ঠাসাঠাসি পাথরের বাড়ি নিয়ে বস্তিটা দাঁড়িয়ে আছে। বাড়িগুলোর অবস্থা জরাজীর্ণ এবং আকারে ছোট। একটা ইঁদারার কাছে ফাঁকা জায়গায় মাদারি খেলা দেখাচ্ছে। ভিড় করে লোকেরা দেখছে। বস্তির অসংখ্য কুকুর নিরাপদে তফাতে দাঁড়িয়ে বেদম গালাগালি করছে শিম্পাঞ্জিটাকে।
হিস্টোফোন বলল, “মাদারিররা ভালুক বা বাঁদর নিয়ে খেলা দেখাতে আসে। তবে এই মাদারিটাকে এর আগে দেখিনি। ওর ওই জন্তুটা কী বলুন তো স্যার?”
“ওটা একটা শিম্পাঞ্জি।”
হিস্টোফোন অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, “ওটা দেখতে বড্ড কুচ্ছিত। ওর স্বভাবও নিশ্চয় ভাল নয়।”
“তা তো নয়ই। শিম্পাঞ্জি বিপজ্জনক জন্তু।”
হিস্টোফোন তারিফ করে বলল, “তবু কেমন বশ মানিয়েছে দেখুন!”
একটু পরে সে আমাকে এককাপ কড়া চা এনে দিল। চা খেতে খেতে দেখলুম, খেলা শেষ করে ‘মাদারি’ শিম্পাঞ্জিটাকে নিয়ে এদিকেই এগিয়ে আসছে। ভয় হল, শিম্পাঞ্জিটা আমাকে চিনতে পারবে না তো?
কিন্তু ওদের ঘিরে নিয়ে আসছে নাগপাদের নানা বয়সী মানুষের ভিড়। আমাকে মাদারি বা জাম্বু কেউই দেখতে পেল না ভিড়ের ভেতর থেকে। ওরা এগিয়ে গিয়ে একটা বাড়ির সামনে থামল। সেই সময় ওণ্টি ফিরে এসে তার বাবাকে কী বলল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসল। হিস্টোফোন বলল, “মাদারি আর জাভুটা আজ রাতে সোলোন নামে একজনের বাড়িতে থাকবে। সোলোন ওকে নেমন্তন্ন করে নিয়ে গেল।
জিগ্যেস করলাম, “সোলোন কে?”
“আমাদের সর্দারের ছেলে। এ বস্তিতে একমাত্র সোলোনই আপনাদের কলকাতা গিয়েছিল। আপনি কিন্তু আমাকে কলকাতা নিয়ে যাবেন স্যার?”
তাকে আশ্বাস দিয়ে বললুম, “তাহলে উঠি হিস্টোফোন।”
আসার সময় ওণ্টিকে একটু আদর করে এলুম। ওর বাবা হিস্টোফোন আমাকে সেই খাল পর্যন্ত পৌঁছে দিতে এল। তারপর চাপা গলায় বলল, “আপনি যদি আমাকে কলকাতা দেখাতে নিয়ে যান, তাহলে আপনাকে একটা সুন্দর জিনিস উপহার দেব। জিনিসটা ওণ্টি কুড়িয়ে পেয়েছিল।”
“জিনিসটা কী হিস্টোফোন?”
“একটা লোহার বল। বলটার গায়ে ছবি আঁকা আছে।”
হিস্টোফোন এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিয়ে বলল, “এ জিনিসের দাম আছে স্যার! একমাস আগে কলকাতার একটা লোক এসেছিল বস্তিতে। সে আমাদের সর্দারকে বলেছিল, লোহার বল কিনতে এসেছে। সর্দার খুব রেগে গিয়েছিল। এসব লোহার বল নাকি দেবতাদের খেলার জিনিস। বস্তির অনেকে কুড়িয়ে পেয়ে ঘরে তুলে রেখেছে। কেউ প্রাণ গেলেও বেচবে না। কারণ, এ বল তো মানুষ তৈরি করেনি। দেবতারা সেকালে তৈরি করেছিলেন খেলবেন বলে। খেলা হয়ে গেলে ছুঁড়ে ফেলেছেন। তো স্যার, সর্দার কলকাতার লোকটাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল বস্তি থেকে ।”
কান খাড়া করে শুনছিলুম। খুব চমকে উঠেছিলুম ওর কথা শুনে। “বললুম, সেই লোকটা কেমন করে জানল লোহার বলের কথা?”
হিস্টোফোন আরও গলা চেপে বলল, “আমার কলকাতা দেখার খুব ইচ্ছে বলেই বলছি আপনাকে। যেন আর কেউ না জানতে পারে স্যার।”
“জানতে পারবে না। বললো হিস্টোফোন!”
“আমার খুড রাস্টোফানই এর মূলে। খুড়ো শহরের একটা হোটেলে কাজ করে। সেই লোকটার সঙ্গে তার আলাপ হয়েছিল। তাকে সঙ্গে করে একদিন বস্তিতে নিয়ে এসেছিল খুড়ো। ঘরের তাকে একটা এরকম লোহার বল রাখা ছিল। সেটা দেখে লোকটা আগ্রহ প্রকাশ করল। খুড়ো বলল, এটা দেবতাদের খেলার জিনিস। আপনি আমার অতিথি। ভাল লাগে তো নিন। তবে সর্দার জানলে রাগ করবে!”
উত্তেজনায় অস্থির হয়ে বললুম, “হিস্টোফোন জিনিসটা একবার দেখাবে আমাকে?”
হিস্টোফোন হন্তদন্ত হয়ে চলে গেল। বেলা পড়ে এসেছে। শিগগির অন্ধকার হয়ে যাবে। খালের ধারে একটা পাথরের ওপর বসে হিস্টোফোনের প্রতীক্ষা করতে থাকলুম। মিনিট পাঁচেক পরে সে ফিরে এল। জামার পকেট থেকে জিনিসটা বের করে বলল, “এই দেখুন স্যার!”
সেই গ্রিক বাঁটুল। একই রকম হিজিবিজি লেখা আর নকশা আঁকা। হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে বললুম, “তোমাকে আমি কিছু টাকা দিচ্ছি হিস্টোফোন! জিনিসটা আমাকে দাও।”
অমনি হিস্টোফোন বাঁটুলটা খপ করে কেড়ে নিল আমার হাত থেকে। গম্ভীর মুখে বলল, “উঁহু! আগে কলকাতা নিয়ে যাবেন। তারপর দেব!”
বুঝলুম, নাগপারা যতই ভদ্র হোক–গোঁয়ার-গোবিন্দ কম নয়। হাসতে হাসতে বললুম, ঠিক আছে। তাই দিও। শোন, আমি থাকি সানি লজ হোটেলে। ওই যে দেখছ, পাহাড়ের গায়ে লাল, নীল আলোয় হোটেলের নাম লেখা। তুমি কাল সকালেই যেও বরং। গিয়ে বলো, জয়ন্ত চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করব।”
হিস্টোফোন আমার নামটা বিড়বিড় করে মুখস্থ করে নিল। আমি সাবধানে খাল পেরিয়ে ওপারে গেলুম, হিস্টোফোন এদিক-ওদিক তাকাতে-তাকাতে চলে যাচ্ছে।
হোটেলে পৌঁছে দেখি, কর্নেল ফেরেননি। ব্যালকনিতে চুপচাপ বসে রইলুম। উত্তেজনায় মনে মনে ছটফট করছিলুম। হিস্টোফোনের বাঁটুলটার ভেতর কি হিরে আছে? যদি থাকে, হিরেটা ওকে ফেরত দেওয়া উচিত। বেচারা গরিব মানুষ। ওটা বেচলে সে বড়লোক হয়ে যাবে।
কর্নেল ফিরলেন ঘণ্টাখানেক পরে। বললেন, “কোথাও বেরোও নি তো?” বলে হঠাৎ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আমার আপাদমস্তক দেখে মুচকি হাসলেন। “উঁহু, বেরিয়েছিলে দেখছি।”
“আপনি কি অন্তর্যামী?”
“না। তবে তোমার জুতোয় আর প্যান্টে লাল ধুলোর ছোপ দেখে বুঝেছি, বেরিয়েছিলে।”
