আমার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার কয়েকটা ঢিল পড়ল। কর্নেল বললেন, চলো! পুকুরের পাড় ঘুরে পেছনের দরজায় যাই। গোবর্ধনবাবুর বাড়িটা এমন জায়গায়, তা ভাবিনি। অথচ বাড়িতে টেলিফোন আছে।
কারখানার পাঁচিলের পাশ দিয়ে ঘুরে পুকুরপাড়ে গেলাম। পাড় বলতে একমিটার চওড়া জায়গা। সেখানে আগাছার জঙ্গল। পায়ের কাছে টর্চের আলো ফেলে দুজনে সেই জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পেছনের দরজায় গেলাম। কর্নেল একটু হেসে বললেন, ভূত এত ভীতু হয় জানতাম না। এই দরজা দিয়ে কেটে পড়েছে দেখছি।
তারপর তিনি দরজায় টর্চের আলো ফেললেন। এ দরজায় তালা থাকার কথা। কিন্তু তালা নেই!
ভেতরে ঢুকে কর্নেল দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। টর্চের আলোয় অপরিচ্ছন্ন ছোট্ট উঠোন, একটা টিউবেল আর পাশাপাশি দুটো ঘর দেখা গেল। দুটো ঘরেই তালা আটকানো আছে। কর্নেল প্রথমে ডানদিকের ঘরের কড়া নাড়লেন। কোনও সাড়া না পেয়ে বাঁদিকের ঘরের দরজার কড়া নাড়তে থাকলেন। কিছুক্ষণ পরে ঘরের ভেতর একটা নড়াচড়ার শব্দ শোনা গেল। কর্নেল চাপা গলায় ডাকলেন, হালদারমশাই!
এবার হালদারমশাইয়ের সাড়া পেলাম। ঘুমজড়ানো গলায় বললেন, আবার ডিসটার্ব করে! গুলি করব কইয়া দিলাম। কর্নেল বললেন, হালদারমশাই! অন্যের বিছানায় ঘুমুনো উচিত নয়। উঠে পড়ুন।
—অ্যাঃ! আমি ঘুমাইতাছি?
-হ্যাঁঃ। জেগে উঠুন। শিগগির।
আমি টর্চের আলোয় বারান্দার এক কোণে দেয়ালের গায়ে ইলেকট্রিক মিটারবক্স আর মেইন সুইচ দেখছিলাম। সুইচটা অফ করা আছে। তখনই অন করে দিলাম। ততক্ষণে হালদারমশাই ঘরের ভেতরে দরজার কাছে এসে শাসাচ্ছেন, পরিচয় না দিলে গুলি করব!
বললাম, হালদারমশাই! আমি জয়ন্ত। আমার সঙ্গে কর্নেল আছেন।
ঘরের দরজা টানাটানির শব্দ হল। হালদারমশাই বললেন, সুইচ গেল কই?
খুঁজে দেখুন। সুইচ কোথায় তা আপনি নিশ্চয় দেখেছিলেন।-বলে কর্নেল পাশের ঘরের দরজায় চলে গেলেন।
সেই সময় ঘরের ভেতর এবং বরান্দায় আলো জ্বলে উঠল। কর্নেল পাশের ঘরের তালাটা পরীক্ষা করে ফিরে এলেন। তারপর পকেট থেকে একগোছা নানা সাইজের চাবি বের করে অনেক চেষ্টার পর এই ঘরের তালাটা খুলে ফেললেন। দরজা খুলে দুজনে ঘরে ঢুকলাম। হালদারমশাই দুহাতে চোখ মুছে বললেন, আমি কি স্বপ্ন দেখতাছি?
বললাম, না হালদারমশাই! স্বপ্ন নয়।
কর্নেল ঘরের ভেতরটা দেখতে ব্যস্ত হয়েছেন। হালদারমশাই বড় মশা! বলে বেরিয়ে বারান্দায় গেলেন। দেখলাম, উনি মশার কামড় থেকে বাঁচতে মশারি মুড়ি দিয়ে শুয়েছিলেন। অন্ধকারে মশারি খুঁজে পেলেও তা খাটাতে পারেননি। ঘরে একটা খাটে সাদাসিধে বিছানা, একটা কাঠের আলমারি, দুটো চেয়ার আর একটা ছোট্ট টেবিল। দেওয়ালের তাকে খানকতক পুরনো ধর্মগ্রন্থ, ওষুধের শিশি, এইসব নানা জিনিস।
কর্নেল, বিছানার পাশে টুলে রাখা টেলিফোনের রিসিভার তুলেই বললেন, ডেড। বোঝা যাচ্ছে, আমরা আসার পরই টেলিফোনের তার ছেড়া হয়েছে। খুব চালাক ভূত! জয়ন্ত! বাইরে গিয়ে লক্ষ্য রাখখা। হালদারমশাইকে বলো, দরকার হলে ভূতকে ভয় দেখানোর জন্য উনি যেন ওঁর ফায়ার আর্মস রেডি রাখেন। কিন্তু না—গুলি ছোড়া চলবে না।
বেরিয়ে গিয়ে হালদারমশাইকে কথাটা বলতেই উনি পকেট থেকে খুদে আগ্নেয়াস্ত্র বের করে বললেন, আই অ্যাম অলওয়েজ রেডি।
একটু পরে কর্নেল বেরিয়ে এসে দরজা বন্ধ করে সেই মাস্টার কি-র সাহায্যে আগের মতো তালাটা এঁটে দিলেন। তারপর আমাদের দাঁড়িয়ে থাকতে বলে পাশের ঘরের তালা খুললেন এবং ভেতরে ঢুকে গেলেন।
আর ঢিল পড়ল না। ছাদেও কোনও শব্দ শোনা গেল না। মিনিট দু-তিন পরে কর্নেল পাশের ঘর থেকে বেরুলেন, এবং দরজা বন্ধ করে তালাটা দিব্যি আগের মতো এঁটে দিলেন। তারপর বললেন, আর নয়। এবার কেটে পড়া যাক।
কিন্তু অবাক কাণ্ড বাড়ির পেছনের দরজা কখন কে বাইরে থেকে আটকে দিয়ে গেছে। হালদারমশাই পাঁচিল টপকে ওধারে গিয়ে চাপা হুঙ্কার দিয়ে একটা কিছু করলেন এবং দরজাটা খুলে গেল। তিনি খি খি করে হেসে বললেন, —পুরানো কড়া। এক টানেই ব্রেকডাউন।
কর্নেল বললেন, কুইক! ভূতের মুখে খবর পেয়ে যে কোনও সময় পুলিশ এসে পড়তে পারে। পুলিশ অনধিকার প্রবেশের দায়ে আমাদের অ্যারেস্ট করলে একটু ঝামেলা হবে।
আমরা পুকুরপাড়ের ভেতর দিয়ে কারখানার পাঁচিলের কাছে গিয়ে আবার নস্কর লেনে পৌঁছলাম।
সে-রাতে কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে কাজুবাদাম পটাটোচিপসের সঙ্গে কফি খেতে খেতে ক্ষুধার্ত হালদারমশাই শুধু মশা নিয়ে বকবক করছিলেন। বোঝা গেল, পাশে খাটাল এবং এঁদো পুকুর থাকার দরুন ওখানে মশার বড় উপদ্রব আছে। এক ফাঁকে ওঁকে জিজ্ঞেস করলাম, মশার উপদ্রব তো থাকারই কথা। কিন্তু ভূতের উপদ্রব টের পাননি?
হালদারমশাই চমকে উঠে বললেন, কী কইলেন? ভূতের উপদ্রব?
কর্নেল বললেন, হালদারমশাই! গোবর্ধন সর্বাধিকারী কালো ছাতাটা কুড়িয়ে পাওয়ার পর থেকে ওঁর বাড়িতে ভূতের উৎপাত শুরু হয়েছিল।
প্রাইভেট ডিটেকটিভ খুব গম্ভীর হয়ে গেলেন। তারপর ফেঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললেন, কর্নেলসার! চৌতিরিশ বৎসর পুলিশে চাকরি করছি। কিন্তু এমন সাংঘাতিক এক্সপিরিয়েন্স হয় নাই। হঃ! ছাদের উপর ধুপধুপ শব্দ শুনছি। দরজার কড়া নড়ছিল—একবার নয়, অনেকবার। তারপর পাশের ঘরে কী সব খুটখাট নাড়াচাড়া। কিন্তু তখন কান দিই নাই। এখন মনে খটকা বাধল। আপনারা ভূতের উপদ্রব কইলেন!
