শিম্পাঞ্জিটা সম্ভবত ঘুমিয়ে পড়েছে–চোখ বুজে হাত-পা তেমনি ওপরে তুলে রেখেছে। ঘুমোচ্ছে বদমাস খুনে বাঁদরটা! হঠাৎ দরজাটা প্রায় নিঃশব্দে খুলে গেল এবং কর্নেলকে দেখতে পেলুম। সেই পীরবাবার পোশাকটা পরনে। পাগড়ি নেই মাথায়। স্বপ্ন নয় তো?
স্বপ্ন নয়–ব্যাপারটা সত্যি ঘটছে। কর্নেল দরজা খুলেই ইশারা করলেন বেরিয়ে যেতে। নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ালুম। কিন্তু পা বাড়াতেই মেঝেয় শব্দ হল এবং শিম্পাঞ্জিটা চোখ খুলল। তখন একলাফে দরজার দিকে গেলুম। জন্তুটা লাফিয়ে উঠল। ভেতরের দরজার পর্দা তুলে নোকটাও উঁকি মারল। কিন্তু কর্নেল দড়াম করে দরজা আটকে ঝটপট তালা এঁটে দিলেন। ইন্টারলকিং সিস্টেমের দরজা আটকে গেল। তারপর দুজনে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলুম। তারপর আরেকটা দরজা পেরিয়ে গলিতে-গলি থেকে রাস্তায়।…
.
ওল্টি ও হিস্টোফান
হোটেলে আমাদের ঘরে ঢুকে কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, চোপরা এখনও পাহাড়ের চাতালে পড়ে রয়েছে। শীতটা সে এতক্ষণে হাড়ে-হাড়ে টের পাচ্ছে। যেটুকু গরম পড়ে, সন্ধ্যার পর থেকে তা চাপা দিতে ঠাণ্ডা হিম সাংঘাতিক একটা হাওয়া আসে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে। রাত যত বাড়ে, ঠাণ্ডার দাপটও তত বাড়ে। আশা করি সেটা টের পেয়েছ, ডার্লিং!”
বললুম, “ততটা পাইনি আলখেল্লার দৌলতে। কিন্তু চোপরাকে বেকায়দায় ফেললেন কীভাবে?”
“ওকে নিয়ে এই হোটেলের পাশ দিয়ে গেছি। ঢাল বেয়ে নেমে বাঁদিকে একটা পাহাড়ের চাতালে উঠেছি। তারপর আচমকা ধূপদানিটা ওর পিস্তলধরা হাতের ওপর প্রচণ্ড জোরে মেরেছি। পিস্তলটা খাদে গিয়ে পড়েছে। তখন ওকে জাপটে ধরে কুপোকাত করতে দেরি হয়নি। পিঠমোড়া করে বেঁধে ফেলেছি পাগড়ি দিয়ে। পাগড়িটা এত কাজে লাগবে ভাবতে পারিনি। দশহাত লম্বা পাগড়ি আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে রেখে ওর পকেট থেকে চাবি নিয়ে দৌড়ে গেছি। যাক গে, তুমি আলখেল্লাটা ছেড়ে ফেলল। রাত দশটা বাজে প্রায়।”
আলখেল্লা ছেড়ে রাতের পোশাক পরে বললুম, “সেই বাঁটুলটার কী হল?”
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, “ওটা তো নকল বাঁটুল। মসজিদের সিঁড়িতে বসে থাকার সময় দুটো কুকুর এসে পড়ায় আমার বুদ্ধি খুলে গিয়েছিল। নইলে আমার উদ্দেশ্য ছিল, সারারাত ওখানে থেকে চোপরার অফিসের দিক লক্ষ্য রাখা। আর কথা নয়। ঘুমনো যাক।”
বিছানায় শুয়ে আলো নিভিয়ে বললুম, “তাহলে বোঝা যাচ্ছে, ওইসব বাঁটুল একটা-দুটো নয়–আরও থাকতে পারে। গ্রিক দেহরক্ষীদের কাছেও নিছক অস্ত্র হিসেবে ওগুলো কি ছিল না? সম্রাটের বাঁটুল কিংবা তাঁর বাবা ফিলিপের বাঁটুল অ্যাস্টিডোনা করেছিল।”
কর্নেল ঘুম জড়ানো গলায় পাশের বিছানা থেকে বললেন, “ফিলিপের বাঁটুলে চোপরা কোনো হিরে পায়নি। সে ওর কথাবার্তা শুনেই বুঝেছি। সারাপথ ওর সঙ্গে কথা বলে এর আভাস পেয়েছি। চোপরার বিশ্বাস, সব বাঁটুলে হিরে লুকোনো থাকতে নাও পারে। কিন্তু কিছু বাঁটুলে যে থাকবেই, তা নিশ্চিত।”
“হিরের কথা বলেছিল নাকি চোপরা?”
“হিরের কথাটা বলেনি। বলছিল, কিছু বাঁটুল খুব পয়মন্ত তা সে জানে। আবার কিছু বাঁটুল অপয়া, তাও সে জানে। যাক এসব কথা। ঘুমোও।”
বেশ শীত করছিল। কম্বল মুড়ি দিতে হল। বেশ আরামে ঘুমোনো গেল সারারাত। সকালে উঠে দেখি, কর্নেল বিছানায় নেই। ব্যালকনিতে বসে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে দেখতে কফি খেলুম। তারপর কর্নেল ফিরলেন। বুঝলুম, অভ্যাসমতো প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। গলা থেকে বাইনোকুলার ঝুলছে। লাডাকের পাখি প্রজাপতির পেছনে ছুটোছুটি করে বেরিয়েছেন সম্ভবত।
একটু হেসে বললেন, “সেই চাতালটা লক্ষ্য করেছি দূর থেকে। বাইনোকুলার দিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছি। চোপরা নেই। আমার পাগড়িটা টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে আছে। ওর কাছে ছোরাও ছিল বোঝা গেল। তবে ডার্লিং, সেখানে এক মজার দৃশ্য দেখতে পেলুম। দুটো পাহাড়ী ছাগল জাতীয় প্রাণী পাগড়ির টুকরোগুলো মহানন্দে চিবুচ্ছে।”
ব্রিগেডিয়ার অর্জুন সিং এলেন।
কর্নেল বললেন, “ব্যস্ত হবেন না ব্রিগেডিয়ার সিং। কলকাতা থেকে আজ বেণীমাধব এসে পড়ার কথা। ওঁকে দিয়েই ফাঁদে ফেলব চোপরাকে। বৈজুনাথকে যে সে শিম্পাঞ্জি দিয়ে খুন করিয়েছে, সেটা প্রমাণ করা চাই আইনের চোখে। নইলে চোপরাকে আদালতে দোষী সাব্যস্ত করবেন না।”
অর্জুন সিং বললেন, “হ্যাঁ–সেও একটা কথা। তবে পুলিশকে আগেভাগে জানানো উচিত।”
কর্নেল বললেন, “পশ্চিমবঙ্গের গোয়েন্দাপুলিশের অফিসাররা ইতিমধ্যে শ্রীনগরে পৌঁছে গেছেন। সেখান থেকে ওঁরা লেহ এসে পৌঁছবেন যেকোনো সময়ে। কাশ্মীরের গোয়েন্দাপুলিশ অনুমতি না দিলে ওঁরা তো চোপরাকে গ্রেফতার করতে পারবেন না। আমি সব ব্যবস্থা করে এসেছি কলকাতা থেকে।”
অর্জুন সিং হেসে বললেন, “আঁটঘাট না বেঁধে আপনি কাজে নামেন না দেখছি।”
উত্তেজনায় অস্থির হয়ে রইলুম। আমার বেশি রাগ শিম্পাঞ্জিটার ওপর। পাজি বাঁদরটা আমার কান দুটো মুলে ব্যথা করে ফেলেছে। বাঁদরের হাতে কানমলা খাওয়ার চেয়ে অপমানজনক আর কিছু নেই।
বিকেলে বেণীমাধববাবু এসে পৌঁছলেন। পথে বাস খারাপ হয়েছিল, তাই খুব ভুগেছেন। ওঁর জন্য পাশের ঘর বুক করা ছিল। আমরা কথাবার্তা বলছি, সেই সময় এলেন পশ্চিমবঙ্গ গোয়েন্দাপুলিশের এক বড়কর্তা প্রণব রুদ্র। ওঁর সঙ্গে আমার চেনাজানা অনেকদিনের। পর্যটক সেজে এসেছেন দলবল নিয়ে। উঠেছেন অন্য একটা হোটেলে।
