একটু হেসে বললাম, “বসুন অনেক কথা আছে।”
.
ডাইনির গুহায়
এ রাতে কিছু ঘটেনি। সকালে বেণীমাধব এলেন ঘরে। তখন শুনলুম, চোপরা ভীষণ সতর্ক হয়ে গেছে। বেণীমাধবকে পাত্তাই দেয়নি। বলেছে, ওসব কারবারে সে নেই। ইচ্ছে করলে বেণীমাধব একা বাঁটুলের খোঁজে বেরিয়ে পড়তে পারেন। বাঁটুলের ভেতর হিরে থাকার কথা চোপরা নাকি বিশ্বাস করে না।
কর্নেল বললেন, “অসাধারণ ধূর্ত লোক এই চোপরা। আমার এই ফাঁদে সে পা দিল না তাহলে!”
আমি বললুম, “তা দিল না। কিন্তু ওদিকে সে খুনে শিম্পাঞ্জি আর একটা লোককে নাগপা বস্তিতে পাঠিয়েছে যখন, তখন বোঝা যাচ্ছে–সে একটা বাঁটুল সংগ্রহ করতে চায়।”
“ঠিক তাই।” কর্নেল সায় দিয়ে চুরুট টানতে থাকলেন। চোখ বন্ধ। তারপর হঠাৎ নড়ে বসলেন। “জয়ন্ত! তোমার নাগপা বন্ধু হিস্টোফোনের তো আসার কথা এখন?”
“হ্যাঁ। কিন্তু কৈ? আটটা বেজে গেল।”
কর্নেল উঠে গিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়ালেন। চোখে বাইনোকুলার রেখে নাগপা বস্তির দিকটা কিছুক্ষণ লক্ষ্য করলেন। তারপর বললেন, “ওদের বস্তিতে কী একটা গণ্ডগোল হচ্ছে যেন। অনেক লোক ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে।”
ব্যালকনিতে গিয়ে বললুম, “বাইনোকুলারটা দিন তো দেখি।”
কর্নেল দূরবীক্ষণ যন্ত্রটা দিলে চোখ রাখলুম। তারপর চমকে উঠলুম। হিস্টোফোন বলেই তো মনে হচ্ছে–সে মুখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মধ্যিখানে। আর চারদিক থেকে লোকেরা হাত নেড়ে যেন শাসাচ্ছে। ভিড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে চোখ কচলাচ্ছে ওণ্টি। তার কোলে সেই সাদা কুকুরটা।
বাইনোকুলার ফেরত দিয়ে ব্যস্তভাবে বললুম, “কী হয়েছে দেখে আসি।”
কর্নেল একটু ইতস্তত করে বললেন, “যাবে? কিন্তু …”
বেণীমাধব বললেন, “আমি বরং যাই জয়ন্তবাবুর সঙ্গে।”
কর্নেল চিন্তিতভাবে বললেন, “আচ্ছা। কিন্তু সাবধানে থাকবেন।”
আমরা দুজনে হন্তদন্ত হয়ে চললুম। রাস্তা দিয়ে কিছুটা এগিয়ে ঢাল বেয়ে নামলুম। ঘাসের ঢালু জমিতে সেই গুজ্জর রাখালকে ভেড়া চরাতে দেখলুম। সে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল।
খাল পেরিয়ে যাবার পর আবছা গোলমালের শব্দ এল। বস্তির পেছনে প্রকাণ্ড সব পাথর রয়েছে। তার আড়ালে গিয়ে দুজনে বসে পড়লুম। ওদের ভাষা জানি না। শুধু বুঝলুম, হিস্টোফোনকে ওরা কোনো কারণে গালাগালি করছে আর শাসাচ্ছে যেন। তা কি আমার জন্য। নাগপা বস্তিতে বাইরের লোককে এনে খাতির করেছিল বলে?
একটু পরে ওণ্টির কুকুরটা ধুপ করে কোল থেকে লাফিয়ে পড়ল। তারপর দৌড়ে আমাদের কাছে চলে এল। পেছন-পেছন দৌড়ে ওকে ধরতে এল ওণ্টি। এসেই আমাদের দেখে থমকে দাঁড়াল।
ইশারায় ওকে ডেকে জিগ্যেস করলুম, “কী হয়েছে ওণ্টি?”
ওণ্টি কান্না জড়ানো স্বরে বলল, “বাবা তোমাকে দেবতাদের বল দিয়েছে বলে বাবাকে সবাই বকছে। সর্দার বলছে, বাবার হাত-পা বেঁধে ডাইনির গুহায় ফেলে দিয়ে আসবে।”
“কিন্তু দেবতাদের বল তো তোমার বাবা আমাকে দেয়নি। ওটা ওদের দেখাচ্ছে না কেন তোমার বাবা?”
ওন্টি চোখ মুছতে মুছতে কুকুরটাকে কোলে নিল। তারপর বলল, “বলটা তো আমার। আমি কুড়িয়ে পেয়েছিলুম। রোজ বলটা নিয়ে আমি খেলতে যাই। রণির সঙ্গে খেলি যে। বাবা জানলে বকবে । তাই লুকিয়ে যাই।”
“তোমার এই কুকুরটার নাম বুঝি রণি?”
ওণ্টি মাথা নাড়ল। বলল, “আজ সকালে বলটা নিয়ে খেলছিলুম। মাদারিটা সর্দারের বাড়ির সামনে বসেছিল। ওর বাঁদরটাকে লেলিয়ে দিল আর বাঁদরটা এসে রনির কাছ থেকে কেড়ে নিল।”
খাপ্পা হয়ে বললুম, “মাদারিটা কোথায় এখন?”
“চলে গেছে।” ওণ্টি নাক মুছে বলল, “আমি সর্দারকে বললুম–কিন্তু বিশ্বাস করল না। বলল, তুই ঝুট বলছিস। তোর বাবা বলটা সেই কলকাতার লোকটাকে বেচে দিয়েছে।”
এই সময় হট্টগোলটা হঠাৎ বেড়ে গেল। পাথরের ফাঁকে উঁকি মেরে দেখলুম, লোকেরা হিস্টোফোনকে দড়িতে বাঁধছে। আর থাকতে পারলুম না। দৌড়ে ওদের সামনে হাজির হলুম আমরা। ওরা আমাদের দেখে একটু হকচকিয়ে গেল। টুলে বসে থাকা একটা লোক। সাদা চুলদাড়ি, হিংস্র চেহারা এবং তার পরনে আঁট পাতলুন আর গায়ে একটা নীলরঙের বেঢপ জ্যাকেট। সে দুর্বোধ্য ভাষায় চেঁচিয়ে কিছু বলল। মনে হল এদের সর্দার সে।
কিন্তু কিছু বলার আগেই লোকগুলো ঝাঁপিয়ে এসে আমাকে আর বেণীমাধবকে জাপটে ধরে মাটিতে ফেলল। চ্যাঁচামেচি করেও ফল হল না। এক মিনিটের মধ্যে ওরা আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলল। তারপর চ্যাংদোলা করে নিয়ে চলল। পকেটে রিভলবার থাকা সত্ত্বেও কিছু করা গেল না।
ফার, পাইন, ওকপার পপলার গাছের ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে একটা পাহাড়ের ধারে এনে ফেলল আমাদের। তারপর চড়াই বেয়ে উঠতে শুরু করল। পাহাড়ের গায়ে একটা গুহা দেখা যাচ্ছিল। গুহার মুখে ধপাস করে ফেলে দিয়ে ওরা দৌড়ে পালিয়ে গেল।
এই তাহলে ডাইনির গুহা! অজানা আতঙ্কে বুক ধড়াস করে উঠল। আমার পাশে বেণীমাধবকে উপুড় করে ফেলেছে। বেণীমাধব অনেক কষ্টে চিত হয়ে বললেন, “এ কী বিপদে পড়া গেল জয়ন্তবাবু!”
গুহার ভেতর দিকের অন্ধকার থমথম করছে। মুখ ঘুরিয়ে দেখলুম, একরাশ হাড়গোড় আর কয়েকটা মড়ার খুলি পড়ে আছে। শিউরে উঠলুম। বললুম, “সর্বনাশ! গুহার ভেতর নিশ্চয় মানুষখেকো জন্তু আছে, বেণীমাধববাবু!”
তারপর খসখস শব্দ শুনে বাঁদিকে ঘুরে, দেখি, শুধু আমরা দুজন নই–বেচারা হিস্টোফোনকেও ফেলে দিয়ে গেছে আমাদের সঙ্গে। হিস্টোফোন গুহার দেয়ালে খাঁজকাটা একটা পাথরে পায়ের দড়িটা জোরে ঘষছে। ডাকলুম, “হিস্টোফোন।”
