প্রণববাবু আর কর্নেল চাপা গলায় কথা বলতে থাকলেন। আমি আর বেণীমাধব ব্যালকনিতে গিয়ে বসলুম। দৃশ্য দেখার জন্য আমি একটা ভিউফাইন্ডার নিয়ে গেছি। সেটা চোখে রেখে কথা বলছি বেণীমাধবের সঙ্গে এবং মাঝে মাঝে বেণীমাধবও আমার ভিউফাইন্ডারটা নিয়ে দৃশ্য দেখছেন। তারিফ করছেন।
হঠাৎ উনি উত্তেজিত হয়ে বললেন, “জয়ন্তবাবু! দেখুন তো ওই পাহাড়ের রাস্তায় ওটা কী?”
ভিউফাইন্ডারে চোখ রেখে দেখি, খানিকটা দুরে সোনালী রঙের পাহাড়ের গায়ের আঁকাবাঁকা রাস্তায় চোপরার সেই শিম্পাঞ্জিটা হেলে-দুলে চলেছে এবং তার পেছন-পেছন যাচ্ছে একটা লোক। তাকে চিনতে পারলুম না। লোকটার পরনে মাদারির পোশাক। মাথায় পাগড়ি, হাতে একটা ডুগডুগি রয়েছে। ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে না।
একটু পরে তারা নিচে নামতে থাকল। সমতলে নেমে গেলে আর তাদের দেখতে পেলুম না। সামনে আরেকটা পাহাড়ের আড়াল রয়েছে। কর্নেলকে তক্ষুণি ডেকে ব্যাপারটা জানিয়ে দিলুম।
কর্নেল বললেন, “ওদিকেই নাগপা বস্তি আছে শুনেছি। চোপরার উদ্দেশ্য বোঝা যাচ্ছে না। যাইহোক, বেণীমাধববাবু, আপনি আর দেরি করবেন না। চোপরার অফিসে চলে যান।”
বেণীমাধব উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “আপনাকে দেখে চোপরা নিশ্চয় অবাক হবে। আপনি বলবেন, এতকাল বৈজুনাথের সঙ্গে কারবার করেছেন। বৈজুনাথই বলেছিল, নাগপা বস্তির ওদিকে একটা পাহাড়ের গুহায় বাঁটুল কুড়িয়ে পেয়েছে। এখন বৈজুনাথ নেই। তাই আপনি চোপরার সাহায্য চাইছেন। কাজেই আরও বাঁটুল উদ্ধার করতে পারলে দুজনে আধাআধি ভাগ করে নেবেন।”
বেণীমাধব চিন্তিতমুখে বেরিয়ে গেলেন। কর্নেল ও প্রণব রুদ্র বেরুলেন তার মিনিট দশেক পরে। কর্নেল আমাকে হোটেলেই থাকতে বলে গেলেন।
চুপচাপ একা বসে থাকতে খারাপ লাগছিল। বিকেলের ঝলমলে রোদে বাইরের অপূর্ব দৃশ্য। এভাবে কাহাতক বসে থাকা যায়? কর্নেলের নির্দেশ মানতে ইচ্ছে করছিল না। শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে পড়লুম।
হোটেলের নিচের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বেশ খানিকটা এগিয়ে যেতেই ডানদিকের উপত্যকায় একটা বস্তি চোখে পড়ল। ওটাই কি নাগপা বস্তি? পাহাড়ের ঢালে সবুজ ঘাসে একজন গুজ্জর রাখাল ভেড়া চরাচ্ছিল। তাকে হিন্দিতে জিগ্যেস করতে সে ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে বলল, ওটাই নাগপা বস্তি।
মাথায় কী খেয়াল চাপল সোজা ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করলুম। নিচের উপত্যকায় পৌঁছে কিছুদূর এগিয়ে একটি খাল দেখতে পেলুম। স্বচ্ছ জল বেয়ে যাচ্ছে। খালের ধারে উইলো আর পপলার গাছের জঙ্গল। খালের বুকে অজস্র পাথর। পা রেখে-রেখে সাবধানে ওপারে চলে গেলুম। জঙ্গলের পর ফাঁকা ঘাসের জমিতে যেই গেছি, একটা সাদা কুকুর দৌড়ে এল। শিস দিতেই সে থেমে গেল। তার কাছে এগোব কি না ভাবছি, একটি কমবয়সী মেয়ে-মাথায় স্কার্ফ জড়ানো, পরনে সুন্দর রঙীন ঘাগরা, একটা প্রকাণ্ড পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে আমাকে দেখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। অপূর্ব সুন্দর চেহারা মেয়েটির। ফর্সা রঙ। বড়জোর বছর দশেক বয়স।
কুকুরটা ছুটে গিয়ে তার কোলে উঠল। আমি একটু হেসে হিন্দিতো বললুম”তোমার নাম কী?”
মেয়েটি হাসল একটু। কিন্তু কিছু বলল না।
পকেট হাতড়ে ভাগ্যিস কয়েকটা চকোলেট পেয়ে গেলুম। কাল আসার পথে কিনেছিলুম শোনমার্গে। গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল বারবার। কাঁহাতক জল খাওয়া যায়? তাই চকোলেট চুষছিলাম কর্নেলের পরামর্শে। এখন চকোলেটগুলো কাজে লাগল।
মেয়েটি দ্বিধা না করে সেগুলো নিলো। কুকুরটার মুখেও খুঁজে দিল একটা। তারপর ভাঙা-ভাঙা হিন্দি বলল, “তুমি কি এখানে বেড়াতে এসেছ? কোথায় থাকো তুমি?”
বললুম, “আমি কলকাতা থেকে আসছি। খুব সুন্দর তোমাদের দেশ।”
মেয়েটি মাথা দুলিয়ে বলল, “আমার বাবা বলে কলকাতা আরও সুন্দর দেশ।”
“তাই বুঝি? নাম কী তোমার?”
“ওণ্টি।”
“ওণ্টি? বাঃ, বেশ সুন্দর নাম তো তোমার।”
ওণ্টির সঙ্গে কথা বলছি, সেই সময় ওদিকে কোথায় ডুগডুগির শব্দ শোনা গেল। ওণ্টির কানে গেলে সে চঞ্চল হয়ে উঠল। বলল, “মাদারি খেলা দেখাতে এসেছে। আমি খেলা দেখব।”
সে কোল থেকে কুকুরটাকে নামিয়ে দিল। কুকুরটা কিন্তু চাপা গরগর শব্দ করে ওণ্টির দুপায়ের ফাঁকের ঢুকে পড়ল। ওণ্টি না বুঝলেও আমি বুঝতে পারছিলুম, কুকুরটা তার সহজাত বোধে টের পেয়েছে যে কাছাকাছি একটা বিপজ্জনক জন্তু এসেছে। বললুম, “ওণ্টি, চলো! তোমার সঙ্গে মাদারির খেলা দেখব।”
গাছপালার ফাঁকে পাথরের এবড়োখেবড়ো ঘর বাড়ি দেখা যাচ্ছিল। নাগপারা গরিব মানুষ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ওন্টির পেছন-পেছন ঘরগুলোর কাছে যেতেই একটা লোক বেরিয়ে এল। সে সন্দেহজনক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল। ওণ্টি তাকে দুর্বোধ্য ভাষায় কী বলল। তখন সে হাসিমুখে আমাকে ‘নমস্তে’ করল।
ওণ্টির কুকুরটা এগোতে চাইছিল না। ওণ্টি অগত্যা তাকে কোলে তুলে নিল আবার। লোকটা ভাঙা-ভাঙা হিন্দিতে বলল, “আপনি কলকাতার নোক শুনে খুশি হলুম স্যার! আমার বড় ইচ্ছে করে কলকাতা যাই। কিন্তু পয়সাকড়ি পাব কোথায় অত?”
ঝটপট ওর সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেললুম। লোকটা ওণ্টির বাবা। তার নাম হিস্টোফোন। এ নাম যে গ্রিক ভাষার অপভ্রংশ, তাতে ভুল নেই। বংশপরম্পরা প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে এই নাগপারা গ্রিক ভাষার একটা অপভ্রংশ উপভাষা ব্যবহার করে আসছে। হিস্টোফোন সামান্য লেখাপড়া জানে। তাকে কলকাতা নিয়ে যাব বলায় সে খুশি হয়ে আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে গেল। ততক্ষণে ওণ্টি মাদারির খেলা দেখতে উধাও হয়েছে।
