুম পড়ি-কী মরি করে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে দৌড়চ্ছে। হিস্টোফোন তাই দেখে হাসতে লাগল। বললুম, “এখানে আর নয়। হিস্টোফোন, ঘুরপথে আমাদের এখনই হোটেলে পৌঁছনো দরকার।”…
.
শেষ লড়াই
সমতলে জঙ্গল ও পাথরের ভেতর অশেষ কষ্ট ভোগ করে সেই খালটার ধারে পৌঁছলাম আমরা। হিস্টোফোন করুণ মুখে বলল, “ওণ্টির জন্য আমার মন কেমন করছে, তার মা বেঁচে থাকলে ভাবনা ছিল না।”
তাকে আশ্বাস দিয়ে বললুম, “ভেব না। পুলিশের সাহায্যে তাকে তোমার কাছে এনে দেব।”
খালের জলে তৃষ্ণা মিটিয়ে আমরা সামনে উঁচু রাস্তার দিকে এগোচ্ছি, হঠাৎ একটা প্ৰকাণ্ড নীল রঙের পাথরের আড়ালে ধূসর রঙের টুপি দেখতে পেলুম। চোপরা নয় তো? ইশারায় বেণীমাধব ও হিস্টোফোনকে চুপচাপ আসতে বলে পা টিপে এগিয়ে গেলুম, টুপিওয়ালা লোকটি ওদিকে ঘুরে কী দেখছে। তার পেছনে গিয়ে রিভলভার উঁচিয়ে হ্যান্ডস আপ’ বলতে গেছি, আর লোকটা চাপা গলায় বলে উঠেছে, “চুপ, চুপ!”
চমকে উঠে গোয়েন্দাপ্রবর কর্নেল নীলাদ্রি সরকারকে আবিষ্কার করলুম এবং হেসে ফেললুম।
কর্নেল আঙুল দিয়ে পাথরের ওপাশে কিছু নির্দেশ করলেন। উঁকি মেরে দেখলুম, একটা ফাঁকা ঘাসজমিতে ওক গাছের ছায়ায় বসে আছে ভোমরালাল চোপরা আর মাদারিবেশী তার সেই চেলা। শিম্পাঞ্জিটা থেবড়ে বসে আপেল খাচ্ছে আর পিঠ চুলকোচ্ছে। বেণীমাধববাবু চাপা স্বরে বললেন, “আরে! চোপরার ওই সঙ্গীটাই আমার দোকানে গিয়েছিল। ওর বাঁকানো বাজপাখির নাকটা দেখুন।”
